আওয়ামী লীগের দুর্গে হানা দিতে চায় বিএনপি

30

আগামী নির্বাচন নিয়ে নানা হিসাব-নিকাশ আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে খ্যাত খুলনা-১ আসনে। দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের দখলে থাকা এ আসনটি এবার বিএনপি ছিনিয়ে নিতে চায়। কিন্তু বিএনপি নির্বাচনে যাবে কিনা? গেলে কিভাবে যাবে? এসব নানা প্রশ্ন নেতাকর্মীদের মধ্যে। তবে যে প্রশ্নই থাকুক সম্ভাব্য প্রর্থীরা বসে নেই। উঠান বৈঠক, বিয়ের অনুষ্ঠান, খেলার প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছেন সমানতালে। গত রমজানের ঈদকে কেন্দ্র করে জমে ওঠে নির্বাচনী ময়দান। ঈদগাঁহ থেকে শুরু করে ঘরে ঘরে চলে সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রচারণা। খুলনা-১ আসনটি আওয়ামী লীগের নির্ধারিত। কথায় বলে আওয়ামী লীগ থেকে কলাগাছ দাঁড় করালেও নৌকা জয়ী হবে এ আসনে। আর এ কারণে এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের টিকিট পেতে নেতায়-নেতায় যুদ্ধ লেগেই থাকে। আগামী নির্বাচন নিয়েও সে আলামত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নির্বাচনী লড়াইয়ের আগে প্রার্থীরা তাই এ মুহূর্তে মনোনয়ন যুদ্ধে নেমেছে। দলীয় টিকিট পেতে তদবির, লবিং-এর পাশাপাশি এলাকাও চষে বেড়াচ্ছেন।
খুলনা জেলার সুন্দরবনঘেঁষা দাকোপ ও বটিয়াঘাটা উপজেলা নিয়ে খুলনা-১ আসন গঠিত। এই আসনে আওয়ামী লীগের রয়েছে অর্ধডজনেরও বেশি প্রার্থী। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ বিরোধও চাঙ্গা। নির্বাচনকে ঘিরে এ বিরোধ শেষ পর্যন্ত মেটাতে না পারলে আওয়ামী লীগে শুরু হতে পারে গৃহবিবাদ। এক্ষেত্রে কেউ কেউ বিদ্রোহী হয়ে নির্বাচনী ময়দানে নামতে পারেন। এমনটাই শঙ্কা করছেন নেতা-কর্মীরা। অন্যদিকে একক প্রার্থী নিয়ে স্বস্তিতে রয়েছে বিএনপি।
এ আসন থেকে ১৯৯৬ সালে নির্বাচন করেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। সে নির্বাচনে বিপুল ভোটে তিনি জয়ী হন। পরে আসনটি ছেড়ে দিলে মনোয়ন পান জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হারুনুর রশীদ। কিন্তু বেঁকে বসেন পঞ্চানন বিশ্বাস। তিনি দলের বিরুদ্ধে গিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। হারুনুর রশীদকে হারিয়ে তিনি এমপি নির্বাচিত হন।
সূত্র মতে, খুলনা জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শেখ হারুনুর রশীদ এবার খুলনা-১ আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশী। তিনি নিয়মিত দাকোপ ও বটিয়াঘাটা উপজেলায় দলীয় বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন। তিনি ১৯৯১ সালে এই আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে বিরোধীদলীয় হুইপের দায়িত্ব পালন করেন। জেলার শীর্ষ নেতা হওয়ায় মনোনয়নের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা পাবেন বলে তার অনুসারীরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তাছাড়া তিনি জেলা পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান হওয়ায় এলাকায় অনেক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড করেছেন। শেখ হারুনুর রশিদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে খুলনার ৯টি উপজেলায় দলীয় ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছি। নেত্রী দলীয় প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন দিলে নির্বাচন করবো।
অন্যদিকে বর্তমান এমপি ও বটিয়াঘাটা উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি পঞ্চানন বিশ্বাস আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী। তিনি জানান, সংসদ সদস্যের দায়িত্ব পালন ও দলীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের পাশাপাশি আগামী নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পঞ্চানন বিশ্বাস এ আসন থেকে তিন তিনবার নির্বাচিত এমপি। সাবেক সংসদ সদস্য ননী গোপাল মণ্ডল ২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করলেও জয়ী হতে পারেননি। তাকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। যদিও পরে বহিষ্কার আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। এবারও মনোনয়ন পাওয়ার জন্য তিনি জোরালোভাবে দাবি করবেন বলে তার অনুসারীরা জানিয়েছেন।
দাকোপ উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ আবুল হোসেন এ আসনে মনোনয়ন পাওয়ার জন্য বেশ জোরেশোরেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়া বটিয়াঘাটা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আশরাফুল আলম ইতিমধ্যেই সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী হবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। তার অনুসারীরা এলাকায় পোস্টার ও ব্যানার লাগিয়ে প্রচারণা শুরু করেছে। বটিয়াঘাটা সদর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মনোরঞ্জন মন্ডলও মনোনয়ন পেতে দেনদরবার চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে এ আসনে আওয়ামী লীগের বেশি প্রার্থী থাকায় দলীয় কোন্দল সামাল দিতে প্রধানমন্ত্রীর চাচাতো ভাই শেখ সালাউদ্দিন জুয়েল অথবা শেখ সোহেলকে প্রার্থী ঘোষণা করতে পারে হাইকমান্ড। এমন কথা শোনা যাচ্ছে। সেটা কতটুকু সত্য তা সময়ই বলে দেবে।
এদিকে একক প্রার্থী নিয়ে স্বস্তিতে আছে বিএনপি তথা ২০ দলীয় জোট। অন্য কোনো প্রার্থী না থাকায় জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমির এজাজ খানের মনোনয়ন প্রায় নিশ্চিত। বিগত দু’টি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে তিনি প্রার্থী হলেও পরাজিত হন। আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এ দুর্গে আঘাত হানতে চাইছে ২০ দলীয় জোট। আমির এজাজ খান দাবি করেন এলাকার মানুষ এবার তার পক্ষে রয়েছে। নির্বাচন সুষ্ঠু হলে এবারের ফলাফল তার পক্ষে যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এছাড়া জাতীয় পার্টি প্রেসিডিয়াম সদস্য ও পার্টির চেয়ারম্যানের প্রেস সেক্রেটারি শুনীল শুভ রায় জনসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি এলাকায় প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন আগামী নির্বাচনে মহাজোটের পক্ষ থেকে এ আসনে তাকেই মনোনয়ন দেয়া হবে। ইতিমধ্যেই তিনি আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন। ইসলামি দলগুলোর সাংগঠনিক কার্যক্রম তেমন একটা দেখা না গেলেও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ তাদের প্রার্থী হিসেবে আলহাজ মাওলানা আবু সাঈদকে ঘোষণা দিয়েছেন।
উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পর ১৯৮৮ সালে এরশাদের বিতর্কিত নির্বাচনে শেখ আবুল হোসেন এ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ওই নির্বাচন ছাড়া সব নির্বাচনেই খুলনা-১ দাকোপ-বটিয়াঘাটা আসনে জয়লাভ করেছে আওয়ামী লীগ। হিন্দু সম্প্রদায় অধ্যুষিত এ আসনটি আওয়ামী লীগের ‘রিজার্ভ’ আসন হিসেবে পরিচিত। ১৯৯১ সালে এ আসনে শেখ হারুনুর রশীদ, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে পঞ্চানন বিশ্বাস এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে ননী গোপাল মন্ডল নির্বাচিত হন।