ক্রেতাশূন্য আপন জুয়েলার্স

39

ক্রেতাশূন্য আপন জুয়েলার্সের সব ক’টি শোরুম। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অলস সময় কাটাচ্ছেন। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর চালু করা আপন জুয়েলার্সের কয়েকটি শোরুমে গিয়ে দেখা গেছে এমন অবস্থা। অবশ্য শোরুমের বিক্রয়কর্মীরা জানিয়েছেন, আতঙ্ক আর পর্যাপ্ত স্বর্ণ না থাকায় ক্রেতা আসছেন না। ব্যবসা-বাণিজ্যসহ কোনো বিষয়ে কথা বলতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন শোরুমের বিক্রয়কর্মী ও ব্যবস্থাপকরা। মালিকপক্ষ থেকে তাদের কোনো বিষয়ে কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা। শনিবার নগরীর গুলশান-১ ডিএনসিসি মার্কেটের একটি শোরুমে গিয়ে দেখা যায়, বিক্রয়কর্মীরা কেউ মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত আবার কেউ কেউ বসে গল্প করছেন। স্বর্ণ রাখার শোকেসের থাকগুলো ফাঁকা। ১৫-২০টি ফিংগার রিং আর
কয়েকটি ইয়ার রিং আর দুল ছাড়া কিছুই নেই। বিক্রয়কর্মী শুভ জানান, আড়াই মাস বন্ধ থাকার পর তিনদিন ধরে চালু করা হয়েছে। অনেক দিন বন্ধ থাকার কারণে শোরুমে ময়লার ভাগাড় ছিল। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে তারা ক্রেতার অপেক্ষায় বসে আছেন। ডিএনসিসি মার্কেটে শপিং করতে আসা ক্রেতারা এসে ঢুঁ মারছেন। একটু দেখেশুনে আবার চলে যাচ্ছেন। কিন্তু স্বর্ণ না থাকার কারণে তেমন কোনো বেচাবিক্রি হচ্ছে না। তবে বন্ধ থাকা অবস্থায় কোন বিক্রয় কর্মীর বেতন ভাতা বকেয়া রাখা হয়নি বলে শুভ জানান। শোরুমের ব্যবস্থাপক মো. নান্নু মোল্লা জানান, আগস্টের প্রথমদিন থেকে ভালোভাবে চালু করার আশা করছেন। এছাড়া বন্ধ হওয়ার আগের কিছু ক্রেতার ঝামেলা এখানো সামলাতে হচ্ছে তাদের। অনেক ক্রেতা অর্ডার করে রেখেছিল আবার কেউ কেউ অর্ধেক টাকা দিয়ে বুকিং দিয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করে বন্ধ হওয়ার কারণে ক্রেতা ও শোরুমের ব্যবস্থাপকরা বিভ্রান্তিতে পড়েছিলেন। বিয়ে, বৌভাত জন্মদিনসহ আরো কিছু অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে যারা অর্ডার করেছিল তারা ক্ষুব্ধ। নান্নু মোল্লা আরো জানান, পুরাতন ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু সবার মাঝেই একটা আতঙ্ক বিরাজ করছে। গুলশান-২ এর আপন জুয়েলার্সের আরেকটি শোরুমে গিয়ে দেখা যায়, বড় এই শোরুমটিতে মাত্র দুই তিনজন ক্রেতা রয়েছেন। এই শোরুমের ব্যবস্থাপক কোনো কথা বলতে রাজি হননি। ভিতরে গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ বিক্রয়কর্মী অলস সময় পার করছেন। এই শোরুমটির অনেক দিনের ক্রেতা একটি বায়িং হাউজের ব্যবস্থাপক মাসুদ আহমেদ জানান, বনানীর ঘটনার পর থেকে একটা আতঙ্ক বিরাজ করছে। মনের ভেতর একটা ভয় রয়ে গেছে। একবার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আবার যদি বন্ধ করে দেয়া হয়। এজন্য এখন আর কোনো কিছু অর্ডার