দৃশ্যপট থেকে নওয়াজ ও তার মেয়ে মরিয়মের প্রস্থান

31

উপমহাদেশীয় রাজনীতিকদের চোখ এখন পাকিস্তানের দিকে। গণতন্ত্রের পথে পাকিস্তান নাকি ছদ্মবেশী সামরিকায়নের পথে? ৫ বছরের ব্যবধানে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট আবারও একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতায় থাকতে অযোগ্য ঘোষণা করেছেন। তবে উপমহাদেশে এই প্রথম সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে কোনো সরকার প্রধান ‘দুর্নীতি এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ সংগ্রহের’ দায়ে গদিচ্যুত হলেন। যদিও ভারতের ইতিহাসে দুর্নীতির অভিযোগে রাজ্য হাইকোর্টের রায়ে প্রয়াত জয়ললীতার মতো জনপ্রিয় মুখ্যমন্ত্রীদের অপসারিত হতে দেখা গেছে।
রাজনীতি বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকদের অনেকেই মনে করছেন, পাকিস্তানের রাজনীতিতে একটি মৌলিক গুণগত রূপান্তরকরণ ঘটে চলেছে। ক্ষমতা নিয়ে কাড়াকাড়ির মধ্যেও তারা আদালতে বিরোধ মেটাতে পারছে। রায়ও মেনে নিতে শিখেছে। দক্ষিণ এশীয় রাজনীতিতে বাংলাদেশ ব্যতিক্রম, যেখানে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে সংসদে জোর নিন্দা-মন্দ হয়েছে। কিন্তু একজন নওয়াজ, যিনি সাহস করে একটা ভারতপন্থি লাইন নিয়েছিলেন, তিনি ক্ষমতা থেকে বিনা বাক্য ব্যয়ে সরে গেলেন।
২০১২ সালে পাকিস্তান পিপলস পার্টির নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি আদালত অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত হয়ে ক্ষমতা হারালেও পিপিপি শাসনের দ্রুত অবসান ঘটেনি। ২০১৭ সালে পাকিস্তানেরও প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ সুপ্রিম কোর্টের রায়ে গদিচ্যুত হলেও একটি বিষয় খুবই তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেটি হলো জাতীয় বা কোনো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পাকিস্তানের বড় ধরনের কোনো রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা কিংবা আগাম নির্বাচনের পূর্বাভাস দেয়া হচ্ছে না। কিছুদিন আগ পর্যন্ত গণমাধ্যমে বড় হরফের শিরোনাম হতো পাকিস্তানের বেসামরিক সরকারের পালাবদলে সেনাবাহিনীর ভূমিকাই প্রত্যক্ষ ও শক্তিশালী হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। এবারের পটপরিবর্তনকেও সামরিক বাহিনীর আশীর্বাদ বঞ্চিত বলে মনে করা হচ্ছে না। কিন্তু যেটা লক্ষণীয় কোনো গণমাধ্যমেই সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপকে কোনোভাবেই হাইলাইট করা হয়নি। নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের এ সিদ্ধান্তের পেছনে যদিও প্রকাশ্যে চোখে পড়েনি তদুপরি শক্তিশালী জেনারেলরা এর প্রতি পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন।
পাকিস্তানের আগামী সাধারণ নির্বাচন ২০১৮ সালের এপ্রিলে হবার কথা। এটা দেখার বিষয় যে, পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ সর্বসম্মতিক্রমে নওয়াজ শরীফকে প্রধানমন্ত্রী পদে অযোগ্য ঘোষণার পর পরই প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ সুপ্রিম কোর্টের রায়ের প্রতি যথেষ্ট আপত্তি থাকা সত্ত্বেও পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। পিপিপির প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি অবশ্য তাকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় প্রকাশের পরেও ইস্তফা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। কিন্তু নওয়াজ শরীফ এ নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা তৈরির ঝুঁকি নেননি।
