”আল–কায়েদা তৎপরতা বাড়ছে বাংলাদেশে” যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের উপকমিটির শুনানিতে বিশেষজ্ঞ মত

29

আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী আল-কায়েদা ভারতীয় উপমহাদেশে আরও সক্রিয় ও শক্তিশালী হচ্ছে। বাংলাদেশেও এদের তৎপরতা বাড়ছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি–সংক্রান্ত উপকমিটির শুনানিতে তথ্য দিয়েছে একটি মার্কিন গবেষণা সংস্থা। শুনানিতে বলা হয়েছে, উপমহাদেশে চলতি বছর তারা কয়েক শ সদস্য নিয়োগ করেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সম্প্রতি বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্যে পাকিস্তান ও ভারতে আল-কায়েদা অনুসারীদের তৎপরতা বেড়েছে বলে তাঁদের কাছেও মনে হয়েছে। তবে বাংলাদেশে আল-কায়েদার তৎপরতা বাড়ছে বলে যে তথ্য এসেছে, এখানকার বর্তমান বাস্তবতায় তা ঠিক নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের একটা প্রক্রিয়া হলো এমন শুনানি। এ রকম একটি শুনানিতে বৃহস্পতিবার দেশটির প্রতিনিধি পরিষদের ‘কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স’বিষয়ক হোমল্যান্ড সিকিউরিটির উপকমিটির সভায় একটি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করে র‍্যান্ড করপোরেশন। মার্কিন সামরিক বাহিনীকে গবেষণা ও বিশ্লেষণ সেবা দিয়ে থাকে এই সংস্থাটি। এর আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও সামরিক নীতি কেন্দ্রের পরিচালক সেথ জি জোনস ওই শুনানিতে অংশ নেন। এ বিষয়ে গতকাল ভারতের বার্তা সংস্থা পিটিআইসহ অনেক গণমাধ্যম সংবাদ প্রকাশ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে নাইন-ইলেভেনের হামলার পর হোমল্যান্ড সিকিউরিটি দপ্তর গঠন করে। প্রভাবশালী এই দপ্তরের কাজ দেশের মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তা দেওয়া, সীমান্ত সুরক্ষা, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা এবং অভিবাসন–সংক্রান্ত বিষয় দেখা।

বৃহস্পতিবার হোমল্যান্ড সিকিউরিটি–সংক্রান্ত উপকমিটির শুনানিতে বলা হয়, ইসলামিক স্টেটের (আইএস) কথিত খিলাফত ইরাক ও সিরিয়ায় অব্যাহত চাপের মুখে রয়েছে। এখন বৈশ্বিকভাবে ‘জিহাদিদের’ নেতা হতে চেষ্টা চালাচ্ছে আল-কায়েদা।

শুনানিতে উপস্থাপিত গবেষণাপত্রে সেথ জি জোনস বলেন, আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখা (একিউআইএস) চলতি বছর পর্যন্ত কয়েক শ সদস্য দলে নিয়েছে। আফগানিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশে তাদের অনেক সেল আছে। গত ৫ বা ১০ বছরের মধ্যে এখন আফগানিস্তানে তাদের উপস্থিতি বেশি। এই বিশেষজ্ঞের মতে, বাংলাদেশে আল-কায়েদা বিশেষভাবে সক্রিয়। আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখা তাদের নিজস্ব প্রচারমাধ্যম আস-সাহাবের মাধ্যমে ক্রমাগত প্রচারণা চালাচ্ছে। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে আল-কায়েদার নেতা আয়মান আল জাওয়াহিরি সংগঠনটির ভারতীয় উপমহাদেশ শাখা খোলার ঘোষণা দেন।

যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটির উপকমিটির শুনানিতে বাংলাদেশে আল-কায়েদার তৎপরতা বাড়ছে বলে যে বিশেষজ্ঞ মত এসেছে, সে ব্যাপারে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান গতকাল বলেন, ‘এসব কিছু নয়। এগুলো তারাই বানায়। এ দেশে কোনো আল-কায়েদা নেই। ফেসবুক ও সোশ্যাল ওয়েবে কিছু পথভ্রষ্ট লোকজন লেখে। আর এগুলো দেখে তারা এসব বলে। এদের নিয়ে শঙ্কার কিছু নেই।’

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলাম নিজেদের আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখার (একিউআইএস) বাংলাদেশ শাখা দাবি করে আসছে। সংগঠনটি আনসার আল ইসলাম নাম ধারণের আগ পর্যন্ত আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নামে পরিচিত ছিল।

