ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জীবনের অন্য লড়াই

48

রাত সাড়ে ১২টা। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে যান সার্জেন্ট জহরুল হক হলের মূল বিল্ডিং-এ গণরুমের শিক্ষার্থী নুরুন নবী। ঠিক ৫-৭ মিনিট পর এসে দেখেন তার বিছানা দখল। তাকে উঠানো তো দূরের কথা জিজ্ঞেস করার সাহস পর্যন্ত তার হয়নি। ততক্ষণে রুমের প্রতিটি ইঞ্চি পরিপূর্ণ। ১০ জনের গণরুমে ২৯ জন। বসার জায়গা পর্যন্ত নেই। বাধ্য হয়ে সারা রাত মসজিদে থাকতে হয় তাকে। শুধু নুরুন নবী নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের অর্ধেকের বেশি আবাসন সংকটে ভুগেন। যা আছে তাতেও নিয়ন্ত্রণ থাকে না বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। রয়েছে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের প্রভাব।
নতুন শিক্ষার্থীরা ঢাকার নতুন পরিবেশে এসে সংগ্রাম শুরু করেন ভর্তি পরীক্ষার বৈতরণী পার হওয়ার পর থেকেই। ছাত্র নেতার হাত ধরে হলে মাথা গোঁজার ঠাঁই মিললেও গন্তব্য হয় গণরুম বা বারান্দা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ছাত্র সংগঠনের মিছিলে বা কর্মসূচিতে যোগ দেয়ার বাধ্যবাধকতা। তার সঙ্গে জীবনসংগ্রামের আরেক সংগ্রাম টিউশনি বা পার্ট টাইম জব। আছে নিম্ন মানের খাবার, নোংরা টয়লেট, রাত নামতেই পলিটিক্যাল প্রোগ্রাম, দিনে ক্লাস বাদ দিয়ে মিছিল মিটিং-এর মতো ঝক্কি-ঝামেলা। এসব কাঁধে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয় একজন নবীন শিক্ষার্থীর।
নুরুন নবী জানান, স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়ে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই হওয়ার থেকেই আমাকে এক রকম লড়াইয়ে নামতে হয়েছে। হলে সিট পাওয়া থেকে শুরু করে শিক্ষাজীবনের প্রতিটি স্তরে এ লড়াই চলছে। প্রথম বর্ষ প্রায় শেষ, অথচ গণরুমেই আছি। রুমে পড়া যায় না। রিডিং রুমে জায়গা পেতে সিরিয়াল দিতে হয়। একই অবস্থা টয়লেট, খাবার, কিংবা ঘুমের জায়গাও। দিনের দুটি টিউশনি। দিনে ঘুমানোর সময় হয় না। রাতে হলে পলিটিক্যাল হাজিরা। এরপর খাবার ও রুমে ঘুমানোর জায়গা দখলের প্রতিযোগিতা। এসব কারণে পড়াশুনার চরম ব্যাঘাত ঘটছে। ক্লাসের ফাঁকে যতটুকু সময় পায় সেই সময়টুকুতে পড়াশুনা করতে হয়। তিনি বলেন, হলের বড় ভাইরা বলেছেন এই জীবনের যারা উত্তীর্ণ হয়, তারা নাকি পরবর্তীতে জীবনে সফল হয়। তাই ধৈর্য ধরে এই লড়াই করে যাচ্ছি।
গণরুম: নিজের গ্রুপ ভারী করতে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের টার্গেট করেন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নেতারা। হলে শিক্ষকদের নিষ্ক্রিয়তা ও সিট রাজনীতির কারণে ছাত্ররাও নেতাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে। হলের রাজনীতির মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে নতুন শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করা হয়। গণরুমের মানবেতর জীবনযাপন করতে হয় নতুন ছাত্রদের। গণরুমের জন্যে আলাদা কোনো জায়গা না থাকার কারণে ছেলেদের হলগুলোতে ডাইনিং, ক্যান্টিন কিংবা টিভিরুমের পাশে হার্ডবোর্ড কিংবা কোনোরকম দেয়াল দিয়ে চালিয়ে নেয়া হয় গণরুমের কাজ। অল্প জায়গাতেই গাদাগাদি করে থাকতে হয়। ঢাবিতে র‌্যাগিং না থাকলেও বর্তমানে তা প্রকট আকার ধারণ করেছে। ছেলেদের হলের সঙ্গে সঙ্গে তা ছড়িয়ে পড়েছে মেয়েদের হলগুলোতেও। