তাহলে হাইকোর্ট কেন রাখবেন

30

অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা ও আচরণবিধি সংক্রান্ত খসড়া গেজেট গ্রহণ করেনি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। গতকাল এ সংক্রান্ত বিধিমালার গেজেট প্রকাশের ধার্য দিনে গেজেটের কয়েকটি শব্দ ও বিধি নিয়ে অসন্তোষ ও উষ্মা প্রকাশ করেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। একই সঙ্গে বিষয়টির সুরাহার জন্য আপিল বিভাগের বিচারকগণ, আইনমন্ত্রী, অ্যাটর্নি জেনারেল ও আইন মন্ত্রণালয়ের দক্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠকের কথা বলেন প্রধান বিচারপতি। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের উদ্দেশ্যে প্রধান বিচারপতি বলেন, আমরা যেটা পাঠিয়েছি তার উল্টোটা পাঠিয়েছেন। রায়ের ষোলো বছরে হয়নি। আর এভাবে হলে ষোলো শ বছরেও গেজেট হবে না। সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে অ্যাটর্নি জেনারেলের উদ্দেশ্যে প্রধান বিচারপতি বলেন, অধস্তন সকল আদালত ও ট্রাইব্যুনালের ওপর হাইকোর্ট বিভাগের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা থাকবে। কিন্তু খসড়া বিধিমালায় এটা বাদ দেয়া হয়েছে। তাহলে কেন হাইকোর্ট রেখেছেন? হাইকোর্ট উঠিয়ে দিন।
অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা ও আচরণবিধির গেজেট প্রকাশ নিয়ে গত কয়েক মাস ধরেই নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে টানাপড়েন চলছে। দফায় দফায় সময় নেয়ার মধ্যেই কয়েকদিন আগে আইনমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, এ সংক্রান্ত গেজেট খুব দ্রুতই প্রকাশ করা হবে। এরই ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতির কাছে চূড়ান্ত খসড়াটি হস্তান্তর করেন। গতকাল প্রধান বিচারপতি বলেন, খসড়া বিধিমালার বিভিন্ন অসঙ্গতি নিয়ে আমার সঙ্গে আইনমন্ত্রী কয়েক দফা বৈঠক করলেন। আলোচনা করে বললেন তিনি পুরোপুরি সন্তুষ্ট। এরপর ‘ইউ টার্ন’ করে পুরো বিধিমালার একটা উল্টো খসড়া দাখিল করলেন। এমন হলে আমার সহকর্মী বিচারপতিগণ আমাকে ভুল বুঝতে পারেন। তারা যাতে আমাকে ভুল বুঝতে না পারেন, যাতে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় সেজন্য আপিল বিভাগের সকল বিচারপতি, আইনমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেলের উপস্থিতিতে বৈঠক হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, আমরা একটি ‘শান্তিপূর্ণ পরিবেশ’ বজায় রাখতে চাচ্ছি। রশি টানাটানির মধ্যে যেতে চাই না।
গতকাল শুনানির শুরুতে আইনমন্ত্রীর দেওয়া খসড়ায় ‘উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ’ শব্দ নিয়ে আপত্তি তোলেন প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেন, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ বলতে কি বোঝায় সেটি সেনা, নৌসহ প্রত্যেক আইনে সংজ্ঞায়িত করা আছে। এটি নিয়ে আইনমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হলো। বিচার বিভাগের জন্য উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ বলতে রাষ্ট্রপতিকে রাখলেন। কিন্তু খসড়া বিধিমালায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বলতে আইন মন্ত্রণালয়কেই রাখা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সংজ্ঞায় ‘সুপ্রিম কোর্ট’ কে অন্তর্ভুক্ত করতে বলেছিলাম। আইনমন্ত্রী রাজিও হয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে ভিন্ন চিত্র দেখা গেলো। এ নিয়ে যদি বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখা হয় তাহলে তো এটি ‘ডিপ ফ্রিজে’ পড়ে থাকল। সমাধানে তো যেতে হবে।
খসড়া বিধিমালার বিধি-১ এর উপবিধি (২) তুলে ধরে প্রধান বিচারপতি বলেন, মন্ত্রণালয়ের বিধিমালায় বলা হয়েছে, সরকার কর্তৃক সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপন দ্বারা নির্ধারিত তারিখ হতে এই বিধিমালা কার্যকর হবে। কিন্তু আমরা বলে দিয়েছিলাম সুপ্রিম কোর্ট যে তারিখে কার্যকর করার পরামর্শ দেবেন তদানুসারে সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন জারি করবেন এবং সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শে উল্লিখিত তারিখে বিধিমালা কার্যকর হবে। অর্থাৎ এদিয়ে মন্ত্রণালয় বোঝাতে চাচ্ছে, তারা কোনো দিনই গেজেট কার্যকর করবে না। অ্যাটর্নি জেনারেলের উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি বলেন, আমি যেটি বলে দিয়েছি তার উল্টোটা করেছে। যদি এভাবে চলে তাহলে ১৬ বছর আগের রায় ১৬ শত বছরেও কার্যকর হবে না। খসড়া বিধির ৩ এর উপবিধি (৪) এর