অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী শাহিদ খাকান আব্বাসি “শাহবাজ ইন”

33

শাহবাজই হচ্ছেন নওয়াজ শরীফের উত্তরসূরি? সেটা এখন স্পষ্ট হয়ে গেছে। শুক্রবার পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট নওয়াজ শরীফকে অযোগ্য ঘোষণার পর পদত্যাগ করেন তিনি। এরপর থেকেই গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল শাহবাজ শরীফ তার ভাইয়ের জায়গায় নেতৃত্ব দেবেন। শনিবার নওয়াজ শরীফের নেতৃত্বে পিএমএল-এনের নেতাদের দুটি আলাদা বৈঠকে নওয়াজের উত্তরসূরি হিসেবে তার ছোট ভাই শাহবাজ শরীফের নাম চূড়ান্ত করা হয়। পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য চূড়ান্ত করা হয় সাবেক জ্বালানি মন্ত্রী শাহিদ খাকান আব্বাসিকে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় তাদের নাম প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম দ্য ডন। খবরে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার জন্য, শাহবাজকে পাঞ্জাব মুখ্যমন্ত্রীর পদ এবং আইনসভার আসন থেকে পদত্যাগ করতে হবে। তখন সেখানে নতুন একজন মুখ্যমন্ত্রী বেছে নেয়ার প্রয়োজন পড়বে। ধারণা করা হচ্ছে, পাঞ্জাবের কর বিষয়ক মন্ত্রী মুজতবা সুজাউর রেহমান পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শাহবাজের স্থলাভিষিক্ত হবেন। এরপর শাহবাজকে নওয়াজের রেখে যাওয়া শূন্য আসন থেকে নির্বাচিত হতে হবে। শাহবাজ জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে যাবেন আব্বাসি।
নওয়াজের প্রস্তাবে দ্বিমত করেননি কেউ: নওয়াজ শরীফকে শুক্রবার অযোগ্য ঘোষণার পর দলের সিনিয়র নেতাদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন তিনি। সেখানে নওয়াজ শরীফ তার ছোট ভাই শাহবাজ শরীফকে নতুন প্রধানমন্ত্রী পদে সুপারিশ করেন। তার এ প্রস্তাবে বৈঠকে উপস্থিত কেউই দ্বিমত প্রকাশ করেন নি। উল্টো তারা নওয়াজের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। পরবর্তীতে একইদিনে দ্বিতীয় একটি বৈঠকে নওয়াজের রেখে যাওয়া শূন্য আসন থেকে নির্বাচিত হওয়ার জন্য শাহবাজের নাম চূড়ান্ত করা হয়। পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য চূড়ান্ত করা হয় সাবেক জ্বালানি মন্ত্রী শাহিদ খাকান আব্বাসিকে। প্রসঙ্গত, নওয়াজ ক্ষমতা হারালেও দলে থাকবে তার একক আধিপত্য। তিনি যে সিদ্ধান্ত নেবেন পুরো দল তা মেনে নেবে- এমনটাই বলা হচ্ছিলো পাকিস্তানের মিডিয়ায়। তাই সবাই ধরে নিয়েছিলেন, শাহবাজ শরীফই মনোনয়ন পেতে যাচ্ছেন- হয়েছেও তাই। ওদিকে, অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী পদে আব্বাসির পাশাপাশি আলোচিতদের মধ্যে ছিলেন স্পিকার আয়াজ সাদিক। তিনি ২০১৩ সালের নির্বাচনে পরাজিত করেছেন পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফ (পিটিআই) চেয়ারম্যান ইমরান খানকে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা ছিল, সেই ইমরান খানকে ক্ষেপিয়ে তুলতে তাই আয়াজ সাদিককে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেছে নিতে পারেন নওয়াজ। কারণ, পানামাগেট কেলেঙ্কারিতে শরীফ পরিবারের বিরুদ্ধে যে মামলা তার অগ্রভাগে ছিলেন ইমরান খান। কিন্তু আদতে তা ঘটেনি।
