আমাকে খুঁজে কথা বলেন পন্টিং

47

আফতাব আহমেদ এখন হারিয়ে যাওয়া এক তারকার নাম। ২০০৪-এ চট্টগ্রামের এই ক্রিকেটারের আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়েছিল। প্রতিভা যা ছিল তার সবটুকু বিকশিত হওয়ার আগেই হারিয়ে যান তিনি। তবে ছয় বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে খেলেছেন ১৩ টেস্টও। যার মধ্যে ২০০৬-এ অস্ট্রেলিয়া সিরিজটি তিনি মনে রেখেছেন আলাদাভাবে। মাঠ ও মাঠের বাইরের ঘটনা মিলিয়ে তার ক্যারিয়ারে সেটিই স্মরণীয় সিরিজ। ১১ বছর পর আবারো টেস্ট খেলতে আসছে অস্ট্রেলিয়া। খেলা হবে তার নিজ শহর চট্টগ্রামে। তাই অজিদের বিপক্ষে জমজমাট এক টেস্ট দেখতে মুখিয়ে আছেন তিনি। আশা করছেন তাদের দুঃখ ভুলিয়ে দেবেন তামিম, মুশফিকরা। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তার সঙ্গে খেলার স্মৃতি নিয়ে কথা বলেছেন । সেই কথোপকথনের মূল অংশ তুলে ধরা হলো-
প্রশ্ন: অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট আপনার ক্যারিয়ারে কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
আফতাব: আমি অভিষেকের পর খুব দ্রুত ৮টি টেস্ট খেলেছিলাম। এরপর আরও ৫ ম্যাচ খেলার সুযোগ হয় যার মধ্যে অস্ট্রেলিয়া সিরিজটি আমি এখনো ভুলতে পারি না। মাঠ ও মাঠের বাইরের প্রতিটি ঘটনা এখনো আলাদাভাবে মনে করি। টেস্টে রান করা কতটা কঠিন আমি সেবার বুঝেছিলাম। ফতুল্লাতে শাহরিয়ারকে দেখছিলাম অনেক সুন্দর ব্যাট করছে। শেন ওয়ার্নকে এত ভালো খেলছিল যে, ওর মতো বিশ্বখ্যাত বোলার সুবিধাই করতে পারছিলেন না। কিন্তু আমার জন্য সমস্যা হচ্ছিল। এক প্রান্তে শেন ওয়ার্ন অন্যপ্রান্তে স্টুয়ার্ট ম্যাকগিল। এদু’জনকে একসঙ্গে দেখা যেত না। কিন্তু সেবার আমাদের বিপক্ষেই দু’জন একসঙ্গে বল করছিলেন। আমি রান করতে গিয়ে এলোমলো হয়ে যাই। শেষ পর্যন্ত ম্যাকগিলকেই ২৯ রানের সময় উইকেট দিয়ে আসি। সেই সিরিজটি আমার জন্য মোটেও ভালো যায়নি। তবে ওদের বিপক্ষে খেলার অভিজ্ঞতা আমার ক্যারিয়ারে অনেক কাজে এসেছে।
প্রশ্ন: ফতুল্লাতে পন্টিংরা ভড়কে গিয়েছিলেন?
আফতাব: পন্টিংয়ের নেতৃত্বে সেবার যারা খেলতে এসেছিলেন তারা এখনো অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেটের অন্যতম প্রতিভা। কিন্তু ওরা যখন দেখলো নাফীস, রাজিন ভাই, সুমন ভাই ব্যাটে পাত্তা দিচ্ছিল না তখন ভীত হয়ে ওঠে। অস্থিরতা কাজ করছিল ওদের মধ্যে। চিন্তাই করতে পারেনি এমন হবে। বিশেষ করে শেন ওয়ার্ন আর পন্টিংকে দেখছিলাম লাল হয়ে উঠতে। ওরা এমনিতেই স্লেজিং করে তখন এর মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ওরা বিশ্বমানের দল ছিল আর আমরা নতুন।
প্রশ্ন: সেই টেস্ট থেকে কি পেয়েছিলেন?
আফতাব: আত্মবিশ্বাস- এটাই ছিল আমার সেই টেস্টের প্রাপ্তি। যদিও এরপর নানা কারণে আমি বেশি টেস্ট খেলতে পারিনি। কিন্তু ৮৫ ওয়ানডে খেলেছি, যেখানে আমার বেশ কয়েকটি ভালো ইনিংস ছিল এর আত্মবিশ্বাসটা এসেছিল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলার পর থেকে। কারণ ওরা মাঠে যেমনই হোক বাইরে ছিলো অসাধারণ মানুষ। বিশেষ করে অ্যাডাম গিলক্রিস্ট ও পন্টিংতো দারুণ মানুষ। খেলা শেষে আমাকে খুঁজে পন্টিং কথা বলেছেন। আমি খুব আগ্রহ নিয়ে পন্টিংয়ের কাছ থেকে নিজের ব্যাটিংয়ের ব্যাপারে পরামর্শ নিয়েছি। গিলক্রিস্টকে আলাদাভাবে মনে রাখবো কারণ তিনি আমাকে অনেক পরামর্শ দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, তিনি নিজে থেকে আমাদের ড্রেসিং রুমে এসেছিলেন কারো কিছু লাগবে কিনা তা জেনেছেন। এ বিষয়গুলো আমাকে অনেক আত্মবিশ্বাসী করেছে। এখন যা আমি আমার একাডেমির ছেলেদের মধ্যেও ছড়িয়ে দিতে পারছি।
প্রশ্ন: মাঠের কোন ঘটনা আপনাকে আলাদাভাবে সেইদিনে ফিরিয়ে নিয়ে যায়?