২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্লগার রাজীব হায়দারকে ঢাকায় নিজ বাসার সামনে কুপিয়ে হত্যা করার পর এই সংগঠনটি আলোচনায় আসে। এরপর একের পর এক ব্লগার ও ভিন্নমতাবলম্বী লেখক ও প্রকাশককে হত্যা করে ব্যাপক আলোচনায় আসে। সর্বশেষ গত বছরের ২৫ এপ্রিল রাজধানীর কলাবাগানে বাসায় ঢুকে সমকামীদের অধিকারকর্মী জুলহাজ মান্নান ও নাট্যকর্মী মাহবুব তনয়কে হত্যা করে এই গোষ্ঠী। এরপর থেকে এ পর্যন্ত এই জঙ্গিগোষ্ঠীর আর কোনো হত্যাযজ্ঞের খবর পাওয়া যায়নি। আনসার আল ইসলাম মোট ১১টি হত্যার দায় স্বীকার করেছে। এ ছাড়া আরও কয়েকটি হামলা ও কয়েকজনকে আহত করার ঘটনার জন্যও এই গোষ্ঠীকে দায়ী করা হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অব্যাহত অভিযানে এরা একেবারেই কোণঠাসা। এখন খুব সামান্য মাত্রায় সদস্য নিয়োগের কিছু তৎপরতা চালাচ্ছে। এদের যে নেতারা এখনো ধরা পড়েননি, তাঁরা পরস্পরের মধ্যে যোগাযোগ করছেন বলে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে। সদস্য উদ্বুদ্ধকরণের জন্য এরা ‘অনলাইন প্ল্যাটফর্ম’কে ব্যবহার করছে।

আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখা নিজেদের গণমাধ্যম আস-সাহাবের মাধ্যমে ক্রমাগত প্রচারণা চালাচ্ছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞ সেথ জি জোনস যে তথ্য দিয়েছেন, সে প্রসঙ্গে ঢাকায় কাউন্টার টেররিজমের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রচুর সংখ্যায় বেনামি পেজ খুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কথিত জিহাদি কথাবার্তা ছড়ানো হচ্ছে। এগুলোতেও নজরদারি রয়েছে। এই ‘অনলাইন জিহাদিদের’ লেখা দেখে মনে হতে পারে দেশ জঙ্গিতে ভরে গেছে, রক্তারক্তি আসন্ন। কিন্তু বিষয়টি এ রকম নয়।

গত বছরের ১ জুলাই হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে ৬৪ জন নিহত হন। এঁদের সবাই আইএস মতাদর্শের অনুসারী নব্য জেএমবি বা তাঁদের পরিবারের সদস্য (শিশু ও নারী)। অভিযানে নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে নব্য জেএমবির বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতাও রয়েছেন। তবে এখনো ধরা পড়েননি আল-কায়েদার আদর্শ অনুসরণকারী আনসার আল ইসলামের অনেক নেতা। এর মধ্যে আনসার আল ইসলামের কথিত সামরিক প্রধান সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক অন্যতম।

এই জিয়াউল হকের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের উপকমিশনার মহিবুল ইসলাম খান বলেন, আনসার আল ইসলামের অনেকেই গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁদের মাধ্যমে ওই চক্রে জড়িত আরও অনেককেই শনাক্ত করা হয়েছে। তবে এখন সংগঠনটির তৎপরতা নেই বললেই চলে। যাঁরা এখনো গ্রেপ্তার হননি, তাঁদের ধরতে চেষ্টা চলছে।

আনসার আল ইসলামের প্রচারণা কার্যক্রম প্রসঙ্গে মহিবুল ইসলাম বলেন, অনলাইনভিত্তিক কিছু প্রচারণা তাদের রয়েছে। এগুলো দেশ ও বিদেশ থেকে পরিচালিত হয়। সেগুলোও নিয়মিত নজরদারি করা হচ্ছে।

আল-কায়েদা বনাম আইএস

আইএস ওআল-কায়েদা সমর্থক উগ্রবাদীদের মধ্যে বাদানুবাদ ও গালিগালাজ চলছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। গত দুই মাসে বাংলাভাষী কয়েকটি কথিত ইসলামি বা জিহাদি অনলাইন গ্রুপ পর্যবেক্ষণ করে এমনটি দেখা গেছে। আল-কায়েদা ও আইএসের অনুসারীরা পরস্পরকে ‘খারিজি’ (ইসলাম থেকে দূরে সরে যাওয়া) বলে গালিগালাজ করে। আল-কায়েদার অনুসারীরা বলে থাকে, আইএস ‘গুমরাহির’ (পথভ্রষ্ট) মধ্যে রয়েছে। তারা আইএসকে নির্বিচারে মুসলিম হত্যার জন্যও দায়ী করে।

ইন্টারনেটে যোগাযোগ অ্যাপ টেলিগ্রামে আল-কায়েদা সমর্থকদের বাংলা ভাষার অনেক চ্যানেল রয়েছে, যেখানে আল-কায়েদা নেতাদের বক্তব্য ও লেখা বাংলায় অনুবাদ করে প্রকাশ করা হয়। সেখানে তাঁদের বক্তব্যের প্রচুর অডিও থাকে।