আজ ঝিনাইগাতী কাঁটাখালীতে গনহত্যা দিবস

64

আজ ৬ জুলাই ঝিনাইগাতী উপজেলার কাঁটাখালী গনহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের এদিনে শেরপুরের ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ীর মধ্য সীমান্তবর্তী রাঙামাটি খাঠুয়াপাড়া গ্রামে ঘটেছিল নৃসংশ হত্যাকান্ড। এ যুদ্ধে শহীদ হন কোম্পানি কমান্ডার নাজমুল আহসান, আলী হোসেন ও মোফাজ্জল হোসেনসহ নাম না জানা আরো অনেক মুক্তিকামী সিপাহী জনতা। স্বাধীনতার ৪ দশক পেড়িযে গেলেও তালিকায় নাম নেই শহীদদের, নেই কোন স্মৃতি স্তম্ভ, কালের স্বাক্ষী হয়ে পড়ে আছে ঝিনাইগাতী উপজেলার ঐতিহাসিক কাঁটাখালী ব্রীজটি।

১৯৭১ এর জুলাই মাসের ৪ তারিখ শনিবার ভোরে কোম্পানি কমান্ডার নাজমুল আহসানের নেতৃত্বে ৫৩ জনের একটি মুক্তিযোদ্ধা দল অবস্থান নেন মালিঝিকান্ধা ইউনিয়নের রাঙামাটি গ্রামের আতর আলীর বাড়ীতে। পরিকল্পনা মতে ৫ জুলাই রাতে সফলতার সাথে অপারেশন শেষ করে মুক্তিযোদ্ধারা দুটি দলে বিভক্ত হয়ে আশ্রয় নেয় খাটুয়াপাড়ার হাজী নঈমদ্দিন ও হাজী শুকুর মামুদের বাড়িতে। বাড়ির চারপাশে বিল মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান টের পেয়ে এলাকার রাজাকার আলবদররা ঝিনাইগাতী আহম্মদ নগর পাকসেনা ক্যম্পে খবর দেয়।

৬ জুলাই সোমবার সকালে কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই গ্রামে প্রবেশের একটি মাত্র কাঁচা সড়কের দু’দিক থেকে ব্যারিকেড দেয় পাকসেনা ও রাজাকার আলবদররা। গ্রামবাসীদের অনুরোধে মুক্তিযোদ্ধারা বিলের পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মরক্ষার্থে গুলি করতে করতে পিছু হটে। এ সময় পাকহানাদারদের বেপরোয়া গোলা বর্ষণে কোম্পানি কমান্ডার ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল অনুষদের শেষ বর্ষের মেধাবী ছাত্র নাজমুল আহসান, তার চাচাত ভাই মোফাজ্জল হোসেন ও ভাতিজা আলী হোসেন শহীদ হন। বাকি মুক্তিযোদ্ধারা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান পেলেও, বর্বরোচিত হামলার শিকার হন খাটুয়াপাড়া রাঙ্গামাটি গ্রামের বাসিন্দারা। তাদের ৬০-৭০ জনকে কোমড়ে দড়ি বেঁধে লাঠিপেটা করতে করতে নিয়ে যাওয়া হয় বর্তমান খাটুয়াপাড়া বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে। আগুন লাগিয়ে দেয় বাড়িঘরে। ধর্ষণ করা হয় নারীদের। অমানবিক নির্যাতন করে সারিতে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয় ৬ জন গ্রামবাসীকে। এরা হলেন, আয়াতুল্লাহ, সামেছ মিস্ত্রি, ফজলু হদি, আব্বাছ আলী, আমেজ উদ্দিন ও বাদশা আলী। আহত হন অনেকে। দালালদের বাঁধার মুখে সেদিন লাশও দাফন করতে পারেননি শহীদদের স্বজনরা। কলার ভেলায় পিতার লাশ পুত্র ভাসিয়ে দিয়েছিলেন নদীতে। আরো ২৮ জন গ্রামবাসীকে বেঁধে রাঙামাটিয়ার কালীস্থানের বটগাছের নিচে এক সারিতে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হানাদার বাহিনী। সকলের মৃত্যু নিশ্চিত ভেবে পাকহানাদাররা চলে যায়। সেই ঘটনায় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায় ২৫ জন গ্রামবাসী। আহতরা এখনো শরীরে গুলি আর বেয়োনেটের ক্ষত চিহ্ন নিয়ে ধুকে ধুকে জীবন তরী পার করছে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজরিত এই গ্রামটিতে আজো লাগেনি আধুনিকতার ছোয়া নেই বিদ্যুত বা সহজ যাতায়াতের সুব্যবস্থা।

এলাকাবাসীর এখন একটাই দাবী মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ৩ বীর মুক্তিযোদ্ধার পাশাপাশি নিরিহ ৬ গ্রামবাসীকে শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি। সেই সাথে ঐতিহাসিক কাটাখালী ব্রীজটিকে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সংরক্ষণ করা হোক ।

শহীদদের স্বজনরা জানান, ১৯৭১ এর কাঁটাখালীতে হারানো স্বজনদের স্মরণে আজ বিশেষ প্রার্থনা, দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে এবং দিনব্যপী শোক পালিত হবে।