চট্টগ্রামে চালের আড়তগুলো প্রায়ই বন্ধ

56

কোনো ঘোষণা ছাড়াই চট্টগ্রামে চালের আড়তগুলো প্রায়ই বন্ধ রেখেছে ব্যবসায়ীরা। ফলে আজ বুধবার সকালে চাল কিনতে গিয়ে ফিরে এসেছেন অনেক খুচরা ব্যবসায়ী। এ নিয়ে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে চট্টগ্রামের চালের বাজারে।

চালের অতিরিক্ত মজুদ ও বেশি দামে চাল বিক্রির দায়ে চট্টগ্রামের ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র চাক্তাইয়ে বদিউর রহমান এন্ড সন্সের চালের আড়তে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে অভিযান চালায় ভ্রাম্যমান আদালত। এ সময় আড়তের ব্যবস্থাপক দিদারুল আলমকে এক লাখ টাকা জরিমানা ও তিন মাসের কারাদ- প্রদানের পর গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর চাক্তাইয়ের চালের আড়ত ও পাইকারী দোকান বন্ধ রেখে ব্যবসায়ীরা ভ্রাম্যমান আদালতের উপর হামলা চালিয়ে ওই ব্যবস্থাপককে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। এমনকি চাল পরিবহণের কাজে ব্যবহৃত ঠেলাগাড়ি ও ভ্যান ছড়িয়ে সড়ক অবরোধ করে। রাত প্রায় ৮টা পর্যন্ত এ নিয়ে চাক্তাইয়ে অস্থিরতা বিরাজ করে। পরে অতিরিক্ত র‌্যাব-পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এ ঘটনায় আজ বুধবার সকাল থেকে নগরীর চাক্তাই ও পাহাড়তলি বাজারের সবকটি চালের আড়ত ও পাইকারী দোকান প্রায়ই বন্ধ রেখেছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে খুচরা ব্যবসায়ীদের অনেকে চাল কিনতে গিয়ে ফেরত এসেছেন। এ নিয়ে ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। নগরীর চকবাজারের চাল ব্যবসায়ী ছালেহ আহমদ বলেন, হাওড়ে বন্যার পর থেকে চাল সঙ্কটের কথা বলে পর্যাপ্ত চাল সরবরাহ দিচ্ছে না মজুদদাররা। ফলে দিনের চাল দিনে নিয়ে ব্যবসা করছি। অথচ চাক্তাইয়ের প্রতিটি গুদামে অতিরিক্ত চাল মজুদ আছে। তিনি বলেন, চাল সঙ্কটের কথা বলে মজুদদাররা বেশি দাম হাতিয়ে নিচ্ছেন। আর নিয়ে প্রশাসন নড়াছড়া করায় মজুদদারদের মাথা-ব্যাথা শুরু হয়েছে। ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযানে হামলা চালিয়েছে। এমনকি চালের আড়ত বন্ধ রেখে মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলছে। রিয়াজ উদ্দিন বাজারের খুচরা চাল ব্যবসায়ী শেখ ফরিদ বলেন, ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান ও হামলার ঘটনায় চালের আড়তদার ও পাইকারী ব্যবসায়ীরা আজ বুধবার সকাল থেকে আড়ত ও দোকান বন্ধ রেখে চাক্তাইয়ে দফায় দফায় বৈঠক করছে। এতে খুচরা ব্যবসায়ীদের বেশিরভাগই চাল না পেয়ে ফেরত গেছে। এ কারণে চালের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে।
প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চাল নিয়ে সারাদেশে অভিযান পরিচালনা করায় এক রকম চাপা অস্থিরতা বিরাজ করছে। চালের দাম কমার কথা বললেও সেটা মোটেও ঠিক নয় বলে জানান তিনি।

ভ্রাম্যমান আদালত ও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মোরাদ আলী বলেন, আড়তে চালের অবৈধ মজুদ গড়ে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টির মাধ্যমে দাম বাড়ানোর প্রেক্ষিতে চাক্তাইয়ে মঙ্গলবার বিকেলে অভিযান শুরু করা হয়।