কোন্‌ পথে পাকিস্তান: এটা অস্বীকার করার উপায় নেই- পিএমএল-এনের সবচেয়ে খারাপ দুঃস্বপ্ন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। কঠিন সময় পার করছে পাকিস্তান। নওয়াজ শরীফকে অযোগ্য ঘোষণা ও তার পদত্যাগের ফলে সরকারের শীর্ষ পদে সৃষ্টি হয়েছে শূন্যতা। এই ধারা অব্যাহত থাকলে অনেক ঘটনা ঘটে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। সবচেয়ে বড় ভয় সেনাবাহিনীকে নিয়ে। এমন আশঙ্কা থাকলেও সেনাবাহিনী রাজনীতি নিয়ে কোনো কথা বলে নি। তবে সাবেক সেনাপ্রধান ও স্বৈরশাসক পারভেজ মোশাররফ দৃশ্যত ভীষণ খুশি সুপ্রিম কোর্টের রায়ে। তিনিই ১৯৯৯ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন তখনকার প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফকে। শুক্রবার আবার নওয়াজ শরীফকে অযোগ্য ঘোষণা করাকে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত বলে আখ্যায়িত করেছেন তিনি। এবার ৪৫ দিনের জন্য অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রীর শাসনামল চলবে পাকিস্তানে। এর পর আসার কথা নতুন প্রধানমন্ত্রীর। এরই মধ্যে নেতৃত্বের যে শূন্যতা থাকবে তাতে পাকিস্তান কোন্‌ পথে ধাবিত হবে- তা নিয়ে প্রশ্ন অনেকের। পাকিস্তান কি গণতন্ত্রের পথে চলতে পারবে! স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে পারবে! নাকি কোনো অঘটন ঘটে যাবে! এমন অনেক প্রশ্নের মাঝে তীব্র বিতর্ক হচ্ছে সংবিধানের ৬২ অনুচ্ছেদ নিয়ে। শুক্রবার সুপ্রিম কোর্ট এই ধারার অধীনে নওয়াজ শরীফকে অযোগ্য ঘোষণা করেছে। কিন্তু সুস্পষ্ট করে বলা হয় নি এই অযোগ্য কতদিন থাকবেন- সীমিত সময়ের জন্য নাকি স্থায়ীভাবে। এ নিয়ে পাকিস্তানের আইন বিশেষজ্ঞরা বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। তারা বলছেন, নওয়াজ শরীফ কিছুদিন পর রাজনীতিতে ফিরে নির্বাচন করতে পারবেন। অন্যরা বলছেন, সংবিধানের ৬২ ধারার অধীনে নওয়াজ শরীফ চিরদিনের জন্য অযোগ্য হয়েছেন। এ নিয়ে ধুন্ধুমার বিতর্ক পাকিস্তানে। ২৮শে জুলাই শুক্রবার সুপ্রিম কোর্ট তাকে সংবিধানের ৬২ (১)(এফ) ধারায় দুর্নীতির অভিযোগে অযোগ্য ঘোষণা করেছে। এরপরেই তিনি পদত্যাগ করেন। এরপর থেকেই নওয়াজ শরীফের পরিণতি নিয়ে বিভক্ত পাকিস্তানের আইনি বিশেষজ্ঞরা। অনলাইন ডন এ বিষয়ে কিছু আইনজ্ঞের মুখোমুখি হয়। তাদের সবাই দ্বিধা প্রকাশ করেছেন। তাদের কেউ কেউ বলেছেন, ইস্যুটি অনেকদিন ধরে সুপ্রিম কোর্টে ছিল সেখানেই সুস্পষ্ট করে বলে দেয়া উচিত ছিল। সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক প্রেসিডেন্ট তারিক মেহমুদ বলেছেন, বেশকিছু ঘটনায় সুপ্রিম কোর্টের বড় একটি বেঞ্চে এ বিষয়টি এসেছে। এর মধ্যে সামিনা খাওয়ার হায়াত ও মোহাম্মদ হানিফের ঘটনা রয়েছে। তাতে সংবিধানের ৬২(১)(এফ) ধারায় কাউকে অযোগ্য ঘোষণা করা হলে তিনি কি স্থায়ীভাবে অযোগ্য হবেন কিনা তা নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। এমন একটি মামলার শুনানিতে সাবেক প্রধান বিচারপতি আনোয়ার জহির বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। কিভাবে সংবিধানের ৬২ ও ৬৩ অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে