চালের বাজারে অস্থিরতা মজুতদারদের বিরুদ্ধে অভিযান

56

চালের বাজারের অস্থিরতা থামছে না। অব্যাহতভাবে বাড়ছে চালের দাম। তদারক কর্তৃপক্ষ, মিলমালিক, আড়তদার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা এজন্য একে অপরকে দুষছে। সরকারের তরফে কড়া হুঁশিয়ারি দেয়া হচ্ছে মজুতদারির বিরুদ্ধে। গতকাল চালের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে মিলমালিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন বাণিজ্য ও খাদ্যমন্ত্রী। বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, অস্বাভাবিক ও অবৈধ মজুতদারদের চিহ্নিত করে তাদের গুদামে অভিযানের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। প্রয়োজনে তাদের গ্রেপ্তার করতে বলা হয়েছে। দিনে সচিবালয়ে বৈঠকের পর কুষ্টিয়ায় বাংলাদেশ রাইস মিল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুর রশিদের গুদামে অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে ওই গুদামে আটক বা জব্দ করার মতো কোনো চাল ছিল না। পরে আরো কয়েকটি মিল ও গুদামে অভিযান চালানো হয়। এদিকে চালের দাম বাড়ার অস্থিরতার মধ্যে গতকাল থেকে শুরু হয়েছে খোলা বাজারে চাল বিক্রির কার্যক্রম। তবে নির্ধারিত সব স্পটে চাল বিক্রি হয়নি। ডিলাররা জানিয়েছেন প্রস্তুতি না থাকায় এমনটা হয়েছে। রাজধানীতে ওএমএস এর ডিলাররা আতপ চাল বিক্রি করায় এতে ক্রেতাও কম। গতকাল কয়েকটি দোকান ঘুরে দেখা গেছে বিকাল পর্যন্ত দিনের বরাদ্দের অর্ধেক চালও বিক্রি হয়নি। আতপ চাল বলে অনেকে তা নিতে চাইছেন না। দ্বিগুণ দাম বাড়িয়ে এবার ৩০ টাকা কেজি দরে ওএমএস’র চাল বিক্রি হচ্ছে। মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে গতকাল মিল মালিকদের ডেকে বৈঠক করেন দুই মন্ত্রী। আগামী মঙ্গলবার চালের বাজার সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে মন্ত্রণালয়ে ফের বৈঠক ডাকা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে বৈঠকে চাল সংকট কাটাতে দেশের কোথায় এবং কোন গুদামে চাল মজুদ আছে ওই বিষয়টি জানতে চান বাণিজ্যমন্ত্রী। একপর্যায়ে বাংলাদেশ রাইস মিল অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান আব্দুর রশিদ ও সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলীর নাম আলোচনায় উঠে আসে। অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা জানান, আব্দুর রশিদের বাড়ি কুষ্টিয়ায়। তিনি মিনিকেট রশিদ নামেও পরিচিত। কুষ্টিয়া ও নওগাঁয় তার চালের মিল ও গুদাম আছে। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তার গুদামে অভিযান চালিয়ে অতিরিক্ত চাল মজুদের প্রমাণ পায়। এ সময় তাকে মাত্র ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। চালকল মালিকদের কাছ থেকে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে পেরে বাণিজ্যমন্ত্রী তৎক্ষণাৎ কুষ্টিয়ার এডিসি ও নওগাঁর ডিসি এবং দুই জেলার এসপির সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। এ সময় বাণিজ্যমন্ত্রী মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বলেন, একজন চাল মজুদকারীকে কিভাবে মাত্র ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। পরে তিনি ফের অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, আমি সব জেলার ডিসিদের সঙ্গে ফোনে কথা বলবো। যেখানে যেখানে চালের গুদাম আছে সেখানে অভিযান চালানো হবে। অতিরিক্ত মজুদ রাখলে মিল মালিকদের তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তার করা হবে। কারণ তারা সিন্ডিকেট করে বাজারে চাল সংকটের গুজব ছড়িয়েছে। তারাই সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে ষড়যন্ত্র করছে। এ সময় বাণিজ্যমন্ত্রী সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলীর গুদামেও অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়ে বলেন, এটা আমাদের সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ। চালের ইস্যুটি ধৈর্য্যের চরম সীমায় পৌঁছেছে। বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, আগামী মঙ্গলবার খাদ্য মন্ত্রণালয়ে সব মিল মালিক অ্যাসোসিয়েশন, আমদানিকারক অ্যাসোসিয়েশন, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তিন মন্ত্রণালয়ের যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে যদি প্রমাণ হয় আব্দুর রশিদ ও লায়েক আলীর অ্যাসোসিয়েশন চাল সংকটের জন্য দায়ী তাহলে তাদের অ্যাসোসিয়েশনের রেজিস্ট্রেশন বাতিল করা হবে।
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, বাংলা?দেশ চালকল মা?লিক সমি?তির কেন্দ্রীয় সভাপ?তি আব্দুর র?শি?দের খাজানগরস্থ রশিদ এগ্রোফুডে অভিযান চালিয়েছে বাজার ম?নিট?রিং টিম কুষ্টিয়ার সদস্যরা। মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে সাড়ে ৫টা পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান ও পুলিশ সুপার এসএম মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে বিপুল সংখ্যক পুলিশ দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চালের মোকাম কুষ্টিয়ার খাজানগরে অবস্থিত রশিদ এগ্রোফুড লিমিটেডে অভিযান চালায়। তবে আব্দুর রশিদের গুদামে কোনো কিছু না পেয়ে খালি হাতে ফেরত আসেন টাস্কফোর্সের সদস্যরা। এর পর টাস্কফোর্স সদস্যরা পাশের জোয়ার্দার রাইস মিলে অভিযান চালান। সেখানেও কোনো কিছুর সন্ধান না পেয়ে ফিরে আসে। অভিযান প্রসঙ্গে কুষ্টিয়ার ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান জানান, চালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে কঠোর মনিটরিংয়ের পাশাপাশি নিয়মিত টাস্কফোর্সের অভিযান চলছে। এরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশ চালকল মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুর রশিদের গুদামে অভিযান চালানো হয়েছে। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সম্প্রতি সরকারি একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রায় দু লাখ টন চাল মজুদ রাখা আছে রশিদের গুদামে এমন তথ্যের ভিত্তিতে গত ১১ই সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়া সদর এসিল্যান্ড সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে টাস্কফোর্স সদস্যরা বাংলাদেশ চালকল মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুর রশিদের গুদামে অভিযান চালায়।
এদিকে নওগাঁ জেলা প্রশাসক ড. আমিনুর রহমান মানবজমিনকে জানিয়েছেন, কোন মিল মালিক অবৈধ ধান-চালের মজুত করলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। তাই কারও কাছে কোন ধরনের অবৈধ মজুত থাকলে তা বাজারে ছেড়ে দিতে হবে। অন্যথায় আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। লায়েকুদ্দিনের গ্রেপ্তারের বিষয়ে তিনি বলেন, তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে এখনও কোনো নির্দেশনা আসেনি।

