দৃশ্যমান হলো পদ্মা সেতু

29

স্প্যান (সুপার স্ট্রাকচার) পিলারের ওপর স্থাপন করার পর চোখে দেখা যাচ্ছে পদ্মা সেতু। বিশাল পদ্মার বুকে এটি ধূসর রঙের দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। শনিবার সকাল ৮টায় শুরু করে ১০টার মধ্যেই সেতুটির জাজিরা প্রান্তের ৩৭ ও ৩৮নং খুঁটির ওপর বসিয়ে দেয়া হয় এর প্রথম স্প্যান। ১৫০ মিটার দীর্ঘ এই স্প্যানটি স্থাপনের মধ্যদিয়ে স্বপ্নের পদ্মা সেতুর অগ্রগতির আরেক ধাপ এগিয়ে গেল। এই দৃশ্য দেখার জন্য অনেকে পদ্মায় আসলেও কঠোর নিরাপত্তায় কেউ প্রবেশ করতে পারেনি। তবে দূর থেকেই অনেকে এই দৃশ্য অবলোকন করছে। পদ্মা সেতুর সুপার স্ট্রাকচারবাহী ‘তিয়ান ই হাউ’ জাহাজের ৩৬ শ’ টন ক্ষমতার ক্রেনের সঙ্গে এখনও স্প্যানটি বাঁধা রয়েছে। এটি বেয়ারিংয়ের সঙ্গে নাট-বল্ডু ভালোভাবে স্থাপানের পরই ক্রেনটি সরিয়ে আনা হবে।
স্প্যান বসানোর এই মাহেন্দ্রক্ষণে উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, মুন্সীগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপিকা সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি, সেতু সচিব আনোয়ারুল ইসলাম, সেতুটির প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম, পদ্মা সেতুর সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজের কোম্পানির প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
স্প্যান স্থাপনের পর বেলা সোয়া ১১টায় সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের সার্বিক বিষয়ে ব্রিফিং করেন। মন্ত্রী বলেন, পদ্মা সেতুর প্রথম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে আকাশে কালো মেঘ কেটে দৃশমান হয়েছে পদ্মা সেতু। সব বাধা উপেক্ষা করে সেতুর কাজ এগিয়ে চলেছে। যথা সময়েই সেতুর কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে। এখন পর্যায়ক্রমে অন্যান্য স্প্যানগুলোও উঠবে। মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরে খুব শিগগিরই এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। সেতুর কাজ যাতে এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ না থাকে সেজন্য তার নির্দেশে অনানুষ্ঠানিকভাবে সেতুর স্প্যান উঠানো হয়েছে। সেতু সচিব বলেন, অনেক ক্ষেত্রে পিয়ারের গভীরতা বৃদ্ধি বা প্রয়োজন অনুযায়ী তা পরিবর্তন করে চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। তার মানে সেতুর মূল ডিজাইনের পরিবর্তন নয়। এর আগে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরের মাওয়ার কুমারভোগ কন্সট্রাকশন ইয়ার্ডের ওয়ার্কশপ থেকে রোববার স্প্যানটি রওনা হয়। রাতে ২৩ নম্বর পিয়ারের কাছে এসে যাত্রা বিরতি করে। সোমবার সকালে রওনা হয়ে দুপুরে এটি ৩০ ও ৩১ নম্বর পিয়ারের মাঝামাঝি স্থানে নোঙ্গর করে। পরে শুক্রবার দুপুর ২টায় জাহাজটি স্প্যান নিয়ে হাজির হয় ৩৭ ও ৩৮ নম্বর পিয়ারের মাঝামাঝি। সন্ধ্যার আগেই খুঁটি দুটির ঠিক এক মিটার ওপরে ঝুলিয়ে রাখে। পরে শনিবার সকাল ৮টায় এটি স্থাপন শুরু করে।
সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানান, প্রথম স্প্যানটি স্থাপনের পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে অন্যান্য স্প্যানও ওঠানো শুরু হবে। ৩৭ থেকে ৪২ নম্বর পর্যন্ত ছয়টি পিয়ার এখন সম্পন্ন পর্যায়ে। শিগগিরই শেষ হচ্ছে ৩৯ ও ৪০ নম্বর পিয়ারের কাজ। ৩৮ পিয়ারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এই দুই পিয়ার ধরে আরও দুটি স্প্যান বসবে শিগগিরই। স্প্যানের মাঝ বরাবর নিচের লেনে চলবে ট্রেন। ওপরে কংক্রিটের চার লেনের সড়কে চলবে গাড়ি। তাই এই স্প্যানের ওপরে রাস্তা এবং নিচে ট্রেন লাইন স্থাপন করা হবে।
২০১৫ সালের ডিসেম্বরে পদ্মা সেতুর মূল অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু হয়। এ পর্যন্ত প্রকল্পের প্রায় সাড়ে ৪৭ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। সেতুতে মোট ৪২টি পিয়ার থাকবে। এর মধ্যে ৪০টি পিয়ার নির্মাণ করা হবে নদীতে। দুটি নদীর তীরে। নদীতে নির্মাণ করা প্রতিটি পিয়ারে ছয়টি করে পাইলিং করা হয়েছে, যার দৈর্ঘ্য গড়ে প্রায় ১২৭ মিটার পর্যন্ত। একটি পিয়ার থেকে আরেকটির দূরত্ব ১৫০ মিটার। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সেতুতে দুটি পিয়ারের ওপর বসবে ৪১টি স্প্যান। এছাড়া দুই পাড়ের সংযোগ সেতুসহ সেতুটি ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ। পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় হবে প্রায় ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। আগামী বছরের ডিসেম্বরে কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকৌশলীরা জানান, নদীতে মূল সেতুর মোট ২৪০টি পাইলের মধ্যে ৭৫টি পাইল বসেছে। এছাড়া দুপারের দুটি ট্রান্সজিশন পিয়ারের ৩২টির মধ্যে ১৬টি স্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ জাজিরা প্রান্তে ৪২ নম্বর পিয়ারের ট্রান্সজিশন পিলারের ১৬টি পাইল বসে গেছে। এখন বাকি মাওয়া প্রান্তের ১ নম্বর ট্রান্সজিশন পিয়ারের ১৬টি পাইল। এর কাজ এখনও শুরু হয়নি। ডিজাইন চূড়ান্ত হচ্ছে। এছাড়া জাজিরা প্রান্তে সংযোগ সেতুর ১৮৬টি পাইল বসেছে। এখানে আর মাত্র ৭টি পাইল বাকি সংযোগ সেতুর (ভয়াডাক্ট) জন্য। আর মাওয়ায় এ পর্যন্ত সংযোগ সেতুর ১৭২টির মধ্যে ৭টি পাইল বসেছে।
ধূসর রঙের ‘৭-এ’ নম্বর স্প্যানটি বসার অল্প সময়ের পরই বসবে পরেরটি। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ‘৭বি’ নম্বর স্প্যানটির ফিটিং সম্পন্ন রয়েছে। এটিও শিগগিরই রঙ করা শুরু হবে। কারণ অক্টোবরের শেষ দিকে এ স্প্যানটি বসবে ৩৮ ও ৩৯ পিয়ারের। ইতিমধ্যেই ৩৯ নম্বর পিয়ারের কাজও দ্রুত এগিয়ে চলেছে। শিগগিরই শেষ হবে এর কাজ।

 

 

সূত্র : মানবজমিন অনলাইন পত্রিকা