আরেফার বুক ফাটা আর্তনাদ

30

অঝোর বৃষ্টিতে ভিজছেন আরেফা। বুকের সঙ্গে লেপ্টে আছে দু’বছর বয়সী কন্যা মিনারা। আরেফার চোখে নামছে শ্রাবণ ধারা। ছবিই বলে দেয়- আরেফার বুক ফাটা আর্তনাদের কথা। সাক্ষ্য দেয় কি অবর্ণনীয় দুর্দশায় আছেন রাখাইন থেকে আসা এই রোহিঙ্গা নারী। ছবিই যেন কথা বলছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী হত্যা করেছে তার স্বামী নবী হোসেনকে। সেই থেকে পৃথিবী তার কাছে অন্ধকারময়। তিনি কোনো দিশা খুঁজে পাচ্ছেন না। স্বামীর লাশ পিছনে ফেলে ৪০ বছর বয়সী আরেফা অজানার পথে পা বাড়িয়েছেন। মিয়ানমারের নৃশংসতার হাত থেকে নিজে বাঁচতে, দু’সন্তানকে বাঁচাতে বাংলাদেশে ছুটে এসেছেন আরেফা। নিজে অভুক্ত। অভুক্ত তার কন্যা। চিৎকার করছেন তিনি। আর্তনাদ করছেন। হাত পাতছেন। কিন্তু না, কোনো খাদ্য পাননি। ত্রাণ নিতে যে ‘যুদ্ধ’ করতে হয় তাতে বিজয়ী হতে পারছেন না। গত কয়েকদিনের বৃষ্টি তাকে আরো দুর্বিপাকে ফেলেছে। সন্তানদের কিভাবে বাঁচাবেন! নিজে কিভাবে বাঁচবেন! মানবতার ইতিহাসে সবচেয়ে জঘন্য নির্মমতার শিকার হয়ে আরেফা এখন কক্সবাজারের বালুখালিতে। তার কোনো খাবার নেই। আশ্রয় নেই। রান্না করার মতো কোনো উপায় নেই। কি করবেন তিনি! কিভাবে বাঁচাবেন সন্তানদের! এক আরেফার মতো আরো শত শত আরেফা ঠাঁই নিয়েছেন কক্সবাজারে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নৃশংস নির্যাতন, ক্ষত নিয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে অসংখ্য মানুষ। তার মধ্যে রয়েছে শিশুরাও। তাদের দুর্বিষহ জীবন নিয়ে রিপোর্ট করেছে অনলাইন আল জাজিরা। এতে বলা হয়, শরণার্থী শিবিরগুলোর চারদিকে শুধু বিশৃঙ্খলা। কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ত্রাণবোঝাই ট্রাক দেখলেই হুমড়ি খেয়ে পড়ছে শত শত রোহিঙ্গা। এ যুদ্ধে শরীক নিঃসঙ্গ শিশুরাও। ট্রাক থেকে ছুড়ে দেয়া হচ্ছে ত্রাণের প্যাকেট। তা নিয়ন্ত্রণে নিতে রীতিমতো যুদ্ধ করছেন রোহিঙ্গারা। অনেক নারী সদ্যজাত শিশুকে কাঁধে নিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন। মৌসুমী বৃষ্টি তাদের পেটের আগুন নেভাতে পারে না। তারা বাধ্য হয়ে টানা দাঁড়িয়ে থাকেন বৃষ্টির ভেতর। তাদের আশা যদি কেউ কিছু খাদ্য, তারপুলিন ও কাপড়-চোপড় দেয়। বালুখালিতে সৃষ্টি হয়েছে এক অবর্ণনীয় চিত্র। আশ্রয় গ্রহণকারী রোহিঙ্গারা পাচ্ছেন না থাকার মতো যথাযথ আশ্রয়। নেই পরিষ্কার পানি। নেই পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থা। এক মায়ের আঁচলে শুয়ে বেদনায় কুঁকড়ে উঠছিল এক শিশু। তার শরীরের বিভিন্ন অংশ, মুখমণ্ডল ও হাত পুড়ে গেছে। এক মা এক প্রান্তে পড়ে আছেন। তাকে তালিকাভুক্ত করা হয়নি। তার সারা শরীর পুড়ে গেছে। এমনই বীভৎস চিত্র কক্সবাজার সদর হাসপাতালে। সেখানে রোহিঙ্গাদের আর্তনাদে বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। ৩০ বছর বয়সী একজন রোগী শাহিদা বেগম। তিনি বলেছেন, সেনাবাহিনী এসেই আমার বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। ওই সময় আমি ছিলাম ঘরে। ঘর থেকে বের হওয়ার কোনো পথ ছিল না। আগুনের মাঝে জ্বলছিলাম আমি। পুড়ে যায় আমার সারা শরীর। সেই বেদনায় আমি অস্থির। আর সহ্য করতে পারছি না। এমন কষ্ট ভোগ করার চেয়ে মরে যাওয়াও ভালো ছিল। আমার বাড়িতে আগুন দেয়ার দু’দিন আগে আমার তিন ছেলের মধ্যে দু’জনকে হত্যা করা