ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের দুর্বিষহ জীবন

23

সাত ফুট বাই দশ ফুটের ঝুপড়িগুলোই এখন সব হারিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর ঠাঁই। এক বিছানায় রাত কাটছে পুরো পরিবারের। সব সময় হৈ-হল্লা, চিৎকার-চেঁচামেচি। রাত-দিন সমান এখানে। সবাই বিধ্বস্ত, বেদনাকাতর আশ্রয় ও সাহায্য প্রার্থী। এখনো কাটেনি সুপেয় পানির সংকট। পাহাড়ি ছড়ার পানিতেই চলছে গোসলের পাশাপাশি রান্নাবান্নার কাজ। ত্রাণের চাল-ডাল মিলছে কিন্তু তৈরি হয়েছে রান্নার জ্বালানি সংকট। অপরিচ্ছন্ন পানি পানের কারণে বাড়ছে নানা ধরনের পেটের পীড়া, বমি, সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগব্যাধি। ভয়াবহ নৃশংসতা প্রত্যক্ষ করায় বেশির ভাগ রোহিঙ্গাই ভুগছেন মানসিক বিষণ্নতায়। বেসরকারি উদ্যোগে কিছু মেডিকেল ক্যাম্প স্বাস্থ্য সেবা দিলেও সেটা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন- নারী ও শিশুরা। সবখানেই স্বজনহারা মানুষের বিলাপ আর শিশুদের কান্না। শিশুদের স্বাভাবিক জীবনে নেমে এসেছে দারুণ এক প্রতিকূল পরিবেশ। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমে গেছে ব্যক্তি ও সামাজিক সংগঠনের ত্রাণ তৎপরতা। কক্সবাজার-টেকনাফ রোডের আশপাশে অবস্থান নেয়া রোহিঙ্গারা অবস্থানগত কারণে কিছুটা সুবিধা পাচ্ছেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় ত্রাণ ও স্বাস্থ্যসেবা মিলছে না রাস্তা থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে যাদের ঠাঁই হয়েছে সেই রোহিঙ্গাদের। পাহাড়ে সাপখোপের ভয় যেমন আছে তেমনি হাতির হামলায় ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন কয়েক রোহিঙ্গা। সবমিলিয়ে মানবেতর এক সময় পার করছেন রোহিঙ্গারা। বিপুল সংখ্যক নতুন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ায় নতুন করে দুর্ভোগে পড়েছেন ক্যাম্পের পুরোনো রোহিঙ্গারা। উখিয়া-টেকনাফের বাজারগুলোতে পর্যাপ্ত যোগান নেই জরুরি ঔষুধপত্রসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য এবং তরিতরকারির। ফলে সবকিছুর দাম এখন আকাশচুম্বী। রোহিঙ্গা সংকটের কারণে স্থানীয়রাও পড়েছেন নানামুখী দুর্ভোগে। সরজমিন বালুখালী, ঘুমধুম, তুমব্রু জিরোপয়েন্ট, থাইংখালী, হাকিমপাড়া ও কুতুপালং নতুন ও পুরোনো ক্যাম্প ঘুরে দেখা গেছে এমন সব দুর্ভোগের চিত্র।