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের হিসাবে আবাসনের সংখ্যা অর্ধেকের কম। ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের প্রভাবে যা আছে তাতেও নিয়ন্ত্রণ থাকে না বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। এসব কারণে শিক্ষার্থীদের গণরুম কিংবা বারান্দায় থাকতে হয়। এর সঙ্গে আছে খোলা বারান্দা। এসএম হলের এই খোলা বারান্দা সবচেয়ে বেশি।
নিম্ন মানের খাবার ব্যবস্থা: বৃহস্পতিবার দুপুর ১টায় এসএম হলের ক্যান্টিনে গিয়ে দেখা যায় নিম্ন মানের খাবারের। এক পিস রুই মাসের সঙ্গে একটা পটোল বা আলু। মসলার গন্ধও নেই। ডাল পানির চেয়ে পাতলা। রেশনের মোটা চালের ভাত। ভাজি যা দেয় তা খাবার অনুপযোগী। এ অবস্থায় বাধ্য হয়ে অনেকেই হলের গড়ে উঠা মেসের মেম্বার হয়। সেখানে অতিরিক্ত টাকা গুনতে হয়। সবাইকে আবার মেম্বার করা হয় না। মেস মেম্বারের জন্য হল নেতাদের অনুমতি নিতে হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হলের ডাইনিং ক্যান্টিনগুলোতে নেতাদের ফাও কখনও টাকা কম দিয়ে খাবার দিতে হয়। এজন্য হলগুলোর খাবারের মান বাড়াতে হিমশিম খেতে হয় ক্যান্টিন ডাইনিং তথা হল প্রশাসনের। ফাও খাবার না দেয়ার প্রায়ই ক্যান্টিন ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। আর এসব ঘটনা ছাত্র নেতারা করলেও সাধারণ ছাত্রদের ওপর চাপিয়ে দেয় তারা।
সম্প্রতি ঢাবির বিভিন্ন হলের ক্যান্টিন ও মেসের খাবার নিয়ে এ গবেষণা করেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী। গবেষণায় দেখা গেছে, ক্লাস-পরীক্ষা প্রস্তুতি ও অন্যান্য কাজের জন্য শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রম করতে হয়। তার বয়স ও পরিশ্রম অনুপাতে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী প্রতি দিনের খাবারে গড়ে ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার কিলোক্যালরি থাকা উচিত। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের ক্যান্টিন ও মেসে খাবার গ্রহণ করা শিক্ষার্থীরা পাচ্ছেন সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪৪৯ কিলোক্যালরি। সে হিসাবে প্রয়োজনের অর্ধেক ক্যালরিও পান না দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে অধ্যয়নরত এসব শিক্ষার্থী।
অন্য এক লড়াই: মফস্বলের একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির হওয়ার পর নিজেই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে যুদ্ধ করতে হয় নিজের সঙ্গে। এ যুদ্ধের আরেক নাম টিউশনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে নিজের খরচ জোগানোর অন্যতম মাধ্যম পেতে ধরতে হয় বড় ভাইদের। ধরণা দিতে হয় স্যারদের কাছেও। স্যার বা বড় ভাইদের মারফতে দু’একটা টিউশনি জোটলেও মাইনে নিয়ে সন্তুষ্টের জায়গায় পৌঁছাতে আরেক লড়াই। আর হঠাৎ করে কোনো শিক্ষার্থীর টিউশনি পেয়ে যাওয়া অনেকটাই কাকতালীয়। কখনও আবার তা হারাতেও হয়। এই টিউশনি রক্ষা করতে গিয়ে কখনও পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হয়ে যায়। তারপরও মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীর চাকরি এই টিউশনি রক্ষা করতে হয়। না হয়, পড়াশুনা হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে।