একজন ব্যক্তিকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য ঘোষণা করা হতে পারে বিস্ময় ছিল তা নিয়ে। তিনি আরো বলেছিলেন, কাউকে যদি অযোগ্য করা হয় তাহলে কিছু বিধানের অধীনে তিনি নিজেকে সংশোধনের মাধ্যমে যোগ্য করে গড়ে তুলতে পারেন। এক্ষেত্রে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানির প্রসঙ্গ টেনে আনেন সিনিয়র আইনজীবী রাহিল কামরান শেখ। তিনি বলেন, আদালত অবমাননার অভিযোগে সংবিধানের ৬৩ ধারার অধীনে পার্লামেন্টে আসন ধরে রাখার বিরুদ্ধে ২০১২ সালের ১৯শে জুন অযোগ্য ঘোষণা করেছিল গিলানিকে। এর মেয়াদ ছিল ৫ বছর। তিনি আরো বলেন, দুর্ভাগ্যজনক হলো সংবিধানের ৬২(১)(এফ) অনুচ্ছেদের অধীনে কত সময়ের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করা হবে তা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা নেই। এক্ষেত্রে কিছু মামলা স্থগিত অবস্থায় ছিল। ওইসব মামলায় ৬২(১)(এফ) অনুচ্ছেদের অধীনে কাউকে অযোগ্য ঘোষণা করা হলে তাকে শুধু পরবর্তী নির্বাচনের জন্য নাকি সব সময়ের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করা হবে তা নির্ধারণের কথা। আইনজীবী রাহিল কামরান শেখ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বলেছেন, পানামা পেপারস মামলার রায়ের মাধ্যমে ক্ষমতার ভারসাম্য সুপ্রিম কোর্টমুখী হয়েছে। এর মাধ্যমে একজন পার্লামেন্টারিয়ানের যোগ্যতা হুমকিতে পড়েছে। তিনি আরো বলেন, যদি এই রায় পুরো পার্লামেন্টারিয়ানদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয় তাহলে তারা মনে করবেন তাদেরকে হুমকি দেয়া হচ্ছে। এর ফলে তারা হয়তো সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিতে পারেন সম্মিলিতভাবে। যদি তেমনটা ঘটে তাহলে সংবিধানের ৬২ নম্বর অনুচ্ছেদে কোনো রাজনীতিককে অযোগ্য ঘোষণা করার ক্ষমতাকে খর্ব বা বিধি-নিষেধের জালে আটকানো হতে পারে। অন্যদিকে পাকিস্তান বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান আহসান ভুন বলেছেন, (নওয়াজ শরীফের বিরুদ্ধে) এই অযোগ্য ঘোষণা চিরদিনের জন্য। এক্ষেত্রে তিনি ২০১৩ সালে আবদুল গফুর লেহরির ঘটনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ওই সময় সাবেক প্রধান বিচারপতি ইফতিখার মুহাম্মদ চৌধুরীর পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছিল সংবিধানের ৬৩ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে কাউকে অযোগ্য ঘোষণা করা হলে তা হবে অবশ্যই অস্থায়ী প্রকৃতির। এ ধারায় অযোগ্য ব্যক্তি কিছু সময় পরে আবার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেন। কিন্তু সংবিধানের ৬২ ধারার অধীনে কাউকে অযোগ্য ঘোষণা করা হলে তা স্থায়ী নির্দেশ হিসেবে গণ্য হয়। এ জন্যই অনুচ্ছেদ ৬২তে কোনো অযোগ্য থাকার সময়সীমা উল্লেখ করা হয় নি। ফলে এ ধারার অধীনে কেউ অযোগ্য হলে তিনি পরের কোনো পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্য থাকবেন না। প্রায় একই রকম কথা বলেছেন সাবেক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল তারিক খোকার। তিনি বলেছেন, নওয়াজ শরীফ সারা জীবনের জন্য অযোগ্য হয়েছেন। তবে এ বিষয়ে যথার্থ জবাব দিতে পারবে সুপ্রিম কোর্ট।