আরসা কমান্ডার আতাউল্লাহ রোহিঙ্গাদের জন্য মুক্তির দূত, না কি অভিশাপ

39

শত্রুদের কাছে তিনি অপরিপক্ব ও বেপরোয়া। মিয়ানমারে তিনি বিদ্রোহ শুরু করার পর লাখ লাখ রোহিঙ্গার ওপর নেমে এসেছে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। কিন্তু আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) সমর্থকদের কাছে তিনি একজন অকুতোভয় যোদ্ধা, যিনি সৌদি আরবের বিলাসবহুল জীবন ত্যাগ করে রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করার চেষ্টা করছেন। তিনি হচ্ছেন, আরসার নেতা হাফিজ তোহার বা আতাউল্লাহ। মিয়ানমারভিত্তিক বিশ্লেষক রিচার্ড হোর্সে বলেন, তিনি মনোমুগ্ধকর ব্যক্তিত্বের অধিকারী। অন্যদের অনুপ্রাণিত করার ক্ষমতা রয়েছে তার মধ্যে। তার কথার ধরন নির্যাতিত সম্প্রদায়ের মনে দাগ কাটতে সক্ষম। বলা হয়, গত মাসে আতাউল্লাহ রাখাইনের সেনা ঘাঁটি ও পুলিশ স্টেশনে আক্রমণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। পাল্টা জবাবে নিরাপত্তা বাহিনী রাখাইনে সামরিক অভিযান শুরু করে। তবে অনেকে এই অভিযানকে মূলত রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ করার অভিযান হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। জাতিসংঘ অভিযানটিকে জাতিগত নিধনযজ্ঞের সঙ্গে তুলনা করেছে। এই নিধনযজ্ঞ থেকে প্রাণ বাঁচাতে ৪ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে আসে বাংলাদেশে।
আতাউল্লাহ গত বছরের অক্টোবরে প্রথম দৃশ্যপটে আসেন। অনলাইনে প্রকাশিত ভিডিওতে তার দলের আত্মপ্রকাশের ঘোষণা দেন। এর আগে তিনি মিয়ানমার সীমান্তবর্তী ঘাঁটিগুলোতে গুপ্ত হামলা চালান। এতে মুসলিম ও বৌদ্ধদের মধ্যে ধর্মীয় উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। আতাউল্লাহর ঘনিষ্ঠ কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, তার বয়স ৩০ বছরের কম। স্বল্প-প্রশিক্ষিত একটি সশস্ত্র দলের দেখভাল করেন তিনি। লাঠি, রামদা ও কিছু বন্দুক রয়েছে দলটির। ভিডিও বার্তায় আতাউল্লাহ মুখোশপরা এক অস্ত্রধারীকে পাশে রেখে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সরকার সংঘটিত অপরাধগুলো তালিকাভুক্ত করেন। অমানবিক নির্যাতন থেকে রোহিঙ্গাদেরকে মুক্ত করার অঙ্গীকার করেন।
বিলাসবহুল জীবন
আতাউল্লাহ পাকিস্তানের বন্দরনগরী করাচিতে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হয়েছেন। তার এক আত্মীয়ের ভাষ্যমতে, আতাউল্লাহর বাবা করাচিতে অবস্থিত বিখ্যাত দারুল উলুম মাদরাসায় পড়াশোনা করেন। তারপর সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেয়ার উদ্দেশে পরিবার নিয়ে সেখানে চলে যান। সেখান থেকে পরবর্তীতে যান তা’ইফে। আতাউল্লাহ সেখানকার একটি মসজিদে কোরআন তেলাওয়াত করতেন। তার এই কোরআন তেলাওয়াত বেশ কিছু ধনী সৌদির নজরে পড়ে। তারা আতাউল্লাহকে তাদের সন্তানদের পড়ানোর অনুরোধ করে। বেশ দ্রুতই তিনি ওই পরিবারের সঙ্গে মিশে যান। তাদের সঙ্গে গভীর রাত অবধি পার্টিতে অংশ নিতেন। এমনকি অত্যন্ত ব্যয়বহুল শিকারেও যেতেন। ওই আত্মীয় জানান, সৌদি নাগরিকরা আতাউল্লাহকে অনেক পছন্দ করতো। তাকে নিজেদেরই একজন বলে মনে করতো। কিন্তু ২০১২ সালে রাখাইনে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হওয়ার পর আতাউল্লাহ তার এ বিলাসবহুল জীবন ত্যাগ করে মিয়ানমারে ফিরে যান। যুদ্ধে যোগদান করেন। ওই দাঙ্গায় ১ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম বাস্তুচ্যুত হন।
জঙ্গি গোষ্ঠীর খোঁজে
