‘তখন যদি আরেকটু জোরে দৌড়াতাম’

24

টাইগারদের ক্রিকেটে হার না মানা এক যোদ্ধার নাম মাশরাফি বিন মুর্তজা। টেস্ট, ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে পেসারদের মধ্যে শীর্ষ উইকেট শিকারি। বারবার ইনজুরি তাকে মাঠ থেকে ছিটকে না ফেললে হয়তো দেশের পেসারদের তাকে স্পর্শ করাই কঠিন হয়ে যেত। ২০০১ সালে টেস্ট অভিষেকের পর ২০০৯ পর্যন্ত মাত্র ৩৬ টেস্ট খেলতে পেরেছেন। তিনিই দেশের এক মাত্র পেসার যে কিনা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুটি সিরিজ খেলেছেন। ২০০৩ সালে ডারউইনে বল হাতে প্রথম ইনিংসেই নিয়েছিলেন ৩ উইকেট। ঠিক ৩ বছর পর দেশের মাটিতে অজিদের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে ২ উইকেট তুলে নেন। পরের ইনিংসেও নিয়েছিলেন একটি উইকেট। ২০০৬ এ ফতুল্লাতে সেই ম্যাচ জিততে জিততে হেরে যায় দল। দলের সবারই আফসোস- ইস! মাশরাফি যদি পন্টিংয়ের ক্যাচটা ধরতে পারতেন! সেই ক্যাচ ছাড়ার কষ্ট এখনো মাশরাফিকে তাড়া করে বেড়ায়। তারও একই কথা- উহ! সেদিন যদি ক্যাচটা ধরতে পারতাম! ১১ বছর পর ফের অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশে টেস্ট খেলতে আসছে। ওয়ানডে দলের এ অধিনায়ক অবশ্য এখন আর টেস্টে খেলেন না। তাই অজিদের বিপক্ষে সতীর্থদের দারুণ লড়াই দেখার অপেক্ষায়। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট খেলার স্মৃতি ও আসন্ন সিরিজে দলের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন মানবজমিনের স্পোর্টস রিপোর্টার ইশতিয়াক পারভেজের সঙ্গে। সেই কথোপকথনের মূল অংশ তুলে ধরা হলো-
প্রশ্ন: অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট খেলা আপনার জন্য কতটা চ্যালেঞ্জ ছিল?
মাশরাফি: বিশ্বের সেরা দল ছিল সেটি। আমি বলতো পারবো সেটি ছিল অস্ট্রেলিয়ার সর্বকালের সেরা টেস্ট দল। যে কারণে আমাদের চ্যালেঞ্জ ও অনুভূতি ছিল দারুণ। ওদের বিপক্ষে শাহরিয়ার নাফীসের সেঞ্চুরি শুধু অসাধারণই ছিল না, দলের জন্য বেশ কার্যকর ছিল। সেই ম্যাচটি যদি আমরা জিততে পারতাম তাহলে নতুন একটি ইতিহাস হতো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারিনি। তবে বলবো আমার ক্রিকেট ক্যারিয়ারের সেরা একটি টেস্ট ম্যাচ ছিল।
প্রশ্ন: বাংলাদেশ দল তখনো টেস্টে অনভিজ্ঞ। এমন একটি দলের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ানদের মাঠে ও বাইরে আচরণ কেমন ছিল?
মাশরাফি: ওরা দারুণ প্রফেশনাল ক্রিকেটার। মাঠে ওরা শেষ বল পর্যন্ত লড়াই করার মানসিকতায় থাকে। তবে মাঠের বাইরে ওরা অন্য রকম। আমরা যেভাবে শুরু করেছিলাম তাতে ওদের আমাদের নিয়ে একটু আলাদা ভাবে চিন্তা করতে হয়েছে। তাই মাঠ ও মাঠের বাইরে কিছুটা তো সমীহ হলেও পেয়েছি।
প্রশ্ন: বল হাতে ম্যাথু হেইডেনকে আউট করে দলকে দারুণ শুরু করেছিলেন। তখন অস্ট্রেলিয়া কতটা ভড়কে গিয়েছিল?
মাশরাফি: ওদের মাঠে দেখে বোঝা বেশ কঠিন যে ওরা কী ভাবছে বা কতটা ভড়কে গেছে। তবে ওদের মধ্যে কিছুটা হলেও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল। তবে হ্যাঁ যখন সমানে সমানে লড়াই হচ্ছিল তখনতো কিছুটা ভয়ে ছিলই। আমাদের সঙ্গে টেস্ট হারাটা ওদের জন্য তখন কোনো ভাবেই সম্মানজন ছিল না, আবার দুঃখজনকও হতো।
প্রশ্ন: মাঠের কোনো ঘটনা এখনো আপনাকে সেই টেস্টের স্মৃতিতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়?
