তিন মাস পানিবন্দি হাওরপাড়ের ৮৫ পরিবার

32

মনু সেচ প্রকল্পের ৫৯ কিলোমিটার হাওর ঘেরা বাঁধের ভিতরের গ্রামের মানুষ দুর্বিষহ জীবন পার করছেন। তিন মাস ধরে পানি। ইসলামপুর গ্রামের ৮৫ পরিবারের মধ্যে ৭৬ পরিবার বাড়ি ছাড়া। গ্রামের মুসলিম মিয়া বলেন, ‘আর আর বছর এই রকম পানি অয় না, চলা ফেরা বুঝ থাকে। কিন্তু এবার আরক লাকান। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আইখাইলকুড়া ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামের মানুষ তিন মাস ধরে বাড়ি ছাড়া। কেউ আশ্রয় নিয়েছে উঁচু বাঁধের ধারে উড়া বানিয়ে। থাকছেন গবাদি পশু-মানুষ একসঙ্গে। কেউ আশ্রয় নিয়েছে আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি। যাদের কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই তারা চকির উপর চকি উঠিয়ে হাঁটু পানির মধ্যেই বসবাস করছে। এভাবে থাকতে থাকতে অনেকে রোগাক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। শিশু-বৃদ্ধদের বেশি সমস্যা হচ্ছে। গতকাল হাওর কাউয়াদিঘির পাড়ের গ্রাম ইসলামপুর (পাগুড়িয়া) সরজমিন গেলে কথা হয় গ্রামের বয়স্ক ব্যক্তি আবু বক্কর ছিদ্দিকী (৭০) এর সাথে। বলেন গত রমজান মাস থেকে হাওরে পানি বাড়ছে। এখন সারা গ্রাম জলমগ্ন। গ্রামের ৮৫ পরিবার বসবাস করলেও আঙ্গুলে গুনে দেখালেন এখন কেবল ন’টি পরিবার কোনোমতে বাড়িতে আছে। বাকিরা সবাই বাড়ি ছেড়ে বাধ্য হয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে উড়া বানিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন সাইফুর রহমান সার্কুলার (চাঁদনীঘাট-হলদিগুল) সড়কের ধারে। কেউ আশ্রয় নিয়েছেন পাগুড়িয়-জগৎপুর ইটসলিং সড়কের উপর। কিছু সচ্ছল পরিবার শহরে বাসা নিয়ে থাকছেন। জানালেন গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ কৃষিজীবী। গত বোরো মৌসুমে সবাই জমির ধান উঠাতে পারেনি আগাম বন্যার কারণে। একই গ্রামের মুসলিম মিয়া (৪৫) জানান, সুযোগ না থাকায় বাড়ি ছাড়তে পারিনি। খুব কষ্ট করে দিন কাটছে। সারাদিন ঘরের চকির উপরই থাকতে হয় বাচ্চা-কাচ্চার। রান্না-বান্না হয় চলতি চুলায়। মা-সহ ৮ জনের পরিবার। জানান ক্ষেত-কৃষিই মূল জীবিকা। মানবজমিনকে বলেন- ‘আর আর বছর এই রকম পানি অয় না, চলা ফেরার বুঝ থাকে। এবার আরখ লাখান,পনি যায় না তিন মাস অয়। বোরো ধান বেশি উঠাইতাম পারছি না। বন্যায় নিছে। কাম-কাজ নাই। ঘরে যা খানি আছিল তা দিয়ে কোনো মন্তে চলের। মুসলিম মিয়া হাত দিয়ে নিজের বাড়ির কাছের জমি দেখিয়ে বলেন- বন্যা না হলে এই সব জমিতে আমন এবং কিছু জমিতে শাইল