চরম অব্যবস্থাপনায় দুর্ভোগে হজযাত্রীরা

17

হজ ব্যবস্থাপনায় চলছে চরম অব্যবস্থা। একের পর এক বাতিল হচ্ছে নির্ধারিত হজ ফ্লাইট। হজযাত্রী পরিবহন শুরুর ১২ দিনে বাতিল হয়েছে ১৯টি ফ্লাইট। কাঙ্ক্ষিত ফ্লাইট বাতিলের পর প্রতীক্ষার নতুন ফ্লাইট কখন পাওয়া যাবে তা নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা। এ অবস্থায় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ঢাকায় এসে দুর্ভোগে পড়ছেন হজযাত্রীরা। রাজধানীর হজ ক্যাম্প, হোটেল ও আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় ভোগান্তির দিন পার করছেন কয়েক হাজার হজযাত্রী। থাকা-খাওয়ার অসুবিধার পাশাপাশি গচ্চা যাচ্ছে বাড়তি টাকা। এ নিয়ে ট্রাভেল এজেন্সি, মধ্যস্বত্বভোগী, হাব, হজ অফিস, ধর্ম মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ বিমান, বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয় একে অন্যের উপর দায় চাপিয়ে পার পেতে ব্যস্ত।
বগুড়ার আবু বক্কর ছিদ্দিক এবং ভোলার আবদুস সাত্তার ও মো. দানেস মিয়াসহ ৩৭ জন গত বছরই হজে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। আল আরাফাহ হজ এজেন্সির মাধ্যমে হজে যাওয়ার প্রস্তুতি ছিল তাদের। কিন্তু আজ না কাল বলতে বলতে তাদের ঘুরাতে থাকে ওই এজেন্সি। সর্বশেষ গত বছর হজের দু’দিন আগে তাদের ফ্লাইট হবে বলে জানানো হলেও সেবার শেষ পর্যন্ত তাদের আশা ভঙ্গ হয়। যাওয়া হয়নি প্রতীক্ষার হজে পবিত্র মক্কা-মদিনায়।
এ বছর তারা আবার হজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলে আগের এজেন্সি মিডিয়া ট্রাভেল সার্ভিস নামে অপর একটি হজ এজেন্সির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে দেয়। কিন্তু ভোগান্তি তাদের পিছু ছাড়ে না। গত ২৮শে জুলাই ফ্লাইটের কথা বলে তার আগের দিন ২৭শে জুলাই তাদের ঢাকায় আনা হয়। কিন্তু ওই দিন তাদের পাঠানো হয়নি। এরপর ৩১শে জুলাই ফ্লাইট হবে বলে জানানো হয়। তাও হয়নি। সর্বশেষ গতকাল ভোর ৪টায় ফ্লাইটের কথাও বলা হলেও তাদের যাওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত গতকাল সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় তাদের সৌদি আরবের উদ্দেশ্যে পাঠানো হবে বলে জানানো হয়। অথচ গত ২৭শে জুলাই থেকে ৯ দিন ধরে তারা ভোগান্তির দিন পার করেন। কেউ হজ ক্যাম্পে, কেউ হোটেলে, কেউ ঢাকায় আত্মীয়স্বজনের বাসায়। গতকাল দুপুরে হজ ক্যাম্পের ডরমেটরি-২ এ তাদের সঙ্গে কথা হয়। সেখানেই গত নয় দিন ধরে তাদের অধিকাংশ অবস্থান করেছিলেন।
আবু বক্কর ছিদ্দিক মানবজমিনকে বলেন, একে তো গত বছর আমরা হজে যেতে পারিনি। এবারও দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। দায়িত্বরত এজেন্সি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নানা অব্যবস্থাপনায় আমরা বার বার ভোগান্তির মধ্যে পড়ছি। আসলে কখন ফ্লাইট হবে তা নিশ্চিত হতে পারছি না। এখন দুঃখের কথা বলার জন্য এজেন্সির লোকদেরও কাছে পাচ্ছি না।
