কোণঠাসা হয়ে পড়ছে উত্তর কোরিয়া

26

উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক পরীক্ষা দেশটিকে কোণঠাসা করে ফেলছে। অর্থনীতিতে পড়ছে চাপ। নিষেধাজ্ঞার পর নিষেধাজ্ঞার ভারে নুইয়ে পড়ছে দেশটি। তার মধ্যেই দেশটির ঘনিষ্ঠ মিত্র চীন সে চাপ আরও বাড়িয়ে দিলো। উত্তর কোরিয়ায় তেল সরবরাহ সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটি। একই সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন উত্তর কোরিয়া থেকে পোশাক শিল্পজাত পণ্য আমদানি করাও বন্ধ করে দেবে- শনিবার এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে চীন। উত্তর কোরিয়ার ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করবে চীনের এই সিদ্ধান্ত। প্রথমত, দেশটির ঘনিষ্ঠ মিত্র চীন। দ্বিতীয়ত, উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতির বিশাল এক অংশ নির্ভর করে চীনের সঙ্গে দেশটির ব্যবসার ওপর। উত্তর কোরিয়ার বস্ত্রশিল্পের ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে পিয়ংইয়ংয়ের বৈদেশিক আয় কমে যাবে। আর চীনের রপ্তানি করা তেল দেশটির জ্বালানি পণ্যের প্রধান উৎস হওয়ায় বিপাকে পড়বে দেশটির জ্বালানি শক্তি খাত। চলতি মাসে উত্তর কোরিয়া নতুন একটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করার পর দেশটির বিরুদ্ধে এ কঠোর অবস্থান নিল চীন। এক বিবৃতিতে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়ায় পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানি ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর এ নিষেধাজ্ঞা আগামী ১লা অক্টোবর থেকে কার্যকর হবে। জাতিসংঘের প্রস্তাবিত শর্ত অনুযায়ী, চীন এক বছরে সর্বোচ্চ ২০ লাখ ব্যারেল পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম উত্তর কোরিয়ায় রপ্তানি করতে
পারবে। জাতিসংঘের এ শর্ত আগামী বছর থেকে কার্যকর হবে। ২০১৬ সালের হিসাব অনুযায়ী উত্তর কোরিয়া চীন থেকে প্রতিদিন ৬ হাজার ব্যারেল পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম আমদানি করে। এ হিসাব অনুযায়ী দেশটি পুরো বছরে ২২ লাখ ব্যারেল তেল চীন থেকে আমদানি করে। যদিও ২০১৪ সাল থেকে চীন উত্তর কোরিয়ায় তেল রপ্তানির ব্যাপারে কোনো তথ্য প্রকাশ করে না। বস্ত্রশিল্প উত্তর কোরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত। ধারণা করা হচ্ছে, এ খাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে বছরে দেশটির ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে ৭০০ মিলিয়ন ডলারে। বিবিসি ওয়ার্ল্ডের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলের সম্পাদক সেলিয়া হ্যাট্টন বলেন, বস্ত্র আংশিকভাবে উত্তর কোরিয়ায় উৎপাদন করা হয়। কিন্তু এসব বস্ত্রের অবশিষ্ট কাজ করা হয় চীনে, যাতে বৈধভাবে এসব বস্ত্রে ‘মেইড ইন চীন’ লেবেল লাগানো যায়। প্রাথমিকভাবে উত্তর কোরিয়ায় পুরোপুরি তেল সরবরাহ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিল চীন ও রাশিয়া। কিন্তু পরে উত্তর কোরিয়ায় তেল সরবরাহ কমিয়ে আনতে সম্মত হয় দেশ দুটি। উত্তর কোরিয়ার নিজস্ব শক্তি উৎপাদন ক্ষমতা খুবই কম। আমদানি করা অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে নিজেদের কাজে ব্যবহার করে তারা। এএফপি’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত দুই মাসে উত্তর কোরিয়ায় পেট্রোলের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া উত্তর কোরিয়া প্রচুর পরিমাণে কয়লা রপ্তানি করে। এ কয়লার প্রধান ক্রেতা হলো প্রতিবেশী চীন। ২০১৬ সালে দেশটি ১.২ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের কয়লা রপ্তানি করেছে চীনে। কিন্তু চলতি বছরের শুরুতে চীন উত্তর কোরিয়া থেকে কয়লা আমদানি সীমিত করেছে। এছাড়াও উত্তর কোরিয়ার বস্ত্রশিল্প ও পেট্রোলিয়াম খাতের ওপর নতুন করে আরো নিষেধাজ্ঞা আরোপের ব্যাপারে একমত হয়েছে জাতিসংঘ। ফলে সামগ্রিকভাবে সংকটের মুখোমুখি উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতি।