ধান হতো। এবার কিছু হয়নি। বাকি দিন কিভাবে খাইব-বাঁচবো জানি না। আল্লাহ্‌ জানেন সব। কথা বলার সময় ইসলামপুর গ্রামের কয়েকজন মহিলাকে দেখা যায় হাওরঘেরা বাঁধ (চাঁদনীঘাট-হলদিগুল) এর উপর হাঁটা-হাঁটি করতে শিশু সন্তানসহ। এর একজন রুবি বেগম (৩৫) জানান, ঘরের ভিতর পানি। কিন্তু উড়া বানানোর মতো টিন না থাকায় বাধ্য হয়েই ঘরের মধ্যে থাকতে হচ্ছে ৭ সদস্যের পরিবার। সারা দিন চকির উপর থাকতে থাকতে বেয়াঙ্গাজ (বিরক্ত) লাগায় একটু হুকনা (শুকনো) মাটির মধ্যে হাটছেন। রুবি বেগম বলেন স্বামী ক্ষেত-কৃষির কাজ করেন। এই তিন মাস ধরে বন্যা থাকায় কোন কাম কাজ নেই। ধার-কর্জ করে সংসার চলছে। কিছু সাহায্য পাওয়া যায়। বাঁধের কাছেই যাদের বাড়ি দেখা গেছে প্রায় সব-বাড়ির সঙ্গে বাঁশের সাঁকো যা একদম ঘরের ভিতর পর্যন্ত। পাশের মিরপুর গ্রামের আজিদ মিয়া (৪৫) বলেন, ঘরের ভিতর পানি তাই তিনমাস ধরে পরিবারের সদস্যদের কামালপুর বাজারে এক ভাড়া বাসায় রেখেছেন। নিজে সারাদিন বাড়ি দেখাশুনা করেন। বলেন- পানিতে থাকতে থাকতে হাত-পা পঁচে গেছে। ২০০৪ সালেও এমন পানি হয়েছিল তবে এমলা (এ রকম) দিগদারী (কষ্ট) দেয়নি। এ দিকে পানি কমার লক্ষণ নেই আশ্বিন মাস চলছে। সুহেল মিয়া জানান, ঈদের একদিন পূর্বে তার বাবা মারা গেছেন। কবর দিতে হয়েছে অন্য গ্রামে। বাড়িতে পানি, থাকেন পরিবার-পরিজন নিয়ে মামার বাড়ি। এখন সবাই বেকার। পানিও কমছে না। একদিন সামান্য পানি কমলে বৃষ্টি হলেই আবার যেই সেই অবস্থা। চাঁদনীঘাট-হলদিগুল (সাইফুর রহমান সার্কুলার) সড়কের পাগুড়িয়া গ্রামের সামন থেকে খালের পাড় দিয়ে যে রাস্তা (ইটসলিং কিছু অংশ) জগৎপুর হয়ে অন্তেহরি বাজার পর্যন্ত গেছে সেই রাস্তার ইটসলিং অংশে উড়া বানিয়ে ৬০/৭০ টি বানবাসি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। সেখানে গিয়ে দেখা যায় ইসলামপুর গ্রামের নাজমা বেগম (৪২) চুলায় রান্না করছেন। পাশের একটি চকির উপর বিছানায় ৩ শিশু বসে খেলা করছে এবং তাদের পাশেই একই উড়ার ভিতর একটি গবাদিপশু বাঁধা। জানালেন বাড়িতে ঘরের ভিতর হাঁটু পানি। দুই মাসের বেশি সময় ধরে এখানে। জানালেন এই খালের পাড়ে যারা আশ্রয় নিয়েছেন সবার একই অবস্থা। পাশের উড়ার (ঘর) ইসরাইল মিয়া (৫০) একযুগ আগে একবার এমন বন্যা হয়েছিল। তবে তা এতোদিন থাকেনি। এমন কষ্ট হয়নি। কিন্তু এবার এতোদিন ধরে কেন পানি কমছে না তা কি শুধু বৃষ্টির দোষ? হাওর ঘেরা বাঁধের ভিতর যে পানি জমে আছে তা সময়মতো বের করার ব্যবস্থা করলেই এমন অবস্থা সৃষ্টি হবে না।

 

 

 

 

 

 

 

সূত্র : মানবজমিন অনলাইন পত্রিকা