টানা বৃষ্টি দুর্ভোগে রোহিঙ্গারা

23

মিয়ানমারের সহিংসতা থেকে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা টানা বৃষ্টিতে নাকাল। ওদিকে গত ২৩শে সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও ত্রাণ সহায়তাসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে। এতে শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে। সেনাবাহিনীর তৎপরতায় খুশি স্থানীয় ও আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা। রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ নিয়ে ছুটে আসছে দেশি-বিদেশিরা। মানবিক সহায়তায় এগিয়ে আসছে অসংখ্য দাতা সংস্থা। সড়কে ত্রাণের গাড়িবহর। অনেকে আবার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে আসছে। লাখ লাখ রোহিঙ্গার আশ্রয় ও খাবারের ব্যবস্থা করা গেলেও এখনো পুরোপুরি শৌচাগারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রতি ৮৬০ জনের বিপরীতে একটি স্যানিটারি ল্যাট্রিন বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সরজমিনে দেখা গেছে, গত একমাস ধরে যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগের ফলে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে রোহিঙ্গারা। বিশেষ করে শিশুরা ডায়রিয়া, কলেরাসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে উখিয়ার কয়েকটি গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দারাও। এদিকে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে নিত্যপণ্যের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি, যানবাহনের ভাড়া বৃদ্ধি, স্কুল-কলেজে পড়ালেখায় বিঘ্ন, পরিবেশ বিপর্যয়সহ নানা কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। আবার রোহিঙ্গাদের একটি অংশ নেমেছে ভিক্ষাবৃত্তিতে। ভিক্ষাবৃত্তি করা এসব রোগগ্রস্ত রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে নানা রোগ-জীবাণু ছড়ানোর আশঙ্কা করছে স্থানীয়রা।
কক্সবাজার জেলাপ্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সরকারি হিসাব অনুযায়ী এখন পর্যন্ত মোট চার লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। তবে স্থানীয়দের দাবি মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ৭ লাখের কাছাকাছি। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন বলেন, যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ রোহিঙ্গা ও স্থানীয় বাংলাদেশি উভয়ের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আমরা রোহিঙ্গাদের স্যানিটেশন সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছি। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সরকারি এবং বিভিন্ন এনজিও কর্তৃক ১২শ’ ল্যাট্রিন তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে পাঁচশ’র মতো। আনুপাতিক হারে ৮৬০ জনের জন্য একটি শৌচাগার, যা পর্যাপ্ত নয়। গতকাল সরজমিনে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং ও বালুখালীতে গিয়ে দেখা গেছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাশে ধানখেতসহ আশপাশের খোলা স্থানগুলোতে মলমূত্র ত্যাগ করছে রোহিঙ্গা শিশুরা। বাদ যাচ্ছে না নারী-পুরুষও। অস্থায়ী এসব শৌচাগারের সামনে মেয়েদের লাইন দেখা গেলেও পুরুষদের তেমন লক্ষ্য করা যায়নি। জানতে চাইলে কুতুপালং ক্যাম্পে অবস্থান নেয়া রশিদা বেগম বলেন, টয়লেটে সব সময় ভিড় লেগে থাকে। তাই বাধ্য হয়ে বাচ্চাদের খোলাস্থানে মলমূত্র ত্যাগ করাতে হয়। সমপ্রতি জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে দুইলাখের বেশি শিশু। যা এবার আসা মোট শরণার্থীর ৬০ শতাংশ। এছাড়া বাবা-মা বিচ্ছিন্ন হয়েছেন ১৩০০ শিশু। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিয়োজিত চিকিৎসকরা জানান, শতকরা ৮৫ ভাগ শিশু বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। পানিবাহিত বিভিন্ন রোগ কলেরা, ডায়রিয়া, আমাশয়, সর্দি, নিউমোনিয়াসহ চর্মরোগে আক্রান্তের হার বেশি। পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা না থাকায় তারা আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছে। বেসরকারি সংস্থা ‘অ্যাকশন অ্যাগেইনস্ট হাঙ্গার’ এর হিসাব অনুযায়ী, ৫৫ হাজার শিশু অপুষ্টিতে এবং ছয় হাজার ৭৭৫ শিশু মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে। গর্ভবতী নারীরাও ভুগছেন অপুষ্টিতে। তাদের জন্য পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা জরুরি বলেও জানায় সংস্থাটি। রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী বলেন, লাখ লাখ অতিরিক্ত মানুষ যখন ঢুকে পড়ে তখন সেখানকার স্বাভাবিক অবস্থা ধরে রাখা কঠিন। এসব রোহিঙ্গাদের ত্রাণ ও পুনর্বাসনে সেনাবাহিনী দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে অনেকটা শৃঙ্খলা ফিরে আসছে বলে তিনি জানান। কক্সবাজারের সিভিল সার্জন আবদুস সালাম বলেন, মিয়ানমার থেকে আসা অধিকাংশ শিশু সর্দি, জ্বর, কাশি, নিউমোনিয়া, চর্মসহনানা রোগে আক্রান্ত। তাই জরুরি ভিত্তিতে এসব শিশুদের হাম, পোলিও টিকা দেয়া হয়েছে।