আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজত ও ক্রসফায়ার ৯ মাসে ১২৫ জনের মৃত্যু

30

চলতি বছরের শুরু থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘হেফাজতে ও ক্রসফায়ারে’ ১২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। ওই ৯ মাসে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সংখ্যাগত প্রতিবেদনে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এ তথ্য দিয়েছে। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে সাদা পোশাকে ৫০ জনকে তুলে নেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে মাত্র সাতজন স্বজনদের কাছে ফিরতে পারে। দুইজনের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার হয়। তিনজনকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেপ্তার দেখিয়েছে। গণপিটুনির শিকার হয়ে মারা গেছে ৪০ জন।
আসকের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত নয়মাসে র‌্যাবের সঙ্গে ক্রসফায়ারে ২০ জন, পুলিশের সঙ্গে ক্রসফায়ারে ৬৪ জন, গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের সঙ্গে ক্রসফায়ারে ১২ জন, র‌্যাব ও পুলিশের ক্রসফায়ারে ১ জন, পুলিশের নির্যাতনে ৬ জন, র‌্যাবের নির্যাতনে ১ জন, পুলিশের গুলিতে ১৩ জন, র‌্যাবের গুলিতে ১ জন, র‌্যাব এবং পুলিশের গুলিতে ১ জন প্রাণ হারিয়েছে। বান্দরবানের লামায় সেনাবাহিনীর গুলিতে ১ জন, র‌্যাব হেফাজতে হার্ট অ্যাটাকে ১ জন, পুলিশ হেফাজতে অসুস্থ হয়ে ২ জন, পুলিশ হেফাজতে আত্মহত্যা করে ১ জন, পুলিশ হেফাজতে রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হয়েছে ১ জনের।
পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীর অভিযোগ মতে, সাদা পোশাকধারী ব্যক্তিরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে ৫০ জনকে আটক করেছেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এরমধ্যে সাতজন ফিরে এলেও ২ জনের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। পরবর্তী সময় ৩ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেছে।
এদিকে একই সময়ে কারা হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে ৩৮ জনের। তাদের মধ্যে কয়েদি ১৪ জন ও ২৪ জন হাজতি। রাজনৈতিক সংঘাতের ২৫৬টি ঘটনায় গত নয়মাসে নিহত হয়েছেন ৪৪ জন এবং আহত হয়েছেন তিনহাজার ৫০৬ জন। দেশের ৮টি বিভাগের বিভিন্ন স্থানে ৩৫ বার ১৪৪ ধারা জারি করে প্রশাসন।
চলতি বছরের নয়মাসে যৌন হয়রানি ও সহিংসতা, ধর্ষণ ও হত্যা, পারিবারিক নির্যাতন, যৌতুকের জন্য নির্যাতন, গৃহকর্মী নির্যাতন, এসিড নিক্ষেপ, সালিশ ও ফতোয়ার মাধ্যমে নির্যাতনসহ নারী নির্যাতনের অনেক ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ১১৪ নারী। এ কারণে চারজন আত্মহত্যা করেছেন। যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে ২ জন নারী ও ৮ জন পুরুষ নিহত হয়েছেন। এছাড়া হয়রানি ও লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন আরো ১০৫ নারী-পুরুষ। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৫৮৮ নারী। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩৩ নারীকে। ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন ১১ জন নারী। এছাড়া ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছে ৭৭ নারীর ওপর।
পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন মোট ৩৪৬ নারী। এরমধ্যে ২৪২ নারীকে হত্যা করা হয়েছে। পারিবারিক নির্যাতনের কারণে আত্মহত্যা করেছেন ৩৯ নারী। এছাড়া শারীরিকভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন আরো ৬৫ নারী। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২২১ নারী। এরমধ্যে শারীরিক নির্যাতনের শিকার ৮৭ জন। যৌতুকের জন্য শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে ১০৭ জনকে। একই কারণে নির্যাতনের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছে সাতজন। এছাড়া স্বামীর সংসার থেকে বিতাড়িত হয়েছে ২০ নারী। সালিশ ও ফতোয়ার মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন আট নারী। এসিড সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন ২৭ নারী।
বিভিন্ন বাসাবাড়িতে কাজ করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৩৫ গৃহকর্মী। এরমধ্যে শারীরিক নির্যাতনের পর চারজনের মৃত্যু হয়েছে। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে একজনকে। এছাড়া রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে ১৩ জনের।
দেশের বিভিন্নস্থানে শিশুদের হত্যা ও নির্যাতনের সংখ্যাও আশঙ্কাজনক বলে প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত নয়মাসে এক হাজার ২১৭ জন শিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়েছে। এরমধ্যে ২৫২ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। ৭৭ শিশু আত্মহত্যা করেছে। নিখোঁজের পর ২৬ জন শিশু এবং বিভিন্ন সময়ে ৬৭ শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হয়েছে ২৪ শিশুর।
হিন্দু সমপ্রদায়ের ২৬টি বাসস্থানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ, ১৬৬টি প্রতিমা ভাঙচুর, মন্দির ও পূজামণ্ডপে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ১ জন নিহত ও ৫৭ জন আহত হয়েছেন।
একই সময়ে ৮৩ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে নির্যাতন, হয়রানি, হুমকি ও পেশাগত কাজ করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। এছাড়া সমকালের স্থানীয় প্রতিনিধি আব্দুল হাকিম শিমুল সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে মেয়রের গুলিতে নিহত হন।
সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে ১০ জন ও শারীরিক নির্যাতনে ৬ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ২৬ জন। অপহরণের শিকার ৩৭ জন। এছাড়া অপহরণের পর বিজিবির মধ্যস্থতায় ফেরত এসেছেন ১৩ জন।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

সূত্র : মানবজমিন অনলাইন পত্রিকা