প্রথমসারির জিহাদি দলগুলোর কাছ থেকে বন্দুক, যোদ্ধা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণের খোঁজে আতাউল্লাহ সৌদি আরব থেকে প্রথমে কয়েক লাখ ডলার নিয়ে পাকিস্তানে যান। সে সময় তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়া জঙ্গিরা এসব তথ্য জানিয়েছে। তিনি আফগানিস্তান, পাকিস্তানি জঙ্গি বাহিনী তালেবান ও কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদী দল ‘লস্কর-ই-তৈয়েবার’ সঙ্গে সম্পর্ক আছে এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাদের কাছে অর্থের বিনিময়ে সাহায্য চাইতেন। ২০১২ সালে আতাউল্লাহর সঙ্গে কাজ করেছে এমন এক সূত্র বলেছে, জনসম্মুখে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো মিয়ানমারের নিপীড়িত মানুষদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেছে। তাদের হয়ে জিহাদ করার কথাও বলেছে। তবে আতাউল্লাহকে সাহায্য করেনি।’ বেশিরভাগ পাকিস্তানি জঙ্গি গোষ্ঠী তার অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেয়ার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্যরা তার দেয়া অর্থ চুরি করেছে। তাকে অস্ত্র দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা পূরণ করেনি। পাকিস্তানি জেনারেল তালাত মাসুদ বলেন, বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠী মিয়ানমারে জিহাদ করার যে আহ্বান জানিয়েছে, সেসব শুধু মুসলিমদের সমর্থন অর্জনের উদ্দেশে জনসম্মুখে দেখানো একটি নাটক ছাড়া আর কিছুই না। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, আতাউল্লাহ একজন কট্টরপন্থি জাতীয়তাবাদী হিসেবে পাকিস্তান ত্যাগ করে। লোক দেখানো জিহাদিদের প্রতি তার এক ধরনের ঘৃণা নিয়ে পাকিস্তান ছাড়েন আতাউল্লাহ। আতাউল্লাহ রোহিঙ্গাদের হয়ে লড়া রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) মতো অন্য জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখা শুরু করেন।
সংকটের সৃষ্টি
এক সময় যেসব জিহাদিরা আতাউল্লাহকে পাত্তাই দেয়নি, রাখাইনে নতুন করে সহিংসতা শুরুর পর তারাই আরসার যোদ্ধাদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। আতাউল্লাহর সঙ্গে সম্পৃক্ত সূত্র জানিয়েছে, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের কারণে আরসার অস্ত্র ও চিকিৎসা সাহায্যের ব্যাপক প্রয়োজন থাকলেও আতাউল্লাহ জিহাদিদের এসব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। আতাউল্লাহর প্রশিক্ষণ শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি সূত্র জানিয়েছে, কেউ কেউ জেহাদি গোষ্ঠীগুলোর সাহায্যের প্রস্তাব গ্রহণ করার পরামর্শ দিলেও আতাউল্লাহ কোনো আগ্রহ দেখায়নি। সূত্র বলেছে, আতাউল্লাহর ভয়, আরসার সঙ্গে অন্য ধর্মীয় গোষ্ঠী সংযুক্ত হলে সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের সংগ্রামকে তারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে। আরএওস’র পাকিস্তান প্রতিনিধি নুর হাসান বার্মি বলেন, ‘বিদ্রোহীদের অসারত্ব ও অদূরদর্শিতা রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের জন্য আরো দুর্দশা বয়ে এনেছে।’ বার্মি বলেন, আতাউল্লাহ চায় না রাখাইনে আর কোনো দলের আগমন ঘটুক। তার ধারণা এতে করে তার অর্জন মøান হয়ে পড়বে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, আতাউল্লাহ রোহিঙ্গাদের রক্ষা করার যে লক্ষ্য নিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন তাতে রোহিঙ্গারা আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। হোর্সে বলেন, আরসা রোহিঙ্গা জনগণের অধিকার রক্ষা করার চেষ্টা করছে এটা মেনে নেয়া কঠিন। সংগঠনটি জনগণের (রোহিঙ্গা) জন্য ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ সংকট তৈরি করেছে।
(বার্তা সংস্থা এএফপিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনের অনুবাদ)

 

 

 

 

 

 

 

 

সূত্র : মানবজমিন অনলাইন পত্রিকা