কৃষকের সঙ্গে বীজ ব্যাপারীর প্রতারণা ২০০ পরিবারে হাহাকার

30

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে অন্তত ২০০ কৃষকের সঙ্গে ইরি ধানের বীজ নিয়ে ভয়ংকর প্রতারণা করেছে স্থানীয় এক বীজ ব্যাপারী। অপুষ্ট ভিন্ন জাতের ও নিম্নমানের বীজ বিক্রি করে কৃষকের বছরের আহারের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছেন সে। ব্রি-৪৯ নামের এই অদ্ভুত হাইব্রিড জাতীয় বীজ রোপণের আগে বীজতলাতেই ফসল হয়ে যাচ্ছে। যারা এই বীজ রোপণ করেছেন ১৫-২০ দিনের ভিতর তাদের জমিতে ধানের থোড় বের হয়ে গেছে। কিছুদিনের ভিতর সে ধান জমিতেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে সর্বনাশ হয়ে গেছে অন্তত ২০০ কৃষক পরিবারে। এদিকে বীজ কোম্পানি ও বীজ ব্যাপারীর বিরুদ্ধে ভেজাল বীজ দেয়ার প্রতিবাদে মঙ্গলবার সকালে বিক্ষোভ করেছে স্থানীয় কৃষকেরা। উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকায় এই ঘটনা ঘটেছে। সরজমিন ঘুরে জানা যায়, দাউদপুর ইউনিয়নের আগলা, বাগলা, রোহিলা, বাঘপাড়া, বংশীদা, কাকিনীবাগ, বেলদী ছাড়াও পার্শ্ববর্তী মালীবন এলাকার ৮০ শতাংশ মানুষ কৃষিকাজে নির্ভরশীল। তারা চলতি বর্ষা মৌসুমে বীজ সংকটের বংশীদা মৌজার ৫ হেক্টর, বাঘপাড়ার ৮৪ হেক্টর, আগলার ৪৮ হেক্টর আর রোহিলার ৫১ হেক্টর জমিতে রোপণ করার জন্য পার্শ্ববর্তী কালীগঞ্জ থেকে চড়া দামে বীজ কিনে আনেন। ১০ কেজির বস্তার বীজ যেখানে বাজারের স্বাভাবিক মূল্য ৩০০ টাকা সেখানে তাদের কাছ থেকে ৭০০-৮০০ টাকা পর্যন্ত রাখা হয়। গত শ্রাবণে বীজ ফেলার কয়েকদিন পরই কৃষকরা তাদের দীর্ঘ কৃষি জীবনের অদ্ভুত ব্যাপারটা দেখতে পান। কারো কারো বীজতলাতেই ধানের শীষ বের হয়ে গেছে। কিছু ধান হয়তো খারাপ পড়েছে ভেবে তারা শ্রাবণে জমিতে চারা পুঁতে দেন। ভাদ্র মাসে ৯৫ শতাংশ জমিতেই ধানের শীষ বের হয়ে যায়। চলতি মাসে অনেক জমির ধান অপরিপক্ব অবস্থায় জমিতেই মিশে গেছে। এবার বোরো ধানের ভালো ফলন পাওয়ায় কৃষকরা আশা করেছিল। ইরি ধানের হয়তো বাম্পার ফলন হবে। এ জন্য কেউ সমিতি এনজিও থেকে সুদে টাকা তুলে, কেউবা গরু বাছুর বিক্রি অথবা সোনাদানা বন্ধক রেখে চড়া দামে বীজ কিনে। এখন ঋণ পরিশোধতো অনেক দূরের ব্যাপার ২০০ কৃষক পরিবারে সারা বছরের আহারেরই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থান অনেকে জমি বিক্রি আবারো কেউ কেউ ডুকরে কেঁদে উঠে আত্মহননের কথা জানান এ প্রতিনিধিকে। স্থানীয় ছোট বাগলা গ্রামের কৃষক মোতালেব হোসেন, মোজাম্মেল, আবদুর রহিম, নুরু মিয়া, রউফ খান, রশিদ মিয়া, শামীম, নাজিমউদ্দিন, মোতালেব, মসিউর, ওমর আলী, মহিজউদ্দিন, আব্দুল গনী, হাসান মাস্টার, ফিরোজ, হামিদ, বুরুজ, আলআমিন, সোবাহান, মোতালেব, ফারুক, কালাম, ইয়াছিন, হাবিবুল্লাহ, ইসলাম, হান্নান, রব