দানেস মিয়া বলেন, ঢাকায় হোটেলে থাকতে এখন আমার প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা করে বাড়তি খরচ হচ্ছে। অথচ কারও যেন কোনো দায়-দায়িত্ব নেই।
নরসিংদীর রায়পুরা থেকে আসা অপর হজযাত্রী কবির আহমেদ বলেন, গতকাল সকালে আমার ফ্লাইট হওয়ার কথা ছিল। তা বাতিল হয়েছে। এখন বলা হচ্ছে শনিবার সন্ধ্যায় ফ্লাইট পাওয়া যাবে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা থাকলে তো এমন হতো না। ভোলার মনপুরা উপজেলার ১ নম্বর মনপুরা ইউনিয়নের ফাতেমা আক্তারের ফ্লাইট বাতিল না হলেও তার ভোগান্তি যথা সময়ে ভিসা না পাওয়ায়। গত ২৮ তারিখ তার যাওয়ার কথা থাকায় তিনি তার আগেই ঢাকায় আসেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দারুস সুন্নাহ ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে ওই যাত্রী শুক্রবারের ফ্লাইটে যাওয়ার খবরে আশ্বস্ত হন।
এভাবে হজ এজেন্সির ও মধ্যস্বত্বভোগীর প্রতারণা ও অবহেলা, ভিসা পেতে বিলম্ব, ভিসার প্রিন্ট নিতে যান্ত্রিক ত্রুটি, হজ অফিসের কর্মকর্তাদের অবহেলা, বাংলাদেশ বিমান ও সৌদিয়ার একের পর এক ফ্লাইট বাতিল ইত্যাদির কারণে বার বার দুর্ভোগে পড়ছেন হজযাত্রীরা। তারা হজের আগে কিছু সময়ের বিশ্রাম ও ইমিগ্রেশনের জন্য প্রথমে হজ ক্যাম্পে উঠেন। একে একে হজ ফ্লাইট বাতিল ও নানা সমস্যায় পড়ে তা দীর্ঘতর হচ্ছে অর্ধমাস পর্যন্তও। গতকাল দুপুরের আগে রাজধানীর হজ ক্যাম্পে গিয়ে দেখা যায় অব্যবস্থাপনার নানা চিত্র। সেখানে শত শত হজযাত্রীর অবস্থান থাকলেও হজ অফিসের পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম ও সহকারী হজ অফিসার মো. আবদুল মালেকের অফিসে ঝুলছে তালা। দুপুর ১২টার পর থেকে পৌনে ৩টা পর্যন্ত তাদের অফিসে দেখা যায়নি। এ দিকে ভবনের পঞ্চমতলা পর্যন্ত হজ ক্যাম্পের প্রায় ডরমেটরিতে পাতা বিছানায় হজযাত্রীদের অবস্থান করতে দেখা গেছে।
একই দিন সকালে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের একটি টিম হজ ক্যাম্পে যাওয়ার কথা ছিল। অবৈধ কোনো লোক বাইরে যাচ্ছে কিনা তা যাচাই করার জন্য তাদের সেখানে যাওয়ার সময় ছিল সকাল ১০টায়। কিন্তু বিকালে পৌনে ৩টা পর্যন্তও তাদের দেখা মেলেনি। তাদের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা গেছে পরবর্তীতে বেশ কিছু হজ এজেন্সির মালিক ও কর্মকর্তাদের।
স্কাই গেস্ট ট্রাভেলস নামে হজ এজেন্সির ব্যবস্থাপক মো. ইউনুচ সরকার বলেন, বেলা ১২টা থেকে প্রায় ৩টা পর্যন্ত হজ অফিসের পরিচালক ও কর্মকর্তাদের কক্ষে তালা ঝুলতে দেখা যাচ্ছে। এদিকে সকাল ১০টা থেকে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের পাসপোর্ট ভেরিফাই করার টিমের জন্য অপেক্ষায় আছি। এজন্য আমাদের এই ট্রাভেল এজেন্সির ১৬৪ ও আমাদের অপর প্রতিষ্ঠান ময়নামতি ট্রাভেল এজেন্সির ১৯৯ যাত্রীর পাসপোর্ট ভেরিফাই আটকে আছে।
