খাদের দ্বারপ্রান্তে নেতানিয়াহু

23

নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে কেলেঙ্কারি আর বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যেন সমার্থক। বেশ কয়েকবারই ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে চলে গিয়েছিলেন ইসরাইলের এই প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু কোনোবারই তাকে কেলেঙ্কারির কারণে ক্ষমতা হারাতে হয়নি। ১৯৯৩ সালে ছিল ‘বিবি-গেট’। নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের স্ক্যান্ডাল এটি। নেতানিয়াহু দাবি করেছিলেন, তাকে একটি ভিডিও দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা হচ্ছে। এই ভিডিওতে এক নারীর সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় দেখা যায় তাকে। তার দাবি, তিনি লিকুদ পার্টির নেতৃত্বের লড়াই থেকে নিজেকে প্রত্যাহার না করলে, ওই ভিডিও প্রকাশ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে ব্ল্যাকমেইলাররা। ১৯৯৯ সালে এহুদ বারাকের কাছে হেরে যান তিনি। পত্রিকার পাতাজুড়ে তখন হেডলাইন নেতানিয়াহু ও তার স্ত্রী প্রায় ১ লাখ ডলারের রাষ্ট্রীয় উপহার গ্রহণ করেছেন। হেরে গিয়ে তার কামব্যাক করার যেকোনো প্রচেষ্টা তখনই মাঠে মারা যাওয়ার কথা। কিন্তু তিনি ২০০৯ সালে ফের ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু ক্ষমতার শীর্ষ পদে আসীন হওয়া মাত্রই নতুন কেলেঙ্কারি ফাঁস! এই কেলেঙ্কারির নাম ‘বিবি ট্যুরস’। অভিযোগ ওঠে, তিনি যখন ২০০৩ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত অর্থমন্ত্রী ছিলেন, তিনি ও তার পরিবার বিলাসবহুল ভ্রমণ ও আয়েশে মত্ত ছিল।
প্রত্যেকটি কেলেঙ্কারিই ফুলে ফেঁপে উঠেছিল। উত্তেজনাও সৃষ্টি করে তীব্র। কিন্তু কোনোটিই নেতানিয়াহুকে উৎখাত করতে সক্ষম হয়নি। কিন্তু এবারের তিনটি কেলেঙ্কারি একটু ভিন্ন। কারণ, খোদ তার সাবেক চীফ অব স্টাফ আরি হ্যারো রাজস্বাক্ষী হতে রাজি হয়েছেন। হ্যারো কোন গোপন কথা ফাঁস করবেন, তা কেউই জানে না। কিন্তু ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে তদন্তাধীন তিনটি মামলার অন্তত একটিতে তিনি ভয়াবহ কোনো প্রমাণ হাজির করবেন। কেস ১০০০, ২০০০ ও ৩০০০ নামে পরিচিত এই তিনটি মামলার প্রথমটি হলো খুবই সম্পদশালী এক বন্ধুর কাছ থেকে উপহার গ্রহণ সংক্রান্ত। পরেরটি হলো ‘ইয়েদিওথ আহারোনোত’ পত্রিকার সঙ্গে পক্ষপাতমূলক কভারেজ পেতে যোগসাজশ করা। এই পত্রিকাটি ইসরাইলের সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক। সর্বশেষটি হলো, জার্মানির কাছ থেকে তিনটি সাবমেরিন ক্রয়ে হওয়া কথিত দুর্নীতিকে ঘিরে।
এই মামলাগুলো আগের কেলেঙ্কারির চেয়ে গুরুতর। কারণ, আদালতের একটি নথি থেকে গত সপ্তাহে জানা গেছে যে, পুলিশ ঘুষগ্রহণ, প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে নেতানিয়াহুকে সন্দেহ করছে। এই হলো রক্ষণশীল ইসরাইলি পত্রিকা জেরুজালেম পোস্টের বিশ্লেষণ। ইংরেজি ভাষার এই পত্রিকাটি নেতানিয়াহু ঘেঁষা কিছুটা।
অপরদিকে বামঘেঁষা পত্রিকা হারেৎস লিখেছে, সরকারী কৌঁসুলি ও আরি হ্যারো যেই চুক্তিতে পৌঁছেছেন, তাতে আর যাই হোক, একটি পরিণতি অপরিবর্তনীয়। সেটি হলো নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন। পত্রিকার্টি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুইটি ইস্যুতে তথ্য সরবরাহ করেছেন হ্যারো। একটি হলো, সম্পদশালী বন্ধুদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ এবং ‘ইয়েদিওথ আহারোনোত’ পত্রিকার প্রকাশকের সঙ্গে গোপন আলোচনা। এই চুক্তি অনুযায়ী, হ্যারোর বিরুদ্ধেও প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হবে। তবে তাকে কোনো কারাদ- পোহাতে হবে না। শুধুমাত্র কম্যুনিটি সার্ভিস ও ৭ লাখ শেকেল জরিমানা দিয়েই পার পাবেন।