আফতাব: ফতুল্লায় দারুণ খেলার আত্মবিশ্বাস নিয়ে চট্টগ্রামে এসেছিলাম। কিন্তু এখানে আমরা ভালো করিনি। চট্টগ্রাম টেস্টে মন খারাপ করে দেয়ার মতো এক লজ্জাজনক ঘটনা ঘটেছিল। আমি বলবো সেটি ছিল অভিশপ্ত দিন। পুলিশ মাঠে ঢুকে সাংবাদিকদের উপর হামলা করেছিল। মাঠের মধ্যে ক্রীড়া সংবাদিকদের যেভাবে মারছিল তাতে আমরাই নয়, অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটাররাও শেম শেম বলছিল। তারা ভীষণ অবাক হয়েছিলেন ক্রিকেট মাঠের মতো সুরক্ষিত একটি জায়গাতে দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনী এমন ঘটনা ঘটাতে পারে কিভাবে!
প্রশ্ন: বর্তমান দল নিয়ে কতটা আশাবাদী?
আফতাব: ১১ বছর আগে অস্ট্রেলিয়া মনে করেছিল তারা এখানে হেসে-খেলে জিতে যাবে। এখন কিন্তু সেই চিন্তা নিয়ে তারা আসতে পারছে না। এত বছরে দুই দলের মধ্যে এখন বড় পার্থক্য এটাই। এ পাথর্ক্যটা সৃষ্টি করেছে কিন্তু এ সময়ে খেলা আমাদের ক্রিকেটাররা। আমরা ঢাকায় ভালো করে চট্টগ্রামে খারাপ করেছিলাম; কারণ আমাদের ব্যাটিং, বোলিং তখন ধারাবাহিক ছিল না। এখন তামিম, ইমরুল বা সৌম্য না পারলে সাকিব, মুশফিক, মাহমুদুল্লাহরা তা পুষিয়ে নেয়। তরুণ যারা আছে তারাও দারুণভাবে সিনিয়রদের সাপোর্ট দিতে পারে। সেই সময় আমাদের দলে এমনটা ছিল না। দেশের মাটিতে ইংল্যান্ডকে হারানোর পর শ্রীলঙ্কার মাটিতে মুশফিকরা শততম টেস্ট জিতেছে। তাই অস্ট্রেলিয়ানরা এখন জানে এখানে এসে সহজে কিছু করে চলে যেতে পারবে না।
প্রশ্ন: অস্ট্রেলিয়ার নতুন এই দলে কে হুমকি হতে পারে?
আফতাব: অবশ্যই স্পিনার নাথান লায়ন আমাদের জন্য অনেক বড় হুমকি হবে। ও ভীষণ স্মার্ট বোলার। ওর বলে যে টার্ন তা অসাধারণ। যে কোনো পিরিস্থিতিতে আমাদের ধস নামিয়ে দিতে পারে। তবে আমি এতে ভয় পেতে বা ওকে নিয়ে চাপ নেয়ার কথা বলছি না। আমি বলছি ওকে নিয়ে আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। চাপ উড়িয়ে দিয়ে ওকে নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে আমাদের ব্যাটসম্যানদের। যেন উল্টো সে-ই চাপে থাকে। আর আমাদের দলেতো বিশ্বসেরা স্পিনার সাকিব আছেন। সঙ্গে মিরাজ, তাইজুলও অসাধারণ।
প্রশ্ন: মুমিনুল, সৌম্য সরকার ও ইমরুলকে কতটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন?
আফতাব: মুমিনুল তিন নম্বরে পরীক্ষিত ক্রিকেটার। ইমরুলও আমাদের ওপেনিংয়ে তামিমের সঙ্গে দারুণ জুটি। আমি সাবেক ক্রিকেটার ও একজন ক্রিকেট ভক্ত হিসেবে মনে করি অবশ্যই যেন পরীক্ষিতরা দলে সুযোগ পান। মুমিনুল অল্প সময় যা করে সে প্রতিভাবান বলেই করেছে। হ্যাঁ প্রতিটি ক্রিকেটারের খারাপ সময় যায়। সেখানে অবশ্য তাকে ভরসা দেয়া উচিত। বাকিটা ম্যানেজমেন্ট চিন্তা করে রেখেছে সেটি তাদের বিষয়। তবে আমরা চাই যেন সেরা দলটিই মাঠে নামে। যেন পরীক্ষিতদের ছুড়ে ফেলা না হয়।