শতাংশ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই বিধিতে যেভাবে বলা হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে আইন মন্ত্রণালয়ে প্রেষণে থাকা কর্মকর্তারা নিরাপদ। সারা দেশের বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হলে তারা মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত হয়ে যাবে। এটি মারাত্মক বিধান। সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে প্রধান বিচারপতি বলেন, অধস্তন সকল আদালত ও ট্রাইব্যুনালের ওপর হাইকোর্ট বিভাগের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা থাকবে। কিন্তু খসড়া বিধিমালায় এটা বাদ দেয়া হয়েছে। এত দিন যে নিয়ম চলে আসছে সেটির ব্যত্যয় ঘটাচ্ছেন। অ্যাটর্নি জেনারেলের উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি বলেন, তাহলে কেন হাইকোর্ট রেখেছেন? হাইকোর্ট উঠিয়ে দিন। তিনি আরো বলেন, এখন বিধিমালা পড়ে মনে হচ্ছে নিম্ন আদালতের কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে প্রধান বিচারপতির কিছুই করার নেই। প্রধান বিচারপতি বলেন, প্রথমে বিষয়টি আইন মন্ত্রণালয়কে বলতে হবে। আইন মন্ত্রণালয় বললে তারপর ব্যবস্থা নিতে হবে। এটি কোন আইন হলো? এ পর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এটার সঙ্গে আমাকে যুক্ত করা ঠিক নয়। প্রধান বিচারপতি বলেন, আপনাকে বিষয়টি জানতে হবে। এড়িয়ে গেলে চলবে না। আমরা আপনাকেই পাই, এজন্য বলছি। কারণ সুপ্রিম কোর্ট ও সরকারের মধ্যে আপনি হলেন সংযোগকারী (ব্রিজ)। এই বিষয়গুলো সরকারের সঙ্গে কনভয় করবেন। কিন্তু এখন কেন আপনারা ‘ইউ টার্ন’ করছেন।
প্রধান বিচারপতি বলেন, শনিবার এক অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তিনি বললেন মঙ্গলবার আসবেন। তাহলে এদিন বসব, আপনিও (অ্যাটর্নি জেনারেল) থাকবেন। মন্ত্রণালয়ের ড্রাফটিং উইংয়ের বিশেষজ্ঞ থাকলে তাদেরকেও আনতে পারেন। আর আমার সহকর্মী বিচারপতিগণও থাকবেন। তাহলে আলোচনার মধ্যদিয়ে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছা যাবে। আমি আর একা দায়িত্ব নেব না। এ পর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বুধ কিংবা বৃহস্পতিবার বৈঠকের দিন ধার্যের আহ্বান জানালে প্রধান বিচারপতি বলেন, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আদালতের কার্যসূচির পর যেকোনো সময় আসতে পারেন। এরপর আদালত এ বিষয়ে পরবর্তী আদেশের জন্য রোববার দিন ধার্য করেন।
মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে ২০০৭ সালের ১লা নভেম্বর সরকারের নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ আলাদা হয়। ওই রায়ে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করার জন্য সরকারকে ১২ দফা নির্দেশনা দেয় সর্বোচ্চ আদালত। এ ছাড়া নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিধিমালার একটি খসড়া মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আদালতে দাখিল করা হয়। সরকারের খসড়াটি ১৯৮৫ সালের সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালার অনুরূপ হওয়ায় তা মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পরিপন্থী বলে গত বছরের ২৮শে আগস্ট শুনানিতে উল্লেখ করেন আপিল বিভাগ। পরে ওই খসড়া সংশোধন করে সুপ্রিমকোর্ট তা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। একই সঙ্গে ৬ই নভেম্বরের মধ্যে তা চূড়ান্ত করে প্রতিবেদন আকারে আদালতে উপস্থাপন করতে আইন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই সময়ে প্রতিবেদন দাখিল না করায় ৭ই ডিসেম্বর প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয় আদালত। ওই দিনও প্রতিবেদন দাখিল না করায় আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের সচিব আবু সালেহ শেখ মো. জহিরুল হক এবং লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সচিব মোহাম্মদ শহিদুল হককে গত বছরের ১২ই ডিসেম্বর আদালতে তলব করেন আপিল বিভাগ। এর আগে এ সংক্রান্ত গেজেট প্রণয়ন প্রয়োজন নেই মর্মে ১১ই ডিসেম্বর সন্ধ্যায় আইন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক নোটিশে সিদ্ধান্ত জানান প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ। ১২ই ডিসেম্বর মন্ত্রণালয়ের দুই সচিব আদালতে হাজির হয়ে এ সংক্রান্ত ব্যাখ্যা দেন। শুনানিতে এ বিষয়ে ‘প্রেসিডেন্টকে ভুল বোঝানো হয়েছে’ বলে উল্লেখ করেন প্রধান বিচারপতি। এরপর অ্যাটর্নি জেনারেলের দফায় দফায় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারকে সময় দেয় আপিল বিভাগ।