দলে যাদের ইমেজ নেই তারা আগামীতে মনোনয়ন পাবে না

44

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দলীয় নেতাদের হুঁশিয়ার করে বলেছেন, ঘর ভাঙার জন্য যারা রাজনীতি করবে, অসুস্থ ধারার সঙ্গে যারা থাকবে, যাদের রাজনৈতিক ইমেজ নষ্ট হয়ে গেছে আগামী নির্বাচনে তাদের মনোনয়ন দেয়া হবে না। দলে চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, মাদকাসক্ত এবং আদর্শ চেতনাবিরোধীদের অন্তর্ভুক্তি থেকে নেতাদের বিরত থাকারও নির্দেশনা দেন তিনি।
যশোর জেলা ছাত্রলীগের ১৭তম সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। গতকাল সকালে যশোর কেন্দ্রীয় ঈদগাহে এই সম্মেলন শুরু হয়। দুপুরে ওবায়দুল কাদের বক্তৃতা করেন।
সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বিরোধীদল বিএনপিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘একটি দল গত আট বছরে আট বারও রাস্তায় নামতে পারেনি। রোজা এলে বলে ঈদের পরে তারা সরকার পতনের আন্দোলন করবে। কিন্তু এ পর্যন্ত প্রায় ১৭টি ঈদ পার হলেও তারা আন্দোলনের দিনক্ষণই ঠিক করতে পারেনি।’
তিনি বলেন, ‘এখন আষাঢ় মাস। এ মাসে তর্জন-গর্জন হয়। তাদের আন্দোলনের ডাক আষাঢ়ে তর্জন-গর্জনেই সীমাবদ্ধ; এ কারণেই তাদের কেবল কান্নাকাটি।’
বিএনপির নেতাকর্মীদের আন্দোলনে ব্যর্থতা আর হতাশার কথা উল্লেখ করে সম্মেলনের প্রধান অতিথি বলেন, ‘মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার দলের নেতাকর্মীদের জন্য এখন শুধুই কান্নাকাটি করেন। কর্মীদের দুঃখ তার সহ্য হয় না। চোরাগুপ্তা হামলা হয়েছে তার ওপরে; কিন্তু তিনি আহত হননি।’
২০০১ থেকে ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগের শ’ শ’ নেতাকর্মীর ওপর শাসক দল বিএনপির হামলা, খুন, মামলার ইতিবৃত্ত তুলে ধরে প্রধান অতিথি বলেন, ‘আমাদের নেতা আবদুস সামাদ আজাদ, মতিয়া চৌধুরী, মোহাম্মদ নাসিম, আমাকেসহ অসংখ্য নেতাকর্মীকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে রক্তাক্ত জখম করেছেন। এই খুলনা, সাতক্ষীরার কলারোয়ায় জননেত্রী শেখ হাসিনার গাড়িবহরে হামলা করেছেন, সমাবেশ করতে বাধা দিয়েছেন- সব কি ভুলে গেছেন?’
খুলনা বিভাগে খুন-খারাবির বিষয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘শামছুর রহমান, মানিক সাহা, হুমায়ুন কবীর বালু, আওয়ামী লীগ নেতা মঞ্জুরুল ইমামের রক্তের কথা আমরা ভুলি নাই। আপনাদের শাসনামলে রক্তের নদী বইয়ে দিয়েছিলেন। কাঁদতে কাঁদতে আমাদের অশ্রু দরিয়া হয়ে গিয়েছিল। ২৩শে আগস্টের বোমার স্প্লিন্টার নিয়ে আমাদের শ’ শ’ নেতাকর্মী এখনো কষ্ট বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। নামাজে সিজদা দিতে পারি না ব্যথায়।’
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আমাদের কত নেতাকর্মী গুম-খুন হয়েছে, তা ভুলে গেছেন? আমাদের চোখে আর জল নেই। সন্তানহারা মা, স্বামীহারা বিধবা স্ত্রী, ভাইহারা বোনের আহাজারিতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে গিয়েছিল।’
তিনি বিএনপির মহাসচিবকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘মির্জা সাহেব আপনি কাঁদছেন! ২০০১ সালের শাসনামলের সেই কান্নার সঙ্গে আপনার আজকের কান্না মিলিয়ে দেখুন। আপনি যে কান্না করছেন, সেটি মায়াকান্না। রাজনীতিতে মায়াকান্না আর কুম্ভিরাশ্রু বিষয়টি আছে।’
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘রাজনীতি হচ্ছে দেয়ার জন্য, নেয়ার জন্য নয়। সে কারণে সুস্থ ধারার রাজনীতির সঙ্গে থাকো। দলে যেন দুর্বৃত্তরা ঢুকতে না পারে।’
তিনি অবিলম্বে আওয়ামী লীগের সদস্য সংগ্রহ অভিযান শুরু করার তাগিদ দিয়ে বলেন, ‘আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে সদস্য সংগ্রহে আমাদের প্রথম টার্গেট তরুণ সদস্য, এরপর নারী সদস্য। সেভাবে আপনারা সদস্য সংগ্রহ অভিযান শুরু করুণ।’ একই সঙ্গে বিএনপি জামায়াত সমর্থকরা যেন এই স্রোতে দলের মধ্যে ঢুকে পড়তে না পারে সে বিষয়ে সকলকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন।
তিনি ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উদ্দেশে বলেন, ‘এখানেই কমিটি ঘোষণা করে দিয়ে যাও। তা না হলে ঘাটে ঘাটে অছাত্র, দুর্বৃত্তরা ঢুকে পড়বে।’ জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আরিফুল ইসলাম রিয়াদ সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।
সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ যশোর কেন্দ্রীয় ঈদগাহে অনুষ্ঠানস্থলে পায়রা উড়িয়ে সম্মেলন উদ্বোধন করেন।
এতে প্রধান বক্তা ছিলেন কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হুসাইন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে আরো বক্তৃতা করেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আবদুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব সাইফুজ্জামান শিখর, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগ, যশোর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন বিপুল প্রমুখ।
সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ, আলহাজ শেখ আফিলউদ্দিন, এডভোকেট মনিরুল ইসলাম, রণজিৎ রায়, স্বপন ভট্টাচার্য্য, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলনসহ খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলা ছাত্রলীগের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশন কাউন্সিলে নেতৃত্ব নির্বাচনের কথা রয়েছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ছাত্রলীগ নেতারা যশোর বাদশাহ ফয়সাল ইসলামী ইন্সটিটিউটের হল রুমে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করছিলেন। নির্বাচন না নাকি সমঝোতা কোন পদ্ধতিতে যশোর জেলা ছাত্রলীগের আগামী নেতৃত্ব গঠন করা হবে তা নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে এই সম্মেলনকে ঘিরে শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় রোববার সন্ধ্যা ৭টা থেকে আগামীকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত যশোর পৌর এলাকায় সব ধরনের ইজিবাইক, নসিমন করিমন, ভটভটি, থ্রিহুইলার, ইঞ্জিনচালিত ভ্যান ও রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করে জেলা পুলিশ প্রশাসন। এর ফলে গতকাল সকাল থেকে স্কুল কলেজগামী শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা চরম বিপাকে পড়ে। যা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম নেতিবাচক মনোভাবের জন্ম হয়।
অপরদিকে সম্মেলনে সহিংসতার আশঙ্কায় ছাত্রলীগসহ দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ছিল কম।

Advertisement
Print Friendly, PDF & Email
sadi