চীন, ভারত ও রাশিয়ার সঙ্গে ব্যাপকভিত্তিক আলোচনায় ঢাকা

38

রোহিঙ্গা ইস্যুতে আগের অবস্থান বদল এবং চলমান সংকট উত্তরণে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে চীন ও রাশিয়ার ‘যৌক্তিক অবস্থান’ দেখতে চায় ঢাকা। বাংলাদেশের ঘাড়ে বোঝা হয়ে আবর্তিত ওই মানবিক সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক যেকোনো উদ্যোগে বন্ধু হিসেবে দিল্লির কার্যকর ভূমিকাও প্রত্যাশা করে সেগুনবাগিচা। এদিকে চলমান সঙ্কট নিরসনে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার দরজাও খোলা রেখেছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক চাপে মিয়ানমারও এবার খানিকটা নমনীয়। দেশটির কার্যকর নেতা স্টেট কাউন্সেলর অং সান সূ’চি তার এক দূতকে জরুরী ভিত্তিতে বাংলাদেশে পাঠাচ্ছেন। আগামী ১লা অক্টোবর স্টেট কাউন্সেলর অফিসের পূর্ণ মন্ত্রী উ চাও তিন কিয়াও বাংলাদেশ সফর করবেন। পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হক মিয়ানমার দূতের বাংলাদেশ সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ওদিকে ঢাকা সফরে রয়েছেন জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাইস মিনিস্টার আইওয়া হরি। আজ সকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপির সঙ্গে প্রাত:রাশ বৈঠকের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সফরের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু হবে তার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক যে কোন উদ্যোগেই রোহিঙ্গা সঙ্কটের একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান চায় বাংলাদেশ। একই সঙ্গে রাখাইনে জাতিগত নিধন এখনই বন্ধ হওয়া এবং বাস্তুচ্যুত লাখ লাখ রোহিঙ্গার মর্যাদা ও নিরাপত্তার সঙ্গে নিজ ভূমে ফেরতের নিশ্চয়তা চায় বাংলাদেশ। রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে আগামী বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ৭ম দফা বৈঠক হবে। নির্যাতন বন্ধে ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদের শক্তিশালী রেজুলেশন আশা করে ঢাকা। নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ঢাকাস্থ প্রতিনিধিদের আজ দুপুরে এ নিয়ে বিস্তারিত ব্রিফ করবে সরকার। সেখানে পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরার পাশাপাশি বাংলাদেশের অবস্থানও স্পষ্ট করা হবে বলে জানা গেছে।
ওদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীসহ বিদেশ নীতি বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত সরকারের দায়িত্বশীল প্রতিনিধিরা বলছেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ব্যাপকভিত্তিক (এক্সটেনসিভ) আলোচনা শুরু হয়েছে। বেইজিংয়ের অবস্থান পরিবর্তনে চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের সঙ্গেও আলোচনায় রয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দিল্লি ও মস্কোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চলছে। ঢাকার তরফে প্রায় অভিন্ন বার্তা দেয়া হচ্ছে ওই ৩ রাষ্ট্রের প্রতি। বলা হচ্ছে, শুধুমাত্র রোহিঙ্গা ইস্যু ছাড়া প্রতিবেশী মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে কোনো ঝামেলা নেই। বরং ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অনিয়মিত কূটনৈতিক সংলাপ চলছে! দীর্ঘ দিন সেনা শাসনের অধীনে থাকা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে হাজার বছরের জাতিগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের সমূলে নিধনে বর্মী বাহিনী বর্বরতা চালাচ্ছে। জাতিগতভাবে ওই জনগোষ্ঠীকে নির্মূলে মিয়ানমার রাষ্ট্রীয় আয়োজনে গণহত্যা চালাচ্ছে। এটি বন্ধে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায় মিয়ানমারের ওপর চাপ দিচ্ছে, যার মধ্যে মিয়ানমারের বিশেষত দেশটির কার্যকর নেতা স্টেট কাউন্সেলর অং সান সুচির অনেক বন্ধু রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বন্ধুত্ব সত্ত্বেও মানবাধিকার লঙ্ঘন বিশেষত: রোহিঙ্গা