অভিযানে অতিরিক্ত মূল্যে চাল বিক্রি ও অতিরিক্ত চাল মজুদের অভিযোগে হাজী বদিউর রহমান এন্ড সন্স নামের প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার দিদারুল আলমকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এর ৩৮ ও ৪০ ধারায় তিন মাস কারাদ- ও এক লাখ টাকা অর্থদ- প্রদান করে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপরই কর্মচারী ও ব্যবসায়ীরা হামলা চালিয়ে তাকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। তিনি জানান, এ সময় চালের অন্য আড়ৎগুলো বন্ধ করে দেয় আড়তদাররা। এমনকি চাল পরিবহণের কাজে ব্যবহৃত ঠেলাগাড়ি দিয়ে সড়ক অবরোধ করে। পরে অতিরিক্ত র‌্যাব-পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌছালে অন্য আড়ত গুলোতে অভিযান না চালিয়ে আটক দিদারুল আলমকে নিয়ে ফিরে আসা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার দায়ে জাহিদুল ইসলাম শাওন নামের অপর একজনকে দন্ডবিধি ১৮৬০ এর ১৮৬ ধারায় ১ মাসের কারাদন্ড দেয়া হয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, আজ বুধবার দুপুর ২টা পর্যন্ত চাক্তাইয়ে চালের সবকটি আড়তের দরজা প্রায় বন্ধ। মঙ্গলবার বিকেলে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযানের সময় সড়কে ছড়িয়ে রাখা ঠেলা গাড়ি ও ভ্যানগুলোও সেভাবেই রয়েছে।

আড়ৎ বন্ধ রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে চাক্তাই চাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি এনামুল হক বলেন, চাল মজুদ করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও অতি মুনাফার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নিতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু ঢালাওভাবে অভিযান পরিচালনা করে আতঙ্ক সৃষ্টি করলে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব তো পড়বেই।

তিনি বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে আজ সকাল থেকে চাল ব্যবসায়ী সমিতির কার্যালয়ে বৈঠক চলছে। চাল ব্যবসায়ী সমিতি ও মিল মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ উপস্থিত রয়েছে। এ কারণে চালের আড়ৎ ও পাইকারী দোকানগুলো হয়তো কেউ কেউ বন্ধ রেখেছেন।

প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চালের আড়ত ও পাইকারী দোকন বন্ধ রাখার বিষয়ে ব্যবসায়ী সংগঠন এখনো কোনো কর্মসুচি দেয়নি। প্রশাসনের ঢালাও অভিযান বন্ধ ও গ্রেপ্তারকৃতদের ছাড়া না হলে কর্মসূচি দেওয়ার বিষয়টিও সামনে চলে আসতে পারে।

জানতে চাইলে চাক্তাইয়ে চালের অন্যতম আড়তদার ইদ্রিস এন্ড সন্সের মালিক মো. ইদ্রিস মুঠোফোনে বলেন, সরকারের ঘোষিত শুল্ক ছাড়াও অঘোষিত শুল্ক দিয়ে চাল আমদানি করতে হয় আমাদের। চালের বস্তাপ্রতি ১০-১৫ টাকার বেশি লাভ করা সম্ভব হয় না। কারণ ব্যবসায়ীদের মাঝেও তো প্রতিযোগিতা রয়েছে।

তিনি বলেন, চালের দাম বাড়ার পেছনে সরকারই সবচেয়ে বেশি দায়ী। সরকারের প্রশাসন ব্যবসায়ীদের পকেটের পয়সাও কেড়ে নেবে; আবার বিক্রয়মূল্যও বেঁধে দিবে তা তো হয় না। লোকসান দিয়ে তো কেউ ব্যবসা করবে না। ব্যবসার পরিবেশ না পেলে অনির্দিষ্টকালের জন্য আড়তে তালা ঝুলিয়ে রাখার কথা বলেন তিনি।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জিল্লুর রহমান চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, অভিযান চালানোর আগে চালের আড়ৎদার ও পাইকারী ব্যবসায়ীদের আমরা সতর্ক করেছি। কিন্তু তাতে তারা কর্ণপাত করেনি। তাই অভিযান চালানো হচ্ছে। পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে আবারো অভিযান চালানো হবে বলে জানান তিনি।
[এমকে]

 

 

 

 

 

 

 

 

সূত্র : মানবজমিন অনলাইন পত্রিকা