ডিকেন্সের নতুন মিশন

43

১৯৯৮ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত ১৭ বছর ধরে ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলেছেন ফয়সাল হোসেন ডিকেন্স। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বলতে একটি টেস্ট আর ৬ ওয়ানডে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের বছর হিসেবে ২০০৪ তার জীবনে অন্যরকম স্মৃতির। যদিও সেই বছরের পর তার খেলার সুযোগ হয়েছিল ২০১০ এ। তারপর থেকে নিরলসভাবে খেলেছেন জাতীয় ক্রিকেট লীগ (এনসিএল), ঢাকা প্রিমিয়ার ক্রিকেট লীগ, বাংলাদেশ ক্রিকেট লীগে (বিসিএল)। প্রথম শ্রেণির ১১৪ ম্যাচে ১২ সেঞ্চুরি, ৩৮ ফিফটি, ৩৮.২৫ গড়ে ৬৬৫৭ রান। ১০৬ লিস্ট ‘এ’ ম্যাচে কোনো সেঞ্চুরি না থাকলেও ২০ ফিফটিতে ২৯.২৭ গড়ে করেছেন ২৬৬৮ রান। কিন্তু জাতীয় দলে আর ডাক পড়েনি। ৩৭ বছর বয়সে ব্যাট বল ছাড়েন কুমিল্লার এই ক্রিকেটার। তাও কোনো রকম আক্ষেপ না নিয়ে। এখন শুধু লক্ষ্য নতুন ক্রিকেটার তৈরি করা। নিজের মেধার সবটুকু দিয়ে দিতে চান এই প্রজন্মের ক্রিকেটারদের। বিশেষ করে নিজ বিভাগ কুমিল্লার জন্য। কক্সবাজারে মাস্টার্স ক্রিকেট কার্নিভালে খেলতে এসে নিজের নতুন যুদ্ধের কথা তুলে ধরেন দৈনিক মানবজমিনের স্পোর্টস রিপোর্টার ইশতিয়াক পারভেজের সঙ্গে। সেই কথপোকথনের মূল অংশ তুলে ধরা হলো।-
প্রশ্ন: অনেক লম্বা সময় ঘরোয়া ক্রিকেটে খেললেন!
ডিকেন্স: আমার কাছে মনে হয় না খুব লম্বা সময়। ১৯৯৮ এ প্রিমিয়ার লীগ দিয়ে শুরু- ২০১৬তে এসে ছাড়লাম। এর চেয়ে বেশি সময়ও অনেকে খেলে। লক্ষ্য একটাই ছিল দেশ ও নিজের জন্য খেলা।
প্রশ্ন: তবে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার লম্বা হলো না বলে কোনো আক্ষেপ?
ডিকেন্স: একেবারে সত্যি করে বলছি কোনো ধরনের আক্ষেপ নেই। জাতীয় দল নিয়ে খুব একটা ভাবিও নাই। যতটা সুযোগ পেয়েছি তাতেই অনেক খুশি। ২০০৪ সালের অভিষেকের পর আর দলে ডাক পাচ্ছিলাম না। এরপর হঠাৎই আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে ডাক পেয়ে খুব অবাক হয়েছিলাম। সে বছর দুটি ম্যাচ খেলে বাদ পড়লাম। আর ডাক পাইনি।
প্রশ্ন: আর ডাক না পাওয়ার কারণ কী বলে মনে করেন?
ডিকেন্স: আমি মনে করি পারফরম্যান্সের জন্যই। কারণ তারা যে আশা নিয়ে আমাকে সুযোগ দিয়েছিল আমি তা পূরণ করতে পারিনি। আমার হয়তো যোগ্যতা ছিল না জাতীয় দলে খেলার। আমি বলবো আমার নিজের ব্যর্থতা। এমন অনেকেই আছে আমার মতো।
প্রশ্ন: ঘরোয়া ক্রিকেটের মান নিয়ে এখনো প্রশ্ন কেন?
ডিকেন্স: মান নিয়ে প্রশ্ন করার এখন সুযোগ নেই। কিন্তু এখানে ক্রিকেটাররা খেলে সুযোগ পাচ্ছে না বলে হতাশ হচ্ছে। বিশেষ করে লংগার ভার্সন ক্রিকেটের দিকে তাকান। বিসিএল ও এনসিএল এখানে এখন অনেক রান হচ্ছে। উইকেটও নিচ্ছে অনেক বোলাররা। কিন্তু দেখেন যারা বেশি রান করছে তারা কিন্তু জায়গা পাচ্ছে না। তুষার, শাহরিয়ার, রাজিন, এনামুল জুনিয়র, আবদুর রাজ্জাক তারা কি ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলে দলে জায়গা পাচ্ছে? পাচ্ছে না। আমার ২০০৪ এর ৬ বছর পর দলে ডাক পাওয়াটা তো মিরাকলই বলবো। এখানে কী হচ্ছে- এখানে নতুন যারা খেলছে, যারা তরুণ তারা যদি সেঞ্চুরি করছে তবে জাতীয় দলে ডাক পাচ্ছে। তাহলে বলেন, এখানে শ্রম দেয়ার পর যদি মূল্যায়ন না হয় তাহলে তারা ভালো করার স্পৃহা হারিয়ে ফেলবে। এতে মানতো ধীরে ধীরে নষ্ট হবেই।
প্রশ্ন: তুষার, শাহরিয়ারদের জাতীয় দল থেকে হারিয়ে যাওয়ার কারণ কী মনে করেন?