করে তৈরি করছেন না। বন্ধ হওয়ার সময় যেমন মিডিয়ায় প্রচার করা হয়েছে এখনও তেমন করে আবার জানানো দরকার। না হলে ক্রেতাদের মনের আতঙ্ক কাটবে না। সূত্রে জানা যায়, আপন জুয়েলার্সের গুলশান-২, রাইফেল স্কয়ার ও বায়তুল মোকাররমের শোরুমটিতে বেশি ক্রেতার আনাগোনা থাকে। এবং এই তিনটি শোরুমে স্বর্ণের মজুদও বেশি থাকে। কিন্তু বনানী রেইনট্রি রেস্তরাঁয় দুই তরুণী ধর্ষণের পর আলোচনায় আসে এই প্রতিষ্ঠানটি। ধর্ষণের প্রধান হোতা ছিলেন আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদের ছেলে সাফাত। সাফাতের কুকর্মের জন্য তার বাবা দিলদার আহমেদ ও আপন জুয়েলার্সের বিষয়টি আলোচনায় আসে। পরে আপন জুয়েলার্সের সাড়ে তের মণ স্বর্ণ জব্দ করে শুল্ক গোয়েন্দারা। এর পর থেকেই আপন জুয়েলার্সের শোরুমগুলোতে স্বর্ণের অভাব দেখা দেয়। ক্রেতাদের অর্ডার ও বুকিং করা স্বর্ণ ফেরত দেয়া সম্ভব হয়নি। রাইফেলস স্কয়ারে আপন জুয়েলার্সের আরেকটি শোরুমে গিয়ে দেখা যায়, ক্রেতার অপেক্ষায় বসে আছেন সেখানকার প্রায় ২০ জন বিক্রয়কর্মী। শোরুমের ভেতরে ও বাইরে প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় অপেক্ষা করে কোনো ক্রেতার আনাগোনা চোখে পড়েনি। শোরুমের ক্যাশ ইনচার্জ হরি সাহা জানান, বন্ধ থাকার পর কিছুদিন ধরে খোলা হয়েছে। কিন্তু স্বর্ণ না থাকার কারণে ক্রেতারা এসে ফেরত চলে যাচ্ছেন। কিছু ক্রেতার অর্ডার রাখা সম্ভব হচ্ছে না। মৌচাক মার্কেটের শোরুমে গিয়ে দেখা যায় এটি বন্ধ। আশপাশের ব্যবসায়ীরা জানান, আপন জুয়েলার্সের এই শোরুমটি এখনো খোলা হয়নি। তবে পহেলা আগস্ট থেকে আবার খোলার সম্ভাবনা আছে। বায়তুল মোকাররমের দুটি শোরুমে গিয়ে দেখা যায় নিচতলার শোরুমে বেশ কিছু ক্রেতার আনাগোনা। নগদ টাকায় অনেকেই স্বর্ণের তৈরি অনেক অলঙ্কার কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। আবার অনেকেই অর্ডার করছেন। নাম প্রকাশ না করে শোরুমের এক বিক্রয়কর্মী জানান, আপন জুয়েলার্সের অন্য শোরুম বেশ কিছুদিন বন্ধ থাকলেও বায়তুল মোকাররমের কোনো শোরুম বন্ধ করা হয়নি। এই শোরুমের বেচাকেনা আগের মতোই আছে। ব্যবস্থাপক সুজিত কর্মকার জানান, এ বিষয়ে তিনি কোনো কথা বলতে পারবেন না। যা বলার মালিক পক্ষই বলবে। সোহেল পারভেজ নামের এক ক্রেতা জানান, আপন জুয়েলার্সের প্রায় সব শোরুম থেকেই তিনি পরিবারের জন্য অর্ডার দিয়ে স্বর্ণ কিনেছেন। কিন্তু আলোচিত সেই ঘটনার পর থেকে এখন আর তেমন যাওয়া হয় না আপন জুয়েলার্সের শোরুমে। আগের চেয়ে ক্রেতাও কমেছে তাদের। জানা যায়, আপন জুয়েলার্সের মালিকানায় রয়েছেন গোলজার আহমেদ, দিলদার আহমেদ ও আজাদ আহমেদ। এই তিন ভাইয়ের মধ্যে বড় ভাই গোলজার আহমেদের মালিকানায় আছে গুলশান-২ এর শোরুম, দিলদার আহমেদের মালিকানায় উত্তরা, রাইফেলস স্কয়ার ও মৌচাক এবং ছোট ভাই আজাদ আহমেদের মালিকানায় গুলশান-১ এর ডিএনসিসি মার্কেটের শোরুম ও বায়তুল মোকাররমের আপন ডায়মন্ড ও আপন জুয়েলার্স।