চিকুনগুনিয়ার প্রভাবে রক্তদাতার সংকট

30

ছত্রিশ বছর বয়সী মাহমুদ। নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্ত দেন কোয়ান্টামে। সমপ্রতি তিনি চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। তার শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত রক্ত দেবেন না বলে জানিয়েছেন। চিকুনগুনিয়ার কারণে নিয়মিত রক্তদানে তার ছন্দপতন হয়েছে। এই জ্বর তার রক্তদানে প্রভাব ফেলেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। আরেক স্বেচ্ছায় রক্তদানকারী কামাল উদ্দিন। তিনিও নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্ত দেন একই প্রতিষ্ঠানে। মাস দেড়েক হলো তার চিকুনগুনিয়া জ্বর হয়েছে। ভাইরাসজনিত এ জ্বরের কারণে তার নিয়মিত রক্তদানে গতি হারিয়েছে। শুধু মাহমুদ বা কামাল নন, হাজার হাজার চিকুনগুনিয়া আক্রান্তকারী এখন স্বেচ্ছায় রক্তদানে কিছু দিনের জন্য হলেও বিরতি দিচ্ছেন। ফলে চিকুনগুনিয়ার প্রভাব পড়েছে স্বেচ্ছায় রক্তদানে ব্যক্তিদের মধ্যে। এতে কিছুটা হলেও রক্ত কম সংগ্রহ হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে এজন্য মুমূর্ষু রোগীদের রক্ত প্রদানে সংকট হবে না। এ প্রসঙ্গে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের রক্ত সংগ্রহ কর্মসূচির সমন্বয়ক শেখ মোহাম্মদ ফয়সাল মানবজমিনকে বলেন, চিকুনগুনিয়ার জন্য কিছুটা তো প্রভাব আছে রক্ত সংগ্রহে। চিকুনগুনিয়া হওয়ার পর অনেক ডোনার তাদেরকে বলেছেন, এই মুহূর্তে রক্ত দিতে পারছেন না। তিনি দু-এক মাস রক্ত দিতে পারবেন না। শেখ মোহাম্মদ ফয়সাল বলেন, তারা প্রতিদিন এক হাজার থেকে ১২শ’ জন পুরনো ডোনারকে ফোন দেন নিয়মিত রক্তদানের জন্য। কিন্তু এ জ্বর সম্পর্কে ব্যাপক প্রচারের কারণে স্বেচ্ছায় রক্তদানকারীদের সংখ্যা কমে আসছে। এখন নিয়মিত প্রতিদিন ২৫০ থেকে ২৮০ জন স্বেচ্ছায় রক্তদানকারী রক্ত দিচ্ছেন। আগে এ সংখ্যা ৩০০ ছিল। তিনি বলেন, এতে রক্ত সংকট হবে না। কারণ তারা এই সময়ে নতুন ডোনারদের রক্তদানে উদ্বুদ্ধ করছেন। কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের মতোই চিকুনগুনিয়া জ্বর সন্ধানী, রেডক্রিসেন্ট ব্লাডব্যাংক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বেচ্ছায় রক্তসংগ্রহকারী সংগঠন বাঁধনেও রক্তদানে কিছুটা প্রভাব ফেলেছে বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ছয় লাখ ব্যাগ নিরাপদ ও সুস্থ রক্তের চাহিদা রয়েছে। রক্ত কতটা প্রয়োজন তা চাহিদার সময়ই কেবল বোঝা যায়। এক ব্যাগ রক্তের জন্য ছোটাছুটি করতে হয় রোগীর আত্মীয়স্বজনকে। ক্লান্ত হয়ে ফিরতে হয় অনেক সময়। কিন্তু রোগীর শরীর তো মানে না, তার রক্ত চাই। রক্তের অভাবে একসময় সবার মায়া ত্যাগ করে পাড়ি জমান না ফেরার দেশে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশে যে পরিমাণ রক্তের চাহিদা, তা পূরণ হচ্ছে না। ফলে রক্তের ঘাটতির বিপুল এ চাহিদা পূরণের লক্ষ্যেই সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি ও স্বেচ্ছা রক্তদান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি বছর নিরাপদ রক্ত পাওয়া যায় সবমিলে তিন লাখের মতো। এরমধ্যে কোয়ান্টাম গড়ে প্রতি বছর সংগ্রহ করতে পারে এক লাখ ব্যাগ। আর রেডক্রিসেন্ট ও সন্ধানী মিলে আরো দেড় লাখ ব্যাগ দিতে পারে।
চিকিৎসকরা বলেন, আপাত সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক (১৮-৬০ বছর), উন্নত নৈতিক চরিত্রের অধিকারী, পরোপকারী মানসিকতাসম্পন্ন, শিক্ষিত সচেতন ব্যক্তিবর্গ, নিরোগ দেহের প্রণোদিত ব্যক্তিবর্গ (ছাত্র, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, গৃহিণী, চাকরিজীবী), ধর্মীয় অনুশাসনে জীবন-যাপনে অভ্যস্ত ব্যক্তিবর্গ রক্ত দিতে পারবেন। রক্তদান একটি মহৎ কাজ। তাই বলে নিজের জীবন বিপন্ন করে নয়। যদি আপনি থ্যালাসেমিয়ার রোগী, লিউকেমিয়ার রোগী, হাইপোপাস্টিক এনিমিয়া, হেমোফিলিয়া, হৃদরোগ যেমন ইসকেমিক হার্ট ডিজিজ, ভাল্ব রিপ্লেসমেন্ট, ভাল্বে অসুখ, স্ট্রোক, মাল্টিপল স্কেরোসিস, থাইরোটকসিকোসিস, এমফাইসেমা, ইনসুলিননির্ভর ডায়াবেটিস, ক্রোনিক কিডনি ডিজিজ, রক্তস্বল্পতা, এসএলই, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস রোগে আক্রান্ত হলে কখনো রক্ত দেবেন না।
এদিকে, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) সূত্র মতে, ৯ই এপ্রিল থেকে ২৫শে জুলাই পর্যন্ত চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত মোট সম্ভাব্য রোগীর সংখ্যা সাড়ে চার হাজারের বেশি। এর মধ্যে নমুনা পরীক্ষা- নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়েছে ৮২৪ জন। তবে এ সংখ্যা ১৯শে জুলাই ছিল ৭৫০ জন। ঢাকার বাইরে থেকেও চিকুনগুনিয়া রোগী আসছে। এর মধ্যে ১২৭ জনের খবর দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, চিকুনগুনিয়া জ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা লাখের ওপরে হতে পারে। হটলাইনে ৬ই জুলাই থেকে ২৫শে জুলাই বিকাল ৫টা পর্যন্ত ফোন এনেছে ২৩৪৬টি। এর মধ্যে মোট নতুন ও পুরনো রোগী ১৮৬৮ জন। সম্ভাব্য নতুন রোগী ৮২৮ জন। পুরনো রোগী ১,০৪০ জন। বাকিরা তথ্য জানতে ফোন দিয়েছেন।