হয়। এখন যদি বেঁচেও থাকি তাহলে জীবন কখনো আর আগের অবস্থায় ফিরে যাবে না। ৫/৬ দিন আগে ওই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে দিলদার বেগম ও তার ১০ বছর বয়সী কন্যা নূর কলিমাকে। তাদের পরিবারে আর কেউ বেঁচে নেই। দিলদারের স্বামী, নবজাতক সন্তান ও শাশুড়ীকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমার পরিবারের ওপর হামলা চালানো হয় ২৯শে আগস্ট। সেনাবাহিনী এসেই বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। ওই হামলা থেকে কোনোমতে আমি আর আমার মেয়ে পালাতে পেরেছি। কিন্তু সেনাবাহিনীর সঙ্গে যে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা ছিল তারা বড় এক ছুরি নিয়ে আমাদেরকে হত্যার চেষ্টা করে। কিন্তু তারা যখন মনে করে আমরা মরে গেছি তখন তারা আমাদেরকে ফেলে যায়। আমরা ঘরের ভেতর মড়ার মতো লুকিয়ে ছিলাম তিনদিন। তারপর পালাই। কিন্তু সীমান্তে পৌঁছা ছিল খুব কঠিন। বেদনায় আমি বার বার ভেঙে পড়ছিলাম। মিয়ানমার থেকে পালানোর সময় পা পিছলে পড়ে ৮ বছর বয়সী মোহাম্মদ আনাস। এতে তার মুখে বড় ক্ষত হয়। তার সঙ্গে রয়েছে তার চাচা সৈয়দ আলম। তিনি বলেন, আমরা মান্দুয়া হেলার লানখালি গ্রামের বাসিন্দা। পবিত্র ঈদুল আজহার তিনদিন আগে আমাদের গ্রামে হামলা হয়। আমরা পার্শ্ববর্তী পাহাড়ের আড়ালে আত্মগোপন করি। আমার পরিবারের ১০ জন সদস্য ছিল। কিন্তু এখন মাত্র ৬ জন আছে। এরা বাংলাদেশে পৌঁছাতে পেরেছে। বাকিদের কি হয়েছে তা জানি না। এমনি নির্মমতা যখন চালানো হয়েছে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে তখন মিয়ানমারের সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং ঔদ্ধত্য দেখিয়ে বলেছেন, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের কোনো জাতি সম্প্রদায় নয়। তারা বাঙালি। অর্থাৎ তিনি বলতে চেয়েছেন রোহিঙ্গারা বাংলাদেশি। তিনি তীব্র সমালোচনা করেছেন রোহিঙ্গা মুসলিমদের। আর তার সহযোগী, কার্যত মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সুচি তো রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী, বাঙালি বলে স্বস্তির ঢেঁকুর তুলেছেন। তাকে দৃশ্যত সমর্থন দিচ্ছে ভারত, চীন ও রাশিয়া। এর কারণ একটিই, তাহলো আঞ্চলিক রাজনীতি। আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রাধান্য বিস্তার করতে হলে মিয়ানমারকে প্রয়োজন যেমন ভারতের, তেমনি প্রয়োজন চীনের। চীন এরই মধ্যে মিয়ানমারে অনেকটা অগ্রসর হয়েছে। তাতে গাত্রদাহ শুরু হয়েছে ভারতের। তাই তারাও এই গণহত্যা, গণধর্ষণ, অগ্নিসংযোগের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বিনিময়ে মিয়ানমারের কাছ থেকে আঞ্চলিক রাজনীতির সুবিধা আদায় করা। চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এমনিতেই বিরোধপূর্ণ। গত মাসে তো দোকলাম সীমান্ত নিয়ে দু’দেশ যুদ্ধংদেহী অবস্থানে চলে যায়। তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয় এশিয়া তথা বিশ্বজুড়ে। এহেন সম্পর্কের ভেতর চীনের সামনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রবেশদ্বার মিয়ানমারকে ছেড়ে দেবে ভারত! এমন কোনো প্রশ্নই হতে পারে না। আর এই আঞ্চলিকতার লড়াইয়ে বলি হচ্ছে নিরপরাধ রোহিঙ্গা মুসলিম। তার মধ্যে হিন্দুরাও আছেন।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

সূত্র : মানবজমিন অনলাইন পত্রিকা