জানা যায়, ২০১৭ সালে বাংলাদেশ থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জনের হজ কোটা অনুমোদন করে সৌদি সরকার। এরমধ্যে সরকারি ব্যবস্থায় ৪ হাজার ২০০ ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ১ লাখ ২২ হাজার ৯৯৮টি হজ কোটা। এবার একই সংখ্যক হজযাত্রী পবিত্র হজ পালনের অপেক্ষায় আছেন। ধর্ম মন্ত্রণালয় কর্তৃক ১ হাজার ১৬২ ট্রাভেল এজেন্সির অনুমোদন থাকলেও এবার সরকারের সঙ্গে দ্বি-পাক্ষিক চুক্তি সম্পাদন ও প্রাক নিবন্ধনে অংশ নিয়েছে ১ হাজার ৯৭টি প্রতিষ্ঠান। এই এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে হজযাত্রীরা হজের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এরমধ্যে ৭০ হাজার ৮২টি হজ ভিসার জন্য লাউজম্যান্ট সম্পন্ন হয়েছে। আর সৌদি দূতাবাস থেকে ভিসা পাওয়া গেছে ৫৭ হাজার ৮৭৯টি। এরমধ্যে ৩ হাজার ৮৪৪টি সরকারি ও ৫৪ হাজার ৩৫টি বেসরকারি ব্যবস্থাপনার ভিসা। হজযাত্রীদের অর্ধেক বহন করছে বাংলাদেশ বিমান ও বাকি অর্ধেক সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় ক্যারিয়ার সৌদিয়া। গত ২৪শে জুলাই প্রথম হজযাত্রী পরিবহন শুরু হয়েছে। এর ৬ দিনের মাথায় গত ২৯শে জুলাই বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইট বাতিলের মাধ্যমে হজ ফ্লাইট বাতিল শুরু হয়েছে। কিন্তু তা যেন কিছুতেই থামার নয়। বরং দিন দিন বাড়ছে। এরপর বাতিল হয় ৪টা ফ্লাইট। সে দিন সৌদিয়ার একটি ফ্লাইটও বাতিল হয়। এরপর চলতি মাসের প্রথম ৫ দিনের প্রতিদিনই বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। গত ১লা আগস্ট ১টি, ২রা আগস্ট ৩টি, ৩রা আগস্ট ১, ৪ঠা আগস্ট ১টি করে ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এছাড়া সৌদিয়ার আরো ২টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এর বাইরে আজ দুটি ফ্লাইট বিজি ৩০৪১ ও বিজি ৫০৩৫ নম্বর ফ্লাইট বাতিল ঘোষণা করা হয় গতকালই। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ বিমানের ১৬ ও সৌদিয়ার ৩টিসহ ১৯টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন অন্তত ৭ হাজার হজযাত্রী। অন্য দিকে গতকাল সকাল ৯টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত ৩৫ হাজার ২৯৪ হজযাত্রী সৌদি আরব গমন করেছেন। এর মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ বিমান ৪২টি ফ্লাইটে বহন করেছে ১৬ হাজার ৩৬০ যাত্রী। আর সৌদিয়া ৫৯ ফ্লাইটে বহন করেছে ১৮ হাজার ৯৩৪ হজযাত্রী।
প্রতিবারই এভাবে হজযাত্রীদের ভোগান্তির বিষয়ে জানতে চাইলে হজ এজেন্সিগুলোর সংগঠন হাবের মহাসচিব মো. শাহাদত হোসেন তসলিম বলেন, এজেন্সির কোনো ত্রুটি নয়, ভিসা পেতে সমস্যা হওয়ার কারণে ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।