সকালের আলো ফোটার পর থেকেই রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ত্রাণের আশায় এখানে সেখানে ছোটাছুটি করতে হয় রোহিঙ্গাদের। জেলা প্রশাসনের বেঁধে দেয়া ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রগুলোয় যেমন তারা ভিড় করছে, তেমনি বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠনের ত্রাণবাহী গাড়ি দেখলেই পড়ছে হামলে। কারও ভাগ্যে জুটছে, কারও জুটছে না। আবার কোথাও কোথাও পুরনোদের সঙ্গে পেরে উঠছে না নতুনরা। ফলে কেউ খাবার-দাবার পেলেও ত্রিপলের অভাবে এখনো ঘর বাঁধতে পারেননি। কেউ আবার ত্রিপল কিংবা অন্যান্য সামগ্রী পেলেও খাবার সংকটে আছেন। রোহিঙ্গাদের মধ্যে যারা আগেভাগে বাংলাদেশে ঢুকেছেন তারা তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছেন। অস্থায়ী বসতি গড়েছেন টেকনাফ রোডের পাশেই। ফলে মাসব্যাপী দেশের সাধারণ মানুষ, বিভিন্ন সংগঠন ও আন্তর্জাতিক সংস্থার ত্রাণ পেয়েছেন পর্যাপ্ত। কিন্তু যারা পরে এসেছেন তাদের ঠাঁই হয়েছে রাস্তা থেকে দূরে। কিছু কিছু অস্থায়ী ক্যাম্প গড়ে তোলা হয়েছে রাস্তা থেকে কয়েক কিলোমিটার ভেতরে। যারা ব্যক্তিগতভাবে ত্রাণ দিচ্ছেন তারা ভেতরে যাচ্ছেন না। নানা সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকেও ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে রাস্তার ধারেই। সরকারিভাবে নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পরও দায়িত্বপ্রাপ্তরা কষ্ট করে রাস্তা থেকে দূরের সে ক্যাম্পগুলোর দিকে যাচ্ছেন কম। ফলে ত্রাণের সুষম বণ্টন হচ্ছে না। একইভাবে বেশির ভাগ মেডিকেল ক্যাম্প বসছে রাস্তার পাশে। সবমিলিয়ে পরে আসা রোহিঙ্গারা সবদিক থেকেই বঞ্চিত হচ্ছেন। তুমব্রু খালের পাশে তুমব্রু জিরো পয়েন্টে অবস্থান নিয়েছেন কয়েকশ পরিবার। আবার নাইক্ষ্যংছড়ির চাকঢালা পেরিয়ে পাহাড়ি এলাকার জিরো পয়েন্টে অবস্থান নিয়েছে কয়েক শ’ পরিবার। দূরত্বের কারণে এসব অস্থায়ী ক্যাম্পে পর্যাপ্ত ত্রাণ যাচ্ছে না। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা থেকেও সেখানকার বাসিন্দারা বঞ্চিত হচ্ছেন। সাধারণ রোহিঙ্গা, ক্যাম্পের মাঝিসহ অনেকেই রাস্তা থেকে দূরে প্রত্যন্ত এলাকায় গড়ে উঠা ক্যাম্পের বাসিন্দাদের দিকে মনোযোগ দেয়ার জন্য সরকারসহ সবার প্রতি আবেদন জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে তাদের আরেকটি আবেদন সরকারি উদ্যোগে উখিয়া-টেকনাফের বাজারগুলোতে ঔষুধসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহ বাড়ানোর। এ ছাড়া মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও মগদের হাতে পিতা-মাতাকে হারিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন অনেক এতিম শিশু। তাদের কেউ কেউ আত্মীয়স্বজনের কাছে অবস্থানের সুযোগ পেলেও বেশির ভাগই ছুটোছুটি করছে এখানে সেখানে।
বালুখালীর একটি ন্যাড়াপাহাড়ের গায়ে গড়ে উঠেছে শত শত ঝুপড়ি। যেসব পাহাড়ে গাছ আছে সেখানের বাসিন্দাদের কিছুটা ছায়া মিললেও ন্যাড়া পাহাড়, পাহাড়ের ঢাল আর পতিত জমিতে বানানো ঝুপড়ির বাসিন্দাদের এ রোদ-বৃষ্টির যন্ত্রণা অসহনীয়। ঝুপড়ির সারির মধ্যে হাঁটাচলার জন্য রেখেছেন কয়েক ফুটের পথ। দুপুরে সে ঝুপড়ির মধ্যে পা রাখতেই ভেসে আসে শিশুর কান্না। ঝুপড়ির দরোজায় গাদাগাদি করে বসে আছেন কয়েকজন বিভিন্ন বয়সের নারী। চারদিকে এত মানুষের ভিড়ে বাইরে যেমন হাঁটাহাঁটি করতে পারছেন তেমনি গরমে ঝুপড়ির ভেতরেও টিকতে পারছেন না। তাই দুয়ারে বসে কাপড় দিয়ে বাতাস করছিলেন পরস্পরকে। কিছু কিছু ঝুপড়ি এক কক্ষের। আবার কিছু কিছু ঝুপড়ির মধ্যেই আড়াআড়ি কাপড় টাঙিয়ে বানানো হয়েছে আরেকটি ছোট্ট কক্ষ। যেসব পরিবারে নতুন বউ বা সেয়ানা মেয়ে রয়েছে তারা ঝুপড়ির মধ্যে আলাদা কক্ষ তৈরি করেছেন। ঝুপড়ির কোনায় চালের বস্তা, আলুসহ ত্রাণ পাওয়া নানা জিনিসপত্র। পানির অভাবে গোসল করতে না পেরে অনেকেই গামছা দিয়ে শরীর মুছেই পার করছেন দিনের পর দিন। চারদিকে উৎকট গন্ধ। এভাবেই চলছে মিয়ানমার থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের জীবন-সংগ্রাম।