গরম মাথার দুই নেতা:
উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হুমকি আর পাল্টা হুমকির ঘটনা নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে। দুই দেশের দুই নেতা ধারাবাহিকভাবে একে অপরকে হেনস্তা করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সম্প্রতি তাদের এই অভ্যাস বেশ উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জন উন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে ‘মানসিক বিকারগ্রস্ত’ আখ্যা দেন। পাল্টা জবাবে ট্রাম্প কিমকে ‘পাগল লোক’ বলেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্রদেরকে রক্ষা করতে বাধ্য করা হলে, উত্তর কোরিয়াকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়া হবে। ট্রাম্পের এ হুমকির পর কিম ও ট্রাম্প এসব বাকযুদ্ধে লিপ্ত হন। এতে ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার নেতাকে ‘আত্মঘাতী মিশনের রকেটম্যান’ বলেও বিদ্রূপ করেন। জবাবে কিম জং উন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে মানসিক বিকারগ্রস্ত বলে আখ্যা দিয়ে বলেন, ট্রাম্প তাকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়ে উত্তর কোরিয়া সঠিক পথেই রয়েছে। এছাড়া এক টেলিভিশন বক্তৃতায় উত্তর কোরিয়ার নেতা বলেছেন, ট্রাম্পকে তার বক্তৃতার জন্য ‘চড়া মূল্য’ দিতে হবে। দুই নেতার এমন হুমকি ছোড়াছুড়ি দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়েই চলেছে। অবস্থা এমন যে, ট্রাম্পের হুমকি কিমের পারমাণবিক ক্ষমতাসম্পন্ন হওয়ার নেশা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই দুই নেতাকে থামানোর চেষ্টা করছে চীন ও রাশিয়া।
ওয়াশিংটন ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বাকযুদ্ধ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে দেশ দুটি। ট্রাম্প-কিমের আচরণকে বাচ্চাদের আচরণের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। সেদিক দিয়ে বিবেচনা করলে, রাশিয়া-চীন এই ক্ষমতাশীল বাচ্চাদের থামানোর চেষ্টা করে চলেছে অভিভাবকের মতো। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ এ দ্বন্দ্বকে কিন্ডারগার্টেনের শিশুদের মধ্যকার ঝগড়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। সের্গেই লাভরভ বলেন, তাদের বাকযুদ্ধ এমন যে, একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিশুরা ঝগড়া শুরু করেছে এবং কেউ তাদের থামাতে পারছে না। তিনি বলেন, গরম মাথার লোকদের (ট্রাম্প ও কিম) শান্ত হওয়ার জন্য একটি বিরতি প্রয়োজন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেয়ার পর এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন লাভরভ। এদিকে, নতুন একটি হাইড্রোজেন বোমা পরীক্ষা চালানোর ঘোষণা দিয়েছে উত্তর কোরিয়া। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী রি ইয়ং হো বলেছেন, এটা হতে পারে একটি হাইড্রোজেন বোমার পরীক্ষা, সম্ভবত প্রশান্ত মহাসাগরে আগে এ ধরনের কোনো পরীক্ষা চালানো হয়নি। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচির শর্তকে আরো কঠোর করতে বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন একটি নির্বাহী আদেশ অনুমোদন করেছে। উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে লেনদেন করে বা তাতে সহায়তা করে এমন সব প্রতিষ্ঠানের ওপর এ আদেশের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের শর্তারোপ কাজে আসছে না। তারা বলছেন, ওয়াশিংটন ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যকার উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় ভালোকিছুর পূর্বাভাস দেয় না। এদিকে, বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর কোরিয়ায় ৩.৫ মাত্রার কম্পন সনাক্ত করেছে চীন। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, এই কম্পন কোনো বিস্ফোরণের কারণে হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

 

 

 

 

সূত্র : মানবজমিন অনলাইন পত্রিকা