ডিকেন্স: কে কী মনে করবে আমি জানি না, কিন্তু আমাদের দেশে এটি একটি ধারাতে রূপ নিয়েছে। একটি অলিখিত নিয়ম হয়ে গেছে যে বয়স ৩০ হলে জাতীয় দলে খেলার অযোগ্য মনে করা হয়। যে কারণে অনেক ক্রিকেটারই দেখেন হারিয়ে যাচ্ছে। সবাই তো ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো খেলার চেষ্টা করে জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন নিয়ে। প্রিমিয়ার লীগে একটা সময় সবাই পারফরম করার জন্য মুখিয়ে থাকতো। আমাদের সময় সবার মধ্যে একটা প্রতিযোগিতা ছিল কে কার চেয়ে ভালো করতে পারে। এখন মাঠ হয়েছে, উইকেট ভালো তার পরও দেখেন সেই প্রতিযোগিতা কিন্তু মাঠে চোখে পড়ে না। এটার কারণ হলো মূল্যায়নটা এখন অনেক কম। কত ক্রিকেটার আছে বছরের পর বছর খেলে যাচ্ছে তাদেরকে ‘এ’ দলে সুযোগ দিয়েও দেখা হয় না।
প্রশ্ন: ক্লাব ক্রিকেটের বড় পরিবর্তন কোনটি?
ডিকেন্স: বড় পরিবর্তন হলো এখন আবাহনী আর মোহামেডানই শক্তিশালী দল নয়। এখন অনেক শক্তিশালী দল আছে বেশ কয়েকটি ক্লাব চ্যাম্পিয়ন ফাইট দেয়ার জন্য খেলে। এবার গাজী গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন। আর একটা বিষয় হলো অনেক ক্রিকেটার তৈরি হয়েছে, যা আগে ছিল না। ক্লাব ক্রিকেটে এখন অনেক ভালো ভালো ক্রিকেটার আছে।
প্রশ্ন: এখনো ভালো ব্যাটসম্যানের অভাব কেন?
ডিকেন্স: আমরা অনেক আবেগপ্রবণ জাতি। দেখেন সাঙ্গাকারা বলেন, সবারই খারাপ সময় গেছে- তাই বলে তারা খেলা ছেড়ে দিয়েছে তা নয়। আমাদের সমস্যা হলো ঘরোয়া ক্রিকেট হোক আর আন্তর্জাতিক, একটু খারাপ করলেই আমরা ভেঙে পড়ি, আশা ছেড়ে দেই। এই কারণে ভালো ব্যাটসম্যান হওয়া আমাদের জন্য একটু কঠিন। ভালো ব্যাটসম্যান হতে হলে লড়াই করতে হবে। প্রতিনিয়ত নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। তাহলেই আপনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন।
প্রশ্ন: দেশের ক্রিকেটের দুর্বল দিক কোনটি?
ডিকেন্স: আমাদের সবচয়ে বড় দুর্বল দিক হলো ক্রিকেট মেধার। মাঠে শুধু ব্যাট-বল নিয়ে খেললেই বড় ক্রিকেটার হওয়া যায় না। দেশের কোথাও কি ক্রিকেটারদের জ্ঞান বাড়ানোর কাজ হয়? ক্রিকেটে কেন আসবে খেলতে! টাকার জন্য? নাকি এর প্রতি ভালোবাসা থেকে? ক্রিকেটের প্রতি টান ও ভালোবাসা তৈরি করতে হলে রুট লেভেলে উৎসাহিত করার মতো কার্যক্রমগুলো হাতে নিতে হবে। ক্রিকেটারকে মানসিকভাবে আগে প্রস্তুত করতে হবে।
প্রশ্ন: এখন কী করছেন?
ডিকেন্স: আপাতত আমি কুমিল্লার ক্রিকেটের ডেভেলপমেন্ট নিয়ে কাজ করছি। এছাড়াও কুমিল্লা জেলা ক্রীড়া সংস্থা, লালমাটিয়া ক্রিকেট একাডেমি যার পৃষ্ঠপোষকতা করছে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স এসব নিয়ে কাজ করছি। আসলে কোচিংটাকে আমি পেশা হিসেবেই নিয়েছি। আমার যে অর্জন সেটুকু আমি নতুন প্রজন্মের ক্রিকেটারদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চাই।
প্রশ্ন: কুমিল্লা থেকে ভালো ক্রিকেটার উঠে আসছে না কেন?
ডিকেন্স: আগে কুমিল্লার বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার ছিল। এখন রাসেল আল মামুন ছাড়া কেউ নেই। কুমিল্লা থেকে ক্রিকেটার তৈরি হচ্ছে না বেশ কয়েকটি কারণে। এরমধ্যে যেমন অবকাঠামো আছে তেমনি কুমিল্লার শিশু-কিশোরদের মধ্যে ক্রিকেট ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা নেই। তাই আমি একটি ক্রিকেট স্কুল চালু করছি। কিছুদিনের মধ্যে স্কুলের কাজ শুরু হবে। সেখানে আমি শুধু শিশুদের ব্যাট-বলেই নয়, তাদের জন্য থিউরিটিক্যাল ক্লাসগুলোও নিতে শুরু করবো। যেন তারা ক্রিকেট সম্পর্কে আগে জানে ও উৎসাহিত হয়।