গাড়ি চলে না

46

মিরপুর-১২ নম্বর থেকে মতিঝিল। এই রুটে চলাচলকারী বাস সব ক’টি ট্রাফিক সিগন্যালে থেমে স্বাভাবিক গতিতে গেলে পৌনে এক ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টার দূরত্ব। কিন্তু এই পথ যেতে এখন লাগছে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। কখনও কখনও এর চেয়েও বেশি সময় লাগে, এমন তথ্যই জানালেন এই রুটে চলাচলকারী ল্যামস পরিবহনের চালক ফজলুল হক। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই রুটে গাড়ি চালাই। এমন পরিস্থিতি আগে আর কখনও হয়নি। অনেক দিন দুই ট্রিপের বেশি দিতে পারি না। শুধু ফজলুল নন এ রুটে চলাচলকারী অন্য পরিবহন চালকদেরও একই অবস্থা। তারা বলছেন, অসহনীয় যানজটে সাধারণ যাত্রীদের মতো তারা ভুক্তভোগী। চালক ও সহকারীদের অনেকে ‘ট্রিপ’ ও দৈনিক ভাড়া হিসেবে বাস চালান। যানজটের কারণে তারা মালিক বা কোম্পানিকে নির্ধারিত ভাড়া দেয়ার পর নিজেদের পারিশ্রমিক আর কিছু থাকে না। ট্রাফিক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সড়কের যে পরিস্থিতি থাকে দিনভর তৎপর থেকেও কোন সুফল মিলছে না। কারণ সারা দিন প্রায় সব রাস্তায় যানজট থাকে। এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের পাশাপাশি যানবাহনও নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিতে হবে। গত কয়েক দিন রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর যানজট পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে যে চিত্র পাওয়া গেছে তা বলতে গেলে ভয়াবহ। টঙ্গি থেকে মহাখালী হয়ে মতিঝিল, রামপুরা বাড্ডা হয়ে মতিঝিল, সায়েদাবাদ থেকে মতিঝিল হয়ে গাবতলী, গাবতলী থেকে ঢাকেশ্বরী হয়ে মতিঝিল-সায়েদাবাদ রুটে চলাচলকারী যানবাহনও গন্তব্য পার হচ্ছে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ, তিনগুণ বেশি সময়ে। প্রত্যেক সড়কে দিনভর লেগে থাকছে ভয়াবহ যানজট। এই যানজট কমিয়ে সড়ক সচল রাখতে হিমশিম খেতে হয় ট্রাফিক পুলিশকে। যানবাহনের চাপের কারণে অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েন তারা। প্রধান প্রধান সড়ক ঘুরে দেখা গেছে উন্নয়ন কাজ চলা ও পাশে যানবাহন পার্কিং করার কারণে চার লেনের সড়ক অনেক জায়গায় দুই লেনে পরিণত হয়। যাত্রবাহী বাসগুলো সড়কের যত্রতত্র যাত্রী উঠানোয় অন্য যানবাহনগুলোর চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। প্রায়ই বৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা হলে যানজটের এই মাত্রা আরো বেড়ে যায়।
গতকাল রাজধানীর মতিঝিল, পল্টন, কাকরাইল, মালিবাগ, শাহবাগ, কাওরানবাজার, বাংলামোটর, হাতিরপুল, ফার্মগেট, পান্থপথ, মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও নাবিস্কো মোড় ঘুরে দেখা গেছে যানজটের ভয়াবহ চিত্র। কেউ কেউ বাস থেকে নেমে কিছু জায়গা হেঁটে সামনে এগিয়ে ফের অন্য বাসে উঠছিলেন। যানজটের কবল থেকে রক্ষা পেতে পাজেরো গাড়ি, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন প্রাইভেট গাড়ি চলছিল উল্টাপথে। পান্থকুঞ্জ থেকে হাতিরপুলের সড়কে, মোহাম্মদপুরের আসাদগেটে, ফার্মগেটে, নিউ ইস্কাটনে, মতিঝিলের রাস্তায় পার্কিং করা ছিল শত শত গাড়ি। প্রতিটি সিগন্যালে দীর্ঘসময় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে মানুষকে। মোহাম্মদপুর থেকে ফার্মগেট। গাড়িতে মাত্র ১০-১৫ মিনিটে যাওয়া সম্ভব। সেখানে গতকাল দুপুরে মোহাম্মদপুর তিন রাস্তার মোড় সংলগ্ন বাসা থেকে জুনায়েদ আহমেদকে ফার্মগেটে যেতে সময় লেগেছে প্রায় দুই ঘণ্টা। জুনায়েদ জানান, জরুরি কাজে ফার্মগেটে যাওয়ার জন্য বাসে উঠেন বেলা ১১টায়। প্রথমে মোহাম্মদপুর আল্লাহকরিম মসজিদ মোড়ে, পরে আসাদগেটে তীব্র যানজটে পড়েন। ১টার দিকে বাসটি ফার্মগেট খামারবাড়ি পৌঁছে। জুনায়েদ জানান, মোহাম্মদপুরে বিখ্যাত কয়েক স্কুল-কলেজ রয়েছে। তাদের কোনো পার্কিং স্থান নেই। রাস্তায় গাড়িগুলো পার্কিং করা হয়। এসব কারণে ওই সড়কে তীব্র যানজট লেগেই থাকে। একই অবস্থা বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিলের। সড়কের অর্ধেকজুড়ে এলোপাতাড়িভাবে পার্কিং করে রাখা হয় গাড়ি।
গণপূর্ত বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, মালিবাগের বাসা থেকে রিকশায় নিয়মিত আসা-যাওয়া করেন তিনি। মৎস্য ভবন মোড়ে রিকশা থেকে নেমে হেঁটে অফিসে যান। তিনি হেঁটে গেলেও ট্রাফিক পুলিশের সামনেই উল্টো দিকে অনেক রিকশা যাতায়াত করে। এতে যানজট আরো তীব্র হয়। সকাল ১০টার দিকে একটি কোম্পানির মিনিবাসকে পান্থপথ থেকে উল্টোপথ হয়ে হাতিরপুলের দিকে যেতে দেখা গেছে। ওই সময়ে বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেলও উল্টোপথে যায়। ট্রাফিক পুলিশের সিগন্যাল উপেক্ষা করেই কাওরানবাজার, বাংলামোটর, রূপসী বাংলা হোটেল মোড়, শাহবাগ মোড় দিয়ে বেশ কয়েক গাড়ি ও মোটরসাইকেলকে এভাবে যেতে দেখা গেছে। এসব রাস্তায় তখন তীব্র যানজট। যানজট সামলাতে ব্যস্ত ট্রাফিক পুলিশ। কাওরান বাজার ট্রাফিক সিগন্যালে কিছুক্ষণ অবস্থান করে দেখা যায়। ওই পয়েন্টে নিয়মিত বিরতিতে ট্রাফিক একটি সড়ক বন্ধ রাখলেও পথচারীরা জড়ো হয়ে নিজেরাই যানবাহন আটকে রাস্তা পার হচ্ছেন। এতে তারা ট্রাফিক সিগন্যালের কোন তোয়াক্কা করছেন না।
গুলিস্তান থেকে মিরপুরগামী বাসের যাত্রী নাজমুল হাসান জানান, মৎস্য ভবন থেকে শাহবাগ পর্যন্ত তারপর শাহবাগ থেকে রূপসীবাংলা, পরে বাংলামোটর থেকে কাওরনাবাজারে তীব্র যানজটে পড়তে হয়েছে তাকে। তিনি বলেন, একাধিকবার ভিআইপি রোডের সিগন্যালগুলো ছাড়লেও সাধরাণ মানুষের যাতায়াতের রাস্তাগুলো আটকে রাখা হয়েছে দীর্ঘসময়। এতে চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন সাধারণ মানুষ। রোববার কাওরানবাজার মোড়ে দায়িত্ব পালন করছিলেন ট্রাফিক পুলিশের ইন্সপেক্টর (টিআই) খাদেমুল ইসলাম। তিনি বলেন, এই এলাকায় পাঁচ তারকা হোটেল ও শপিংমল রয়েছে। তাদের পর্যাপ্ত পার্কিং নেই। শনিবার সোনরগাঁও হোটেলে ওয়াটার কনফারেন্স ছিল। এই হোটেলে দেড়শ’ গাড়ি পার্কিং করা যায়। ওই প্রোগামে সাড়ে ৮শ’ গেস্ট ছিন। এখানে যারা আসেন তাদের প্রায় প্রত্যেকের গাড়ি থাকে। এই গাড়িগুলো কোথায় থাকে? প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, পাশের শপিংমলের ৩শ’র বেশি গাড়ি পার্কিং করা যায় না। এরমধ্যে সাংবাদিকদের গাড়িও যততত্র পার্কি করা থাকে। আমরা প্রতিদিনই ঝগড়া করি। তবু কাজ হয় না। ফ্লাইওভারের উঠা-নামার পথে প্রায়ই তীব্‌্র যানজটের মুখোমুখি হতে হয়। মালিবাগে ফ্লাইওভারের প্রবেশমুখে, পলাশীমোড়ে, সাতরাস্তায় দেখা গেছে অভিন্ন অবস্থা। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা জানান, ফ্লাইওভার থেকে যানবাহন নিচে নামার পর সেখানে যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। দীর্ঘ ফ্লাইওভার হলে এই সমস্যা তীব্র হতো না বলেই মনে করেন তারা। যানজটের আরো একটি কারণ রাজধানীর ২৯টি রেলগেট পেরিয়ে প্রতি ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৮০টি ট্রেন চলাচল করে। এতে সিগন্যালে আটকে যায় যানবাহন। সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট। একইভাবে ফকিরাপুলে, কল্যাণপুর, কলাবাগান, শ্যামলী এলাকায় আন্তঃজেলা কোচকাউন্টার ও মহখালী, গাবতলী এবং সায়দাবাদ বাসস্ট্যান্ডের বাইরের রাস্তায় বাস ছড়িয়ে থাকার কারণে এসব এলাকায় যানজটের সৃষ্টি হয়।
ডিএমপি’র অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মোসলেহ উদ্দিন জানান, ঢাকায় রাস্তায় তিন লাখ যানবাহন চলাচলের উপযাগী কিন্তু চলে ১১ লাখ। যানবাহন বাড়ছে। মানুষও বাড়ছে। তবু ট্রাফিক পুলিশ চেষ্টা করছে শৃঙ্খলা রক্ষা করতে, নিরাপদে যেন মানুষ বাসায় পৌঁছে এজন্য ট্রাফিক পুলিশের তৎপরতার শেষ নেই বলে জানান তিনি।
এই ভয়াবহ যানজট একদিনে সৃষ্টি হয়নি। এজন্য অপরিকল্পিত নগরায়নকে দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এখনই সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না করলে অদূর ভবিষ্যতে এই শহর বসবাসের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেন তারা। সূত্রমতে, প্রায় দুই কোটি মানুষের ঢাকায় রাস্তা থাকার কথা ২৫ ভাগ। সেখানে আছে মাত্র আট ভাগ। রাজধানীতে যানবাহন চলছে ১১ লাখ ১৪ হাজার ১৯১টি। এরমধ্যে গণপরিবহন (বাস) মাত্র ২৯ হাজার ২শ’ ১টি। এ বিষয়ে সড়ক বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের জেনারেল সেক্রেটারি ড. এমএ মতিন বলেন, বেশিরভাগ প্রাইভেটকারে একজন বা চালকসহ দুজন যাতায়াত করেন। এসব গাড়ির সংখ্যা বিপুল। কিন্তু সাধারণ মানুষের গাড়ি খুবই কম। ভিআইপিদের আসা-যাওয়ার পথে দীর্ঘ সময় রাস্তায় সাধারণের যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়। এসব কারণেও যানজটের সৃষ্টি হয়। তিনি বলেন, মানুষ বাড়বে, যানবাহন বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। এসব চিন্তা করেই পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। ফুটপাথ দখলমুক্ত, চলাচল উপযোগী, সুন্দর করতে হবে। এই অবস্থা থেকে উত্তোরণের জন্য সঠিক বিজ্ঞানভিত্তিক নগর পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। তা নির্মোহভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। নতুবা এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে মুক্তি মিলবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।