ওআইসি মহাসচিবের সফর প্রস্তুতি “রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জোর দেবে ঢাকা”

26

রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়াতে ওআইসিসহ বিশ্ব সম্প্রদায়ের আরও জোরালো ভূমিকা দেখতে চায় বাংলাদেশ। এ নিয়ে যেকোনো ফোরামে আলোচনায় রাজি ঢাকা। কর্মকর্তারা বলছেন, সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, সমাধানও সেখানেই খুঁজতে হবে। এ নিয়ে দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক যেকোনো ফোরামে আলোচনা হতে পারে। তবে সংকটের সমাধানে সবার আগে মিয়ানমারকে আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় জোট ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)’র মহাসচিব ড. ইউসেফ বিন আহমদ আল ওতাইমিনের আসন্ন ঢাকা সফরে এ বক্তব্যই তুলে ধরার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। আগামী বুধবার ৪ দিনের সফরে ঢাকা আসছেন তিনি। তার সফর প্রস্তুতিও প্রায় চূড়ান্ত। কিন্তু এ নিয়ে ঢাকা কিংবা ওআইসি’র তরফে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি। কূটনৈতিক সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য মতে, মহাসচিব হিসেবে ড. ওতাইমিনের দায়িত্ব নেয়ার পর এটিই তার প্রথম বাংলাদেশ সফর। সফরটি পরিচিতিমূলক হলেও বেশ তাৎপর্য। সফরকালে রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান ছাড়াও পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধির সঙ্গে তার সাক্ষাৎ-বৈঠক হবে। এছাড়া তিনি বাংলাদেশে অস্থায়ী আশ্রয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের অবস্থা সরজমিন দেখতে কক্সবাজার যাবেন। সেখানে প্রায় ৩ দশক ধরে শরণার্থী হিসেবে থাকা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের পাশাপাশি সমপ্রতি রাখাইনে বর্মী বাহিনীর নির্যাতন থেকে প্রাণে বাঁচতে পালিয়ে আসা মিয়ানমার নাগরিকদের সঙ্গেও কথা বলবেন। মহাসচিবের সফর প্রস্তুতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ঢাকার কর্মকর্তারা বেশ জোর দিয়েই বলছেন, বাংলাদেশ ও ওআইসি’র মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি মহাসচিবের সফরে গুরুত্ব পাবে। মিয়ানমারের সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অধিকারের বিষয়ে ওআইসি বরাবরই সরব। মুসলিম উম্মাহও তাদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে চলেছে। কিন্তু মিয়ানমারে তাদের জাতিগতভাবে নির্মূলের চেষ্টা বন্ধ হচ্ছে না। কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওআইসি’র গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু কর্মসূচি রয়েছে। সব ক’টিতেই বাংলাদেশ অংশ নেবে এবং উল্লিখিত ইস্যুতে জোরালো অবস্থান থাকবে বাংলাদেশের। আগামী সেপ্টেম্বরে কাজাখস্তানে ওআইসির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক কমসটেক সম্মেলন হবে। সেখানে প্রেসিডেন্ট আমন্ত্রিত। সবকিছু ঠিক থাকলে প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ এ সম্মেলনে অংশ নেবেন। চলতি বছরের সমাপনীতে বাংলাদেশে হবে ওআইসি পর্যটনমন্ত্রীদের সম্মেলন। ৫৭ মুসলিম জাতিরাষ্ট্রের ওই জোটের অন্তত ৩০ জন মন্ত্রী এবং শতাধিক কর্মকর্তা ঢাকায় জমায়েত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের পরবর্তী সম্মেলন হবে ঢাকায়। ২০১৮ সালে এটি হবে। সংস্থার ৪৫তম পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ওই সম্মেলনে প্রস্তুতি নিয়েও আলোচনা হবে মহাসচিবের সফরে। ওআইসিতে বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়ছে উল্লেখ করে এক কর্মকর্তা বলেন, সম্প্রতি বাংলাদেশ ওআইসি ট্রয়কার সদস্য হয়েছে। ওআইসির নির্বাহী কমিটির সদস্যপদও লাভ করেছে। এছাড়া ওআইসির স্বাধীন স্থায়ী মানবাধিকার কমিশনের সদস্যও নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের প্রার্থী রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জমির। উল্লেখ্য, সামপ্রতিক সময়ে ওআইসি’র পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনসহ সব বৈঠকে অংশ নিয়েছেন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিরা। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে ওআইসি ও মালয়েশিয়ার যৌথ আয়োজনে কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে রক্ষায় মিয়ানমারকে কড়া বার্তা দিয়েছিল মুসলিম বিশ্ব। রোহিঙ্গা সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করে নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেয়াসহ তাদের ওপর বর্বর নির্যাতন বন্ধসহ বেশ কিছু দাবি জানিয়েছিল সংস্থাটি। যার মধ্যে ছিল রাখাইনের উপদ্রুত এলাকায় শান্তি ও আন্তঃগোষ্ঠী স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। এ নিয়ে সরকারি উদ্যোগে সংলাপ আয়োজনের তাগিদও ছিল। বাংলাদেশ সেসব দাবির প্রতি জোরালো সমর্থন দিয়েছিল। রাখাইন পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক হয়নি উল্লেখ করে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা গতকাল মানবজমিনকে বলেন, ওআইসির এসব দাবি নিয়েও মহাসচিবের সঙ্গে আলোচনা হবে। বাংলাদেশের ৩৩ হাজার নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছে। তারা ক্যাম্পে বসবাস করেন। এর বাইরে কক্সবাজার এলাকায় আরও প্রায় ৩ লাখ অনিবন্ধিত মিয়ানমার নাগরিকের বাস। তাদের প্রকৃত সংখা জানতে একটি জনজরিপ হয়েছে। যার ফল এখনও প্রকাশ হয়নি। জাতিসংঘের তথ্য মতে, অতি সম্প্রতি নির্যাতনের ঘটনায় নতুন করে আরও প্রায় ৭০ হাজার রোহিঙ্গা রাখাইন থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।