কিন্তু সব থেকে যে প্রশ্নটি জোরালো হয়ে উঠেছে তা হলো পাকিস্তানের রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে নওয়াজ শরীফের দিন চিরতরে শেষ হয়ে গেল কি না? কেবল তার নিজের নয়, পলিটিক্যাল ডাইনেস্টির দিক থেকেও প্রশ্নটি কম জোরালো নয়। নওয়াজ শরীফ এবং তার তিন সন্তান মরিয়ম, হাসান এবং হোসেন তিনজনই ‘অসৎ’ হিসেবে আদালতের রায়ে চিহ্নিত হয়ে গেছেন। এর মধ্যে মরিয়মকে নওয়াজ শরীফের পরবর্তী রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু পরিহাস হচ্ছে যে ঘটনাটির কারণে পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের রায় নওয়াজের বিরুদ্ধে চলে গেছে সেটির সঙ্গে মরিয়মের সম্পর্কই নিবিড়ভাবে জড়িত।
২০১৬ সালে পানামা পেপার্সে খবর বেরিয়েছিল যে, নওয়াজ শরীফ বিপুল অর্থ ব্যয়ে লন্ডনে অ্যাপার্টমেন্ট কিনেছেন। গতকাল বৃটেনের গার্ডিয়ান পত্রিকায় বিষয়টি এসেছে এভাবে, ‘শরীফ পরিবারের বিরুদ্ধে দায়ের করা পানামা পেপার্সের মামলাটি গত জুলাই মাসে নাটকীয় মোড় নিয়েছিল। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা শুনানিকালে মরিয়ম নওয়াজ শরীফের জমা দেয়া ডকুমেন্টের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। মরিয়ম দাবি করেছেন, যে কোম্পানির নামে লন্ডনে ফ্ল্যাট কেনা হয়েছে সে কোম্পানিতে তিনি একজন ট্রাস্টি মাত্র। এ সংক্রান্ত নথিপত্রে দেখা যায়, সেখানে তারিখ দেয়া রয়েছে ২০০৬ সাল। আর সে নথিপত্র মুদ্রিত হয়েছে মাইক্রোসফট ক্যালিব্রি ফন্টে। অথচ মাইক্রোসফট এই ফন্টটি বাজারে এনেছিল ২০০৭ সালে। আর সে কারণেই তা জাল হিসেবে বিশেষজ্ঞরা সন্দেহ করেন। গার্ডিয়ানে উল্লেখ করা হয় যে মামলার শুনানিকালে এমন কিছু ডকুমেন্ট উপস্থাপন করা হয় যে যা ছিল পুরোপুরি মিথ্যা। আর এসব তর্কিত নথিপত্রের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট এ উপসংহারে পৌঁছান যে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে আদালতে জাল নথিপত্র পেশ করা হয়েছে। আর তার ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্টকে প্রধানমন্ত্রীকে অযোগ্য ঘোষণা করতে পেরেছে। অবশ্য সুপ্রিম কোর্র্টের এ রায়কে প্রখ্যাত মানবাধিকার কর্মী আসমা জাহাঙ্গীর বলেছেন এটি একটি রাজনৈতিক রায়।
দক্ষিণ রাজনীতির একটি বৈশিষ্ট্য হলো যেকোনো অরাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় কোনো জনপ্রিয় রাজনীতিবিদকে গণতান্ত্রিক রাজনীতিক প্রক্রিয়া থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া হলে তা স্থায়ীভাবে টেকে না। আশির দশকেও নওয়াজ অপরিচিত ছিলেন। কিন্তু তিনি একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে উপমহাদেশের অন্যতম প্রচীন দল মুসলিম লীগের নেতৃত্বের শীর্ষে উঠে আসেন। তার রাজনৈতিক জীবন সাক্ষ্য দেয় যে এ রায়ের ফলে তিনি ও তার উত্তরসূরিদের জন্য পাকিস্তানি রাজনীতির দরজা চিরকালের জন্য রুদ্ধ হয়ে গেছে, এমনটা বলা যাবে না। ১৯৯০ সালে প্রথম নওয়াজ শরীফ নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিন বছরের মাথায় ১৯৯৩ সালে গোলাম ইসাক খান তাকে অপসারণ করেছিলেন। পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট অবশ্য তার ক্ষমতাচ্যুতি অসাংবিধানিক হিসেবে ঘোষণা দেন। কিন্তু সামরিক বাহিনী প্রকাশ্য তাকে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে চাপ সৃষ্টি করেছিল। এরপর তাকে দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হতে মাত্র ৪ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। কিন্তু মাত্র ২ বছরের মাথায় ১৯৯৯ সালে সেনাপ্রধান জেনারেল পারভেজ মোশাররফকে অপসারণ করে তিনি সামরিক অভ্যুত্থানের শিকার হন। বিমান ছিনতাই ও সন্ত্রাসবাদে জড়িত থাকার দায়ে আদালতে তিনি যাবজ্জীবন দণ্ডিত হয়েছিলেন। সৌদি রাজপরিবারের মধ্যস্থতায় কারাগার থেকে বেরিয়ে সাত বছরের নির্বাসন কাটিয়ে তিনি আবার দেশে ফিরেছিলেন। ২০১৩ সালে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। সে হিসেবে নওয়াজের গদিচ্যুতি যেমন ঘন ঘন। তেমনি নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী ফিরে আসাটা ঘন ঘন। সুতরাং আবারও তার ফিরে আসাটা কতটা নিকটবর্তী বা দূরবর্তী তার উত্তর পেতে অপেক্ষা করতে হবে।