চাল আমদানি করছেন না ব্যবসায়ীরা

33

অভিযানের মুখে মজুদ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন চট্টগ্রামের চাল ব্যবসায়ীরা। তাতে চালের মূল্য কমেছেও। কিন্তু এ নিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছেন চাল ব্যবসায়ীরা। ক্ষোভে-অপমানে চাল আমদানি বন্ধ করে দিয়েছেন তারা।
চাল ব্যবসায়ীদের একটি সূত্র জানিয়েছেন, গত ১৮ই সেপ্টেম্বর অভিযান শুরুর পর থেকে চট্টগ্রামে এক ট্রাক চালও আমদানি করা হয়নি। ফলে বর্তমানে মজুদকৃত চাল শেষ হয়ে গেলে চালের বাজারে আবার নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। যা সামলাতে সরকারকে হিমশিম খেতে হবে। তখন বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণ দামেও বাজারে চাল পাওয়া যাবে না।

আলাপকালে ব্যবসায়ীরা জানান, অভিযানের কারনে দেশের বিভিন্ন বন্দরে আমদানি করা চাল পড়ে আছে। মজুদকৃত চাল জব্দ করায় আমদানি করা চাল এনে গুদামজাত করতে ভয় পাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ীরা আরো জানান, দেশে চাহিদার সিংহভাগ চাল ভারত থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ, হিলি ও বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি করা হয়। অভিযানের পর আমদানি করা চালের ট্রাক সোনামসজিদসহ সবকটি স্থলবন্দরে পৌছালেও সেখান থেকে আনা হচ্ছে না। স্থলবন্দর ও স্থলবন্দরে বাইরে প্রাইভেট খাদ্যগুদামগুলোয় প্রচুর পরিমাণে আমদানি করা চাল পড়ে রয়েছে।

সোনামসজিদ স্থলবন্দরের শুল্ক স্টেশনের সহকারী কমিশনার সাইদুল ইসলাম জানান, গত সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত পানামা ইয়ার্ডের ভেতরে প্রায় ২৯৫টি চালভর্তি ভারতীয় ট্রাক পড়ে রয়েছে। এর অধিকাংশই চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের।

তিনি জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে গত জুলাই থেকে ২৪শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় এক লাখ টন চাল আমদানি হয়েছে। প্রতিদিন ভারত থেকে ৭০-৭৫টি করে চালভর্তি ট্রাক আসছে।

পানামা পোর্ট লিংক লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার বেলাল হোসেন জানান, সাধারণ সোনামসজিদ বন্দর দিয়ে ভারত থেকে আমদানি করা চাল জেলার বাইরে গেলেও, এবার জেলার বাইরে কম যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে চালের দাম কেজিপ্রতি ৪-৫ টাকা কমে যাওয়ায় বাইরের ব্যবসায়ীরা চাল নিতে আসছেন না।

ফলে পাইকারী বাজারেও উল্লেখযোগ্য হারে চালের দাম কমছে না। এমনকি খুচরা বাজারেও চালের মূল্য কমার তেমন কোনো প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না। যদিও ব্যবসায়ীরা বলছেন, আস্তে আস্তে চালের দাম কমে আসবে।
এ ব্যাপারে চট্টগ্রামের চাক্তাইয়ে চাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ইদ্রিস এন্ড সন্সের মালিক মো. ইদ্রিস বলেন, কে কি করছে জানি না। আমি আগের মজুদকৃত চাল বিক্রী করছি। ফলে চাল আমদানি করছি না।

তিনি বলেন, বেশি দামে চাল আমদানি করে কম দামে চাল বিক্রীর খায়েশ কারো নেই। চাল আমদানি করে গুদামে রাখলে অবৈধ মজুদের কথা বলে তা জব্দ করছে প্রশাসন। জেল-জরিমানা করছে। প্রশাসনের কথামতো চাল বিক্রী করলে লোকসান দিতে হচ্ছে। লোকসান দিয়ে ব্যবসা করার চেয়ে না করাই তো ভাল। তাই চাল আমদানি করছি না।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মোরাদ আলী এ প্রসঙ্গে বলেন, হাওড়ে বন্যার পর থেকে সারাদেশের সাথে চট্টগ্রামেও চালের মূল্য বেড়ে যায়। প্রথম দফায় দ্বিগুণ পরে চালের মূল্য আরো বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার নড়েচড়ে বসে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্যমতে, মজুদের কারনেই চালের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে অবৈধ মজুদ ও চালের মূল্য নিয়ন্ত্রণে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করে জেলা প্রশাসন। গত ১৮ই সেপ্টেম্বর অভিযান শুরুর পর মজুদ চাল জব্দ, গুদাম সীলগালা, অর্থ ও কারাদন্ড প্রদানে মজুদ ছেড়ে বাধ্য হয় চাল ব্যবসায়ীরা। এতে চালের মূল্য বস্তাপ্রতি ২০০-২৫০ টাকা কমে আসে। কেজিতেও ২-১টাকা কমেছে। দাম আরো কমাতে খুচরা পর্যায়েও সতর্কতা জারি করেছে প্রশাসন।

আর এই অভিযানে সাধারণ মানুষের হতাশা কমলেও নানা রকম চালবাজিতে লিপ্ত রয়েছে চাল ব্যবসায়ীরা। তারা দফায় দফায় বৈঠক করে নানা হুমকি-ধমকি দিলেও তাতে সফল হননি। এরমধ্যে চাল আমদানি বন্ধের হুমকিও দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। তবে এ ব্যাপারে কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি ও জেলা প্রশাসন সতর্ক রয়েছে বলে জানান তিনি।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম পাহাড়তলী চাল ব্যবসায়ী সমিতির সহসভাপতি মো. জাফর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে আমাদের কোন হাত নেই। বেনাপোল, হিলি, সোনামসজিদসহ স্থল বন্দর ও উত্তরবঙ্গের মিল মালিক এবং আমদানিকারকদের উপর চট্টগ্রামের বাজার নির্ভরশীল।

তিনি বলেন, চালের বড় পাইকারি মোকাম নওগাঁ, দিনাজপুর, শান্তাহারসহ কয়েকটি জেলায় কোনো অভিযান চালানো হয়নি। অভিযান শুধু চট্টগ্রামে কেন? এসব জেলার কয়েকজন ব্যবসায়ীর হাতে বাংলাদেশের কয়েক মাসের ধান-চাল মজুদ রয়েছে। সবার আগে সেখানে অভিযান চালানো দরকার।

চাক্তাই চাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ স¤পাদক ওমর আজম বলেন, চট্টগ্রামে যেভাবে ঢালাও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে তাতে বাজারে কোনদিনও স্থিতিশীলতা আসবে না। অভিযানের কারণে চাল ছেড়ে দেয়ায় মূল্য কমলেও তা হবে সাময়িক। এর নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের চাল আমদানিতে আগ্রহ কমেছে।

[এমকে]

 

 

 

সূত্র : মানবজমিন অনলাইন পত্রিকা