মিয়া, রোহিলা গ্রামের বাদল, সফিকুল, হবিসহ আরো অনেকে জানান তারা উল্লিখিত ৪টি মৌজাসহ পার্শ্ববর্তী মালীবন বিলে অন্তত ৫০০-৬০০ বিঘা জমিতে এবার কালীগঞ্জ বাজারের বীজ ব্যাপারী ওয়াজউদ্দিন মিয়ার দোকান থেকে বীজ কিনে ইরি ধানের চাষ করেছেন। রত্না, ডায়মন্ড আর ডায়না তিন প্রতিষ্ঠানের লগোযুক্ত এই বীজ যারাই তার কাছ থেকে ক্রয় করেছেন প্রত্যেকের একই দশা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন জেলার প্রতিষ্ঠানের লোগো থাকলেও ওয়াজউদ্দিন নিজেই এই বীজ সংগ্রহ করে তার বাড়িতে প্যাকেটবদ্ধ করেন। এ কারনে গত বছর স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হয় সে। পরে অবশ্য দেন-দরবার করে ছাড়া পায়। কৃষকরা অভিযোগ করেন, এবার অধিক মুনাফার আশায় যেকোনো কূটকৌশল অবলম্বন করে এই বীজ বিক্রি করেছে আমাদের কাছে। দাউদপুর এলাকার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আরিফুর রহমান বলেন, কৃষকদের সঙ্গে বড় ধরনের প্রতারণা করা হয়েছে। প্রাকৃতিক দূযোর্গ, অতিবৃষ্টি আর খড়ার সাথে লড়াই করতে করতে এমনিতেই কমে যাচ্ছে কৃষক পরিবারের সংখ্যা। তার উপর মুনাফালোভী ব্যাপারীদের এমন কাণ্ডে মানুষ কৃষিকাজে উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে। বেলদী ব্লকের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকতা আবদুল খালেক বলেন, এক বিঘা জমিতে বীজ কেনা থেকে শুরু করে ফলস তোলা পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়। সে হিসেবে অন্তত ৪০-৪৫ লাখ টাকার লোকসান হয়েছে কৃষকদের। অগ্রহায়ণ, পৌষে যে ফসল ঘরে তোলার কথা ছিল সে জমিতে এখনই ফসল এসে গেছে। আমার সদ্য প্রসব করা সন্তানের ওজন যদি হয় ৮০ কেজি তাহলে বুঝবেন সেটা বিকলাঙ্গ। এই ফসলেরও ঠিক একই দশা। আর যে জতের বীজ দেয়া হয়েছে সেটা আসলে কোনো ধানই না। কিছু বোরো ধানের মিশেল থাকলেও বেশিই চিটা ধান। আর অদ্ভুত লম্বাটে এক ধরনের ধানের বীজ। যা আমার ২০ বছরের চাকরির জীবনে কোনোদিন দেখিনি। অভিযুক্ত বীজ ব্যাপারী ওয়াজউদ্দিন মিয়ার সঙ্গে তার সেলফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোরাদুল হাসান জানান, আমার এলাকার কৃষকদের সাথে অত্যন্ত জগন্যতম প্রতারণা করেছে বীজ ব্যাপারী। আমি দুয়েকদিনের মধ্যে সরজমিন ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখার পর তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য কালীগঞ্জ থানার কৃষি কর্মকর্তার কাছে সুপারিশ করবো। এছাড়া চেষ্টা করে দেখছি কৃষকদের কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ দেয়া যায় কি না।

 

 

 

 

 

 

সূত্র : মানবজমিন অনলাইন পত্রিকা