মাশরাফি: একটা ক্যাচ উঠেছিল রিকি পন্টিংয়ের। ওদের তখন ৭ উইকেট পড়ে গিয়েছিল। জিততে দরকার ছিল ৩০ রান। সেই সময় ফাইন লেগ ও স্কয়ার লেগের ঠিক মাঝখানে একটি ক্যাচ আসে। রফিক ভাই ছিল স্কয়ার লেগে আর আমি ফাইন লেগে। আমি দৌড়ে এসে ক্যাচটি ধরার চেষ্টা করি। কিন্তু বলটি আমার হাত পর্যন্ত পৌঁছায়নি। আঙুলের আগায় লেগে পড়ে যায়। সেই ক্যাচটি ধরতে পারলে ম্যাচটি জেতার সুযোগ ছিল। এখন মনে পড়ে তখন যদি আরো একটু জোরে দৌড়াতাম, বলটার আরো একটু কাছাকাছি পৌঁছাতে পারতাম তাহলে হয়তো ফলাফল অমন হতো না। সেটাই এখনো বেশ মনে পড়ে।
প্রশ্ন: ফতুল্লাতে এত দারুণ খেলার পর চট্টগ্রামে বাজে খেলার কারণ কি ছিল?
মাশরাফি: না, না উইকেট কোনো সমস্যা ছিল না। ওরা আসলে উইকেটই নয়, ক্রিকেটারদের শক্তি ও দুর্বলতা বেশ ভালভাবে বুঝতে পারে। ওরা আমাদের খুব দ্রুতই রিড করেছিল। আর একটা বিষয় হলো ফতুল্লাতে আমরা যতটা ভালো খেলেছিলাম চট্টগ্রামে তার চেয়ে বেশি বাজে খেলেছি।
প্রশ্ন: ১১ বছর পর টেস্ট খেলতে আসছে অস্ট্রেলিয়া। এখন দুই দলের শক্তি-সামর্থ্য সমান বলে কি মনে হয়?
মাশরাফি: বিষয়টা এত সহজ না। অস্ট্রেলিয়া চিরকালই প্রফেশনাল দল। ওরা শেষ বলটি পর্যন্ত ফাইট করে। যদি ওরা এখানে ওদের ‘বি’ দলও নিয়ে আসতো তাতেও ওদের সঙ্গে যেতা কঠিন। দেখেন ওরা কিছু দিন আগেও ভারতে গিয়ে ওদের হারিয়ে দিয়ে এসেছে। সেই সিরিজে ভারতের মতো দলের নিজেদের মাঠে কী বাজে অবস্থা করে ছেড়েছে। ওরা আমাদের জন্য সহজ হবে যারা বলছে তারা আসলে আমাদের ছেলেদের উপর অতিরিক্ত একটা চাপ ফেলছে। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে তখনো খেলা সহজ ছিল না, এখনো নয়।
প্রশ্ন: তাহলে আমাদের প্রস্তুতি কেমন মনে করেন?
মাশরাফি: আমাদের প্রস্ততি অনেক ভালো। এখন শুধু যেটা করতে হবে আমাদের সেরাটা খেলতে হবে। বোলারদের এমন স্পেল থাকতে হবে যেখানে বড় ধরনের ধস নামে ওদের। আবার ব্যাটসম্যান যারা আছেন তামিম, সাকিব, মুশফিক তাদের অসাধারণ কোনো ইনিংস খেলতে হবে। মূল কথা হলো ওদের হালকা ভাবে না নিয়ে আমাদের যেটা সেরা সেটাই খেলতে হবে। নয়তো জয় এত সহজ নয়। আর এখন বাংলাদেশ দল যেমন তাতে আমি দারুণ জমজমাট লড়াই হবে বলেই বিশ্বাস করি। জিতবোই, এই করবো সেই করবো বলে চাপ নেয়ার কোনো দরকার আমি দেখছি না।
প্রশ্ন: অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পেস আক্রমণে কাদের দেখতে চান?
মাশরাফি: সবকিছু উইকেট, প্রতিপক্ষের শক্তি ও টিম ম্যানেজমেন্টের কৌশলের উপর নির্ভর করছে। যদি ইংল্যান্ডের মতো উইকেট হয় তাহলে এক রকম। আমি বলবো দলে এখন যে পেসাররা আছে সবাই প্রস্তুত। আলাদা করে কারো কথা বলতে চাই না।
প্রশ্ন: এখনো টেস্টে ফেরার স্বপ্ন কতটা?
মাশরাফি: আছে, তবে এখনই টেস্টে ফেরা নিয়ে কিছু বলতে চাই না।