কখন ফ্লাইট জানেন না অনেক হজযাত্রী

16

আজ নয়, কাল ফ্লাইট। প্রতীক্ষার দিনটি এলেই আবার একই কথা। কাল নয়, পরশু। এভাবে এজেন্সি ঘোষিত একাধিক তারিখ মিস হওয়ার পর পাসপোর্ট ও ভিসা হাতে পেয়েছেন অনেক হজযাত্রী। তখন তারা ভাবেন, এবার বুঝি ফ্লাইট নিশ্চিত হলো। কিন্তু না। অবশেষে আসছে ফ্লাইট বাতিলের খবর। গত দুই সপ্তাহে বাতিল হয়েছে ১৮টি হজ ফ্লাইট। এভাবে একের পর এক ঘোরানো হচ্ছে হজযাত্রীদের। ফলে অনেক হজযাত্রী এখনও জানেন না ঠিক কবে তাদের ফ্লাইট। এরই মধ্যে বাড়ি থেকে হজ ক্যাম্পে এসেও এমন অনিশ্চয়তায় নানা ভোগান্তির মধ্যে দিনের পর দিন পার করছেন তারা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের বালিয়াডাঙ্গা থেকে গতকাল শুক্রবার ঢাকায় হজ ক্যাম্পে আসেন মো. মমতাজুল হক। তার সঙ্গে একই জেলা থেকে আসেন ৪২ জন। অন্য এলাকার বাসিন্দাসহ তার দলে রয়েছেন ৮০ হজযাত্রী। শনিবার রাত ১১টায় তাদের ফ্লাইট হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেদিন ট্রাভেল এজেন্সি থেকে জানিয়ে দেয়া হয়, ফ্লাইট আজ নয়। রোববার বিকাল আড়াইটায়। কিন্তু এখনও তারা হাতে পাসপোর্ট-ভিসা পাননি। জানেন না কোন বিমানে সৌদি আরব যাবেন তাও। তবে তাদের মধ্য থেকে কিছু হজযাত্রীকে শনিবার সন্ধ্যায় প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে বলেও জানা গেছে।
মমতাজুল হক মানবজমিনকে বলেন, এজেন্সি থেকে বলার পর আমরা শুক্রবার ঢাকায় আসি। হজ ক্যাম্পে উঠি। কিন্তু পরে বলা হলো শনিবার ফ্লাইট হবে না। হবে রোববার আড়াইটায়। আসলে কবে ফ্লাইট হবে তা জানি না। অনিশ্চয়তার মধ্যে অপেক্ষা করছি। এখানে হজ ক্যাম্পে থাকা গেলেও খাওয়া-দাওয়া করতে হচ্ছে নিজের টাকায়। প্রতিদিন একজনের খাওয়ায় ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা খরচ হচ্ছে। আত্মীয়স্বজন দেখতে আসায় তাদেরও ভোগান্তি এবং খরচ হচ্ছে। কথা মতো যেতে পারলে তো এত ঝামেলা হতো না।
একই দলের অপর হজযাত্রী আশরাফুল হক বলেন, আমাদের দলের কারো হজের টাকা বাকি নেই। শেষ মুহূর্তে এখন হজ ক্যাম্পে এসেও জানি না কবে ফ্লাইট হবে।
তাদের ট্রাভেল এজেন্সি হলো নয়াটোলার রাজ ট্রাভেল এজেন্সি। ওই ট্রাভেল এজেন্সির কর্মকর্তা মাহবুবের মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগ করলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।
গতকাল দুপুরের পর ডরমেটরি-২ এ গিয়ে দেখা যায় বেশ কয়েক জনের একদল হজযাত্রী গোল হয়ে বসে হজের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করছেন। তাদের একেকজনের কাছ থেকে একেক অঙ্কের টাকা নিয়েছে এজেন্সি। কিন্তু তা সাংবাদিকের কাছে জানালে আরো ভোগান্তির আশঙ্কায় মুখ খোলতে রাজি নন তারা। মুখে আনতে চাননি এজেন্সির নামও। তাদের একজন বগুড়ার মাহতাব আলী। তিনি বলেন, কাল ফ্লাইট হবে এমন কথায় আমরা গত বৃহস্পতিবার হজ ক্যাম্পে উঠি। কিন্তু তিন দিনেও যাওয়া হলো না। আজ ফ্লাইট হওয়ার সম্ভবনা আছে বলে জানানো হয়েছে। তবে কখন কোন বিমানে ফ্লাইট হবে তার কিছুই জানি না। ২০১৬ সালে হজ করতে না পারা এবং একই ডরমেটরিতে গত ২৮ ও ৩১শে জুলাই এবং ৪ঠা আগস্ট ভোর ৬টায় ফ্লাইটের কথা থাকলেও তা না পাওয়া সেই ৩৭ যাত্রীর বিষয়ে খোঁজ নিতেই তারা বলেন শেষ পর্যন্ত তাদের ফ্লাইট হয়েছে। শুধু তারাই নয়। গতকাল হজ ক্যাম্পের দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম তলা পর্যন্ত বেশির ভাগ ডরমেটরিতে হজযাত্রীর উপস্থিতি দেখা গেছে। অনেক হজযাত্রী একের পর এক তারিখ পাচ্ছেন। আজকালের মধ্যে ফ্লাইটের কথা বলে তাদেরকে ঢাকায় আনা হয়েছে। অনেকে হজ ক্যাম্প, আবাসিক হোটেল ও আত্মীয়স্বজনের বাসায় উঠেছেন। সেখানে দিনের পর দিন বাড়তি খরচ ও ভোগান্তির মধ্যদিয়ে দিন পার করছেন তারা। তবে তার চেয়েও ফ্লাইটের অনিশ্চয়তা তাদেরকে বেশি টেনশন দিচ্ছে। ভোগাচ্ছে।