উর্ধ্বতন কৌঁসুলি ও পুলিশ কর্মকর্তারা যদি মনে না করতেন যে, আরি হ্যারোর স্বাক্ষ্য এই দুই দুর্নীতি মামলাকে শক্তিশালী কিংবা সম্পন্ন করবে না, তাহলে তারা হ্যারোর সঙ্গে এই চুক্তিই করতেন না। এ সপ্তাহান্তে সরকারী কৌঁসুলিরা অবশ্য জিজ্ঞাসাবাদের সময় হ্যারোর দেওয়া তথ্য প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। অর্থাৎ, হ্যারোর দেওয়া তথ্যের সংবেদনশীলতা বিবেচনায় এই পদক্ষেপ নিয়েছেন কৌঁসুলিরা। এ কারণেই নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে এই দু’টি মামলা আরও গাঢ় হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ইয়েদিওথ আহারোনোত পত্রিকার প্রকাশক আর্নন মোজেসের ভাগ্যও নির্ধারিত হয়ে গেছে।
আরি হ্যারোর স্বাক্ষ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চীফ অব স্টাফ পদটি হলো প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডের্ন্টে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বা প্রধান সহযোগীর। নেতানিয়াহু বিরোধী দলীয় নেতা থাকার সময় হ্যারো তার পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন। পরে ২০০৯ সালে নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারাভিযানে নেতৃত্ব দেন হ্যারো। সেবারই নেতানিয়াহু পুনরায় প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। নির্বাচন শেষে তিনি প্রধানমন্ত্রীর ব্যুরো চীফ হিসেবে ২০১০ সাল পর্যন্ত কাজ করেন। এই পদের আওতায় তিনি নেতানিয়াহুর শিডিউল ব্যবস্থাপনা ও অনেক ইস্যুতে পরামর্শ প্রদান করতেন। এরপরই তিনি রাজনীতি থেকে বিরতি নেন। প্রতিষ্ঠা করেন একটি কনসাল্টিং ফার্ম। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চীফ অব স্টাফ হিসেবে তিনি ফের রাজনীতিতে ফেরেন। ২০১৫ সালে লিকুদ পার্টির প্রচারাভিযান পরিচালনা করতে তিনি এই পদ থেকে সরে দাঁড়ান। তার এমন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের কারণেই তার স্বাক্ষ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি ইয়েদিওথ পত্রিকা প্রকাশক মোজেসের সঙ্গে নেতানিয়াহুর বৈঠক ঠিক করতে ভূমিকা রাখেন।
টাইমস অব ইসরাইল পত্রিকার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ আনতে পুলিশ সুপারিশ করবে এমনটি প্রায় নিশ্চিত। কিন্তু অভিযোগ আনার এখতিয়ার পুলিশের নয়, কৌঁসুলিদের। নেতানিয়াহু যদি অভিযুক্ত হনও, তবে কি তাকে পদত্যাগ করতে হবে? আইনমন্ত্রী আয়েলেত শ্যাকেড বলেছেন, আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত হলে মন্ত্রীদের পদত্যাগ করতে হয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী এমতাবস্থায় পদত্যাগ করতে আইনগতভাবে বাধ্য নন। অনেক আইনি বিশেষজ্ঞই আবার এই মতের সঙ্গে একমত নন। শুধু আইনি দিকই নয়। আছে নৈতিকতার প্রশ্নও।
নেতানিয়াহুর পূর্বসূরি এহুদ ওলমার্টের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনার ঠিক আগে আগে তিনি পদত্যাগ করেন। ওই মামলায় পরে জেল হয় তার। তাই নেতানিয়াহুরও কি নৈতিক অবস্থান থেকে হলেও পদত্যাগ করা উচিৎ? লিকুদ দল ও ক্ষমতাসীন জোর্টে বেশিরভাগ নেতাই এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিচ্ছেন না। নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টির কয়েকজন মন্ত্রী তার পক্ষে কথা বলেছেন বটে, তবে বেশিরভাগই চুপ থাকাকেই শ্রেয় মনে করছেন। জোর্টে শরিক দলগুলো বলছে, সেক্ষেত্রে জোট বৈঠকে বসবে এ ব্যাপারে। তবে ইয়েদিওথ পত্রিকা ‘লিকুদ সূত্রে’র বরাতে বলেছে, অভিযুক্ত হলে নেতানিয়াহুকে প্রধানমন্ত্রী থাকতে দেওয়া হবে না।
বিরোধী দলীয় নেতা ও পার্লামেন্ট সদস্যরা নেতানিয়াহুর পদত্যাগ দাবি করছেন। লেবার পার্টির নেতা অ্যাভি গাবি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে। কারণ, ইসরাইলের নাগরিকদের ভিন্ন নেতৃত্ব প্রাপ্য। নেতানিয়াহু নিজে অবশ্য কোনো কিছু পাত্তা না দেওয়ার ভান করছেন। এক ভিডিও বার্তায় তিনি পুরো ব্যাপারকে ‘ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি শুরু থেকেই কোনো অন্যায় সংঘটনের কথা অস্বীকার করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এবার যেই সংকর্টে মুখে তিনি, সেখান থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার পথ খুবই সরু।