ঢাবির কবি জসীমউদদীন হলে ৪১০ নম্বর রুমে থাকেন ইসলাম বিভাগের ছাত্র ফখরুল ইসলাম। তিনি জানান, দুইটি মিডিয়া ধরে একটি টিউশনি জোগাড় করলেও তা শেষ পর্যন্ত রক্ষা করতে পারেননি। ছাত্রের বাবা বলেন আমি তো একজন সিনিয়র শিক্ষক চাচ্ছিলাম। তুমি পড়াও ভালো কিন্তু আমার সিনিয়র শিক্ষক লাগবে। একথা বলে দুই মাস পর আমাকে না করে দিয়েছেন। এখন পর্যন্ত টিউশনি পাইনি। আমার পরিবার আমাকে প্রতি মাসে ৬-৮ হাজার টাকা দেয়ার মতো সামর্থ্য নেই। আমার মামা সৌদি আরব থাকেন। ওনি মাঝে মধ্যে কিছু টাকা পাঠান। এটা দিয়ে চলছি। কিন্তু মামার টাকায় কতদিন। একই অবস্থা জহুরুল হক হলের ৩৭০নং রুমের মাহমুদুল হকের। একজনের মাধ্যমে পুরান ঢাকায় একটি টিউশনি করেন। দুইজন ছাত্র পড়ায় অথচ আমাকে দেয় মাত্র ২৫০০ টাকা। আরেকটি টিউশনি করতে বলছে কিন্তু আমি করতে পারবো না। এতে আমার পড়াশুনার চরম ব্যাঘাত ঘটবে। ফখরুল বা মাহমুদুল নয়, ঢাবিতে পড়াশুনা করে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর টিউশনি করাতে গিয়ে এ ধরনের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। তবে ভালো লাইন পেয়ে গেল এক টিউশনিতে হাজার দশেক টাকা মিলে যায়।
আলী আনোয়ার অর্থনীতি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। তাদের চার ভাই-বোনের মধ্যে আনোয়ার সবার বড়। পরিবারের বড় ছেলে হওয়ায় একটু হিসেব করেই চলতে হয় তাঁর। তাই বাবার কাঁধে সমপূর্ণ ভার না দিয়ে কিছু টাকার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে বসুন্ধরা এলাকায় গিয়ে টিউশনি করাতে হয়। এ কারণে প্রতিরাতেই হলে ফিরতে দেরি হয়ে যায়। হলে এসে নিজের জায়গাটুকু হয় না। শুধু আনোয়ার নন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এরকম হাজার হাজার আনোয়ার দীর্ঘকাল ধরে এ লড়াই করে যাচ্ছে। আর বিশ্ববিদ্যালয় নিজ গর্ভে আগলে রেখেছে তাদের।
সার্বিক বিষয়ে ঢাবির ভিসি আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, হলে নানা সংকট আছে এর সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নতুন নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এরপর আবাসন সংকট থেকেই যাচ্ছে। এজন্য যাদের মাস্টার্স শেষ হয়েছে তাদের রুম ছাড়তে সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন হলের কয়েকটি কক্ষ সিলগালা করা হয়েছে। ক্যান্টিনের মান আগের চেয়ে ভালো হয়েছে এটা স্বীকার করতে হবে। তবে কিছু সমস্যা আছে সেটা ঠিক হয়ে যাবে। তবে শিক্ষার্থীদের সার্বিক অবস্থা যদি হলের প্রাধ্যক্ষরা খোঁজ খবর নেন, তাহলে এই সমস্যা অনেকাংশে কমে যায় বলে মনে করেন ভিসি।

Advertisement
Print Friendly, PDF & Email
sadi