এ দিকে গত ২৪শে জুলাই থেকে শুরু হয়েছে হজযাত্রী পরিবহন। এবার বাংলাদেশ থেকে সৌদি সরকারের নির্ধারিত কোটা অনুযায়ী সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন হজব্রত পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবের মক্কা ও মদিনায় যাবেন। এদের অর্ধেক বহন করবে বাংলাদেশ বিমান ও বাকি অর্ধেক বহন করবে সৌদিয়া এয়ারলাইন্স। এরই মধ্যে সৌদি দূতাবাস থেকে ভিসা পাওয়া গেছে ৫৭ হাজার ৮৭৯ জনের। সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ডিও ইস্যু করা হয়েছে ৬৫ হাজার ১২ জনের। এর মধ্যে সর্বশেষ গতকাল একদিনে ৮ হাজার ৯৮৫ জনের ডিও ইস্যু করা হয়েছে। এরই মধ্যে হজের ভিসার জন্য লাউজম্যান্ট সম্পন্ন হয়েছে ৮৮ হাজার ১০২ জনের। এ পর্যন্ত ভিসা পাওয়া সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৩ হাজার ৮৪৪ ও বেসরকারি ৫৪ হাজার ৩৫ হজযাত্রীর মধ্যে গতকাল সকাল সোয়া ১১টা পর্যন্ত ৩৯ হাজার ২৪৮ হজযাত্রী সৌদি আরব গমন করেছেন। বাকি আরো ৪৭ হাজার ৯৫০ যাত্রীর কত জনকে যে এমন হয়রানি পোহাতে হবে বলা যাচ্ছে না। বেশ কিছু কারণে ভিসা ও ফ্লাইট প্রাপ্তিতে সৃষ্ট অনিশ্চয়তার কারণে হজযাত্রীরা এমন সব উটকো ভোগান্তিতে পড়ছেন বলে জানা গেছে। তবে এজন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো একে অপরকে দুষছে। তবে ভোগান্তির কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে হজ এজেন্সি ও মধ্যস্বত্ব্বভোগীর প্রতারণা ও অবহেলা, ভিসা পেতে বিলম্ব, ভিসার প্রিন্ট নিতে গিয়ে সার্ভার ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে আটকা পড়া, হজ অফিসের কর্মকর্তাদের অবহেলা, বাংলাদেশ বিমান ও সৌদি এয়ারলাইন্সের একের পর এক ফ্লাইট বাতিল ইত্যাদি। বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট বাতিল হওয়াকে এজেন্সিগুলো দুষলেও বিমানের কর্মকর্তারা বলছেন, তারা বুকিং দিলেও পুরো টাকা পরিশোধ করে টিকেট কনফার্ম না করায় নির্ধারিত ফ্লাইটের বহু সিট খালি থাকছে। ওই দেশে অবতরণের স্লট কেনা থাকলেও সে ক্ষতি মেনে নিয়ে বাধ্য হয়ে ফ্লাইট বাতিল করতে হচ্ছে। এর উত্তরে এজেন্সিগুলো বলছে, সৌদি আরবের হজ মন্ত্রণালয়ের সার্ভারে ক্রটির কারণে দূতাবাস ভিসা প্রিন্ট নিতে না পারায় এবং তারা দেরিতে ভিসা দেয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। হজযাত্রীদের অনেকে চুক্তির সব টাকা না দেয়াকে দুষছে অনেক এজেন্সি। কিন্তু তবু তারা মিথ্যা আশ্বাসে ফ্লাইটের তারিখ জানিয়ে হজযাত্রীদের ঢাকায় নিয়ে আসছে। তারা হজের আগে কিছু সময়ের বিশ্রাম ও ইমিগ্রেশনের জন্য হজ ক্যাম্পে আসলেও সেখানে আটকা পড়ছেন দিনের পর দিন।
এভাবে হজযাত্রীদের ভোগান্তির বিষয়ে জানতে চাইলে হজ এজেন্সিগুলোর সংগঠন হাবের মহাসচিব মো. শাহাদত হোসেন তসলিম বলেন, হজযাত্রীদের সব টাকা পরিশোধ না করা, সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় সার্ভারে ত্রুটি, ভিসা প্রিন্ট নিতে ত্রুটি, দূতাবাসের যথাসময়ে ভিসা না দেয়া ইত্যাদি কারণে অনেক এজেন্সি বিমানের টিকিটের বুকিং কনফার্ম করতে পারছে না। তাছাড়া অনেক হজযাত্রীর ফ্লাইট পরে হলেও তারা একই এলাকার আগের ফ্লাইটের হজযাত্রীর দেখাদেখি তাদের সঙ্গে হজ ক্যাম্পে এসে পড়ছেন। এভাবে অনেকে ভোগান্তিতে পড়ছেন। তবে ডরমেটরিতে তেমন কাউকে পাওয়া যায়নি।