অস্থির পাইকারি বাজার: চালের দাম অব্যাহতভাবে বাড়তে থাকায় রাজধানীর পাইকারি বাজারেও অস্থিরতা লক্ষ্য করা গেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে পাইকারি বাজারে মোটা চালের দাম কেজিতে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। রাজধানীর বাবুবাজার ও বাদামতলী এলাকার পাইকারি বাজারে সরজমিন ঘুরে দেখা গেছে, এক সপ্তাহ আগেও প্রতি কেজি মোটা চাল বিক্রি হয়েছিল ৪১-৪২ টাকায়। একই চাল এখন বিক্রি হয় ৪৯ থেকে ৫৫ টাকা কেজিদরে। অন্য চালের দামও প্রায় একই হারে বেড়েছে বলে জানান এ বাজারের ব্যবসায়ীরা।
বাবুবাজার ও বাদামতলী বাজারে পাইকারি পর্যায়ে মানভেদে প্রতি কেজি মিনিকেট চাল ৫৮ থেকে ৬২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগে দাম ছিল ৫০ থেকে ৫৩ টাকা। একইভাবে এক সপ্তাহ আগে ৫৮ থেকে ৬০ টাকা কেজিদরের নাজিরশাইল চাল এখন বিক্রি হচ্ছে ৬৮ টাকায়। এ ছাড়া ৪৬-৪৭ টাকার বিআর-২৮ চাল এখন বিক্রি হচ্ছে ৫৪-৫৬ টাকা কেজিদরে। আর বস্তাপ্রতি গড়ে চালের দাম বেড়েছে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা।
বাদামতলী-বাবুবাজার চাল আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন সরকার বলেন, তিন-চারদিন ধরে বড় চালকল মালিকরা সরবরাহ আদেশ নিচ্ছেন না। তবে হাসকিং মিল মালিকরা এখনো চাল সরবরাহ দিচ্ছেন। তিনি বলেন, অনেক আগে থেকেই চাল আমদানির সুযোগ চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন জানানো হয়েছিল। ওই সময় দিলে সু-ফল পাওয়া যেত। কিন্তু পরে যখন শুল্ক কমিয়ে সরকার চাল আমদানির সুযোগ দিলো, ততদিনে বিভিন্ন দেশ চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে শুল্ক কমানোর সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না।
চাল ব্যবসায়ী মেসার্স উৎসব ভাণ্ডারের মালিক মো. ফারুকুল ইসলাম বলেন, আমরা চাল কিনি কুষ্টিয়া, নওগা ও রগুড়া থেকে। সেখান থেকে আমরা চালের সরবরাহ কম পাচ্ছি। তাছাড়া চালের দাম বাড়ায় বেচা-বিক্রিও কমে গেছে। তিনি জানান, বর্তমানে বড় বড় ব্যবসায়ীগোষ্ঠী এসিআই, তীর ও অ্যারিস্টো গ্রুপের মতো কোম্পানি চাল ব্যবসায় চলে এসেছে। এরা সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনে। তাদের কাছে এখন ধান-চালের বিশাল মজুদ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তার মতে, বর্তমান সংকটের জন্য এটাও একটা কারণ।
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর খুচরা বাজারগুলোয় প্রতি কেজি মোটা চাল বিক্রি হয় ৫০-৫৪ টাকায়। এক সপ্তাহ আগেও এ চাল বিক্রি হয়েছিল প্রতি কেজি ৪৩-৪৫ টাকায়। অর্থাৎ টিসিবির হিসাবেই এক সপ্তাহের ব্যবধানে মোটা চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৭-৯ টাকা।
ওএমএসের আতপ চালে আগ্রহ কম: খোলাবাজারে চাল বিক্রি (ওএমএস) শুরু হয়েছে গতকাল থেকে। সারা দেশে খাদ্য অধিদপ্তরের অনুমোদিত ডিলারদের মাধ্যমে বিক্রয় কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে নির্ধারিত সব কেন্দ্রে গতকাল চাল পাওয়া যায়নি। আর রাজধানীতে বিক্রি হয়েছে আতপ চাল। ৩০ টাকা কেজি দরে এ চাল কিনতে ক্রেতাদের তেমন আগ্রহ দেখা যায়নি। গত বছর খোলা বাজারে চাল বিক্রি হয় ১৫ টাকা কেজিতে। এবার তা বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হয়েছে। গতকাল রাজধানীর কয়েকটি বিক্রয় কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে বিকাল পর্যন্ত দিনের বরাদ্দের অর্ধেক চালও বিক্রি করতে পারেননি ডিলাররা। সাধারণত নিম্ন আয়ের মানুষজন ওএমএসের চাল কিনেন। আতপ চাল হওয়ায় তারা এ চাল কিনছেন না।
ক্রেতারা জানান, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের মানুষ ছাড়া অন্য বিভাগের সাধারণ মানুষ আতপ চাল খেতে অভ্যস্ত নয়। গতকাল এফডিসি ও বিজিএমইএ ভবনের সামনে গিয়ে দেখা গেছে, এখানে ক্রেতার উপস্থিতি ছিল কম। এ কারণে সারা দিনে ট্রাকের অর্ধেক চালও বিক্রি করতে পারেনি বলে জানান এক বিক্রয় কর্মী। মিরপুর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও আনসার ক্যাম্পের পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়, ডিলাররা চাল নিয়ে বসে আছেন। আটা বিক্রি হলেও চালের ক্রেতা কম। আনসার ক্যাম্প পয়েন্টের ডিলার কামরুল হাসান বলেন, সারা দিনে তিন বস্তা চাল বিক্রি হয়েছে। এর বিপরীতে আটা বিক্রি করেছি ছয় বস্তা। আতপ চাল কেউ খায় না। আমাদেরকে আতপ চাল ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। আতপ চাল না নিলে আমদের ডিলারশিপ বাতিল হয়ে যাবে। বাধ্য হয়ে এ চাল আমাদের আনতে হয়েছে। ক্রেতা নেই তাই চায়ের দোকানে বসে আছি। এদিকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর পয়েন্টে দেখা যায়, ট্রাকের উপরে বসে সময় পার করছেন ডিলারের লোকজন। মাঝেমধ্যে দু-একজন আটার ক্রেতা এলেও চালের কোনো ক্রেতার দেখা মিলছে না। এ ডিলার গতকাল সারা দিনে চাল বিক্রি করছেন মাত্র দুই বস্তা। তিনি বলেন, এ চাল কে কিনবে। আমাদের উপর বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। একে তো দাম বাড়ানো হয়েছে। তার মধ্যে আবার আতপ চাল। কয়জনে খায় এ চাল। যেজন্য বিক্রি হচ্ছে না।

 

 

 

 

 

 

সূত্র : মানবজমিন অনলাইন পত্রিকা