সমপ্রদায়কে জাতিগতভাবে নির্মূলে বর্মী বাহিনীর রাষ্ট্রীয় আয়োজনের বিরুদ্ধে আজ বিশ্ব সমপ্রদায় সোচ্চার। বাংলাদেশ চাইছে, জাতিগত নিধন চেষ্টার চাক্ষুস প্রমাণগুলো দিল্লি, মস্কো ও বেইজিংয়ের বিবেচনায় আনতে। বন্ধুত্ব ঠিক রেখে হলেও ওই ৩ ক্যাপিটাল যেন রাখাইনের নিধনযজ্ঞের নিন্দা ও ন্যূনতম প্রতিবাদটুকু করে! সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়াতে তারা তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। চলমান কূটনৈতিক কার্যক্রমের ‘ফল’ পেতেও শুরু করেছে বলে দাবি কারও কারও। যদিও এখনো পর্যন্ত রাশিয়া, চীন বা ভারত কারও তরফেই তাদের অবস্থান পরিবর্তনের কোনো আভাস বা লক্ষণ দৃশ্যমান নয়। অবশ্য রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে চীন গঠনমূলক ভূমিকা রাখবে বলে গত সোমবার ঢাকার এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন রাষ্ট্রদূত মা মিং কিয়াং। তিনি এ-ও বলেছেন, তার সরকার প্রাণে বাঁচতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের জন্য ১৫০ টন ত্রাণসামগ্রী পাঠাবে। সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসা শরণার্থীদের প্রতি চীনের সহানুভূতি রয়েছে জানিয়ে দেশটির ৬৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ঢাকার আয়োজনে রাষ্ট্রদূত চীনের সঙ্গে মিয়ানমারের দীর্ঘদিনের মিত্রতার বিষয়টিও স্পষ্ট করেছেন। বলেন, মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। মিয়ানমার থেকে আসা বিপুল সংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় ও মানবিক সহায়তা দেয়ায় বাংলাদেশ সরকারের প্রশংসা করে রাষ্ট্রদূত মা মিং কিয়াং বলেন, আমরা আশা করি শিগগিরই আন্তর্জাতিকভাবে এ সংকটের সমাধান হবে। আর এক্ষেত্রে গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে আগ্রহ রয়েছে চীনের। এ সময় তিনি জানান, শরণার্থীদের জন্য আগামী দু’দিনের মধ্যে চীন থেকে ১৫০ টন জরুরি ত্রাণসামগ্রী চট্টগ্রামে এসে পৌঁছাবে। উল্লেখ্য, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনীর দমন-পীড়ন নিয়ে শুরু থেকেই বিশ্বব্যাপী সমালোচনার ঝড় বইছে। এর মধ্যেই মিয়ানমারের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছে চীন। গত সপ্তাহে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেঁসের সঙ্গে বৈঠকেও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে মিয়ানমার সরকারকে সমর্থনের কথা জানান চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। ওই বৈঠকে তিনি জানান, রাখাইনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা রক্ষার জন্য মিয়ানমার সরকারের উদ্যোগ সম্পর্কে চীন বুঝতে পারছে। আর এতে তারা সমর্থন করছে। তবে চীন আশা করে, আগুন নিয়ে এ খেলা দ্রুতই শেষ হবে। মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে চীনের সুসম্পর্কের কথা বিবেচনায় রেখে চলমান রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের সহযোগিতা নেয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রেসিডেন্ট তাকেদা আলেমু। এরপর সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনিসহ আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধি দল বেইজিং সফরে যান। ওই প্রতিনিধি দলে থাকা আওয়ামী লীগ নেতা ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া সমপ্রতি গণমাধ্যমকে জানান, তারা চীনের নেতাদের সঙ্গে চলমান সংকটের অবসানের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করছেন। এ বিষয়ে দলটির উপ-দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া বলেন, চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট লি জুন আশ্বস্ত করে বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে বাংলাদেশের উদ্বেগ আমলে নিয়ে সমস্যার সমাধানে মিয়ানমার যাতে উদ্যোগী হয় সেজন্য বেইজিং চেষ্টা চালাবে। এদিকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস প্রায় অভিন্ন তথ্য প্রকাশ করেছে। তাদের রিপোর্টে বলা হয়েছে রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে মিয়ানমারকে প্রভাবিত করার আশ্বাস দিয়েছে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি। চীনের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ভাইস মিনিস্টার লি জুন আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে এ মনোভাব ব্যক্ত করেন। চীন চলতি সপ্তাহে ত্রাণ পাঠানোরও আশ্বাস দিয়েছে। বেইজিংয়ে সোমবার অনুষ্ঠিত বৈঠকে লি জুন বলেন, ‘চীন সরকার মিয়ানমারকে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনায় বসার জন্য উদ্বুদ্ধ করবে। চীন মনে করে, আঞ্চলিক শান্তির স্বার্থেও মিয়ানমার সরকারের রোহিঙ্গা সমস্যায় স্থায়ী সমাধানে পৌঁছানো উচিত।’ বৈঠকে ১৮ সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান। এতে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি চলমান রোহিঙ্গা সংকটের বিস্তারিত তুলে ধরেন এবং রোহিঙ্গাদের ওপর পরিচালিত বর্বরতা ও নিপীড়ন বন্ধে চীন সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন। জবাবে চীনের লি জুন বলেন, তারা রোহিঙ্গা সংকট সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত। বৈঠকে অংশ নেয়া অন্য চীনা নেতারা বলেন, ‘বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের মানবিক আচরণের প্রতি আমাদের সম্মান রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এমন মানবিক উদ্যোগের প্রতি সম্মান জানিয়ে আগামী ২৭শে সেপ্টেম্বর অনুপ্রবেশকারীদের জন্য ত্রাণ পাঠানো হবে। ত্রাণের মধ্যে থাকবে কম্বল এবং তাঁবু। তাদের এমন সহায়তা অব্যাহত থাকবে বলেও জানিয়ে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার সঙ্গে তাদের দেশে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে চীন। এদিকে গত সপ্তাহে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ অধিবেশনের সাইডলাইনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের বৈঠক হয়েছে। সেখানে রোহিঙ্গা ইস্যু ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। দেশীয় কূটনীতিকরা বলছেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে দিল্লির সঙ্গে ঢাকার ঘনিষ্ঠ আলোচনা চলছে। তবে তা মিডিয়ায় প্রকাশ নয়। সেখানে দিল্লির ‘নিরপেক্ষ’ এবং ‘কার্যকর’ অবস্থানই আশা করছে বন্ধু বাংলাদেশ। একইভাবে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গেও বৈঠক হয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলীর। দ্বিপক্ষীয় ওই আলোচনায় রোহিঙ্গা প্রশ্নে মস্কোর অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়েছে। ঢাকা আশা করছে এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা বা বিবৃতি না দিলেও রাশিয়া আগের অবস্থান পরিবর্তন করে সংকট নিরসনে ভূমিকা রাখবে। দিল্লি, মস্কো ও বেইজিং নিয়ে ঢাকার চলমান ব্যস্ততার মধ্যেই টোকিও থেকে ভিন্ন এবং হতাশাজনক এক বার্তা এসেছে। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপের বরাতে জাপান মঙ্গলবার জানিয়েছে তারা তাদের মিত্র বার্মার পাশেই থাকবে। ঢাকার কূটনীতিকরা অবশ্য তাৎক্ষণিক এ নিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাতে রাজি হননি। দায়িত্বশীল এক কূটনীতিক গতকাল বিকালে মানবজমিনকে বলেন, দেশ ধরে প্রতিক্রিয়া দেখানোর কিছু নেই। কূটনীতিতে সবকিছু মিডিয়ার সামনে হয় না। আমরা আমাদের কাজ করে যাচ্ছি। আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে জানিয়ে এক কর্মকর্তা বলেন, এখন রোহিঙ্গা সংকট উত্তরণই বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, ইইউ ওআইসিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকাদি রয়েছে সেপ্টেম্বরের শেষে অক্টেবরের শুরুতে। আগামীকাল নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক এবং ৩রা অক্টোবর ওয়াশিংটনের সঙ্গে নিরাপত্তা সংলাপ হবে জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, সবখানেই রোহিঙ্গা সংকট মুখ্য আলোচ্য।

 

 

 

সূত্র : মানবজমিন অনলাইন পত্রিকা