নকলার ৫ নারী জয়িতার গল্প

91

মুহাম্মদ হযরত আলী, নকলা :
জয়িতা অন্বেষন বাংলাদেশ শীর্ষক কার্যক্রমের আওতায় নকলা উপজেলার ৫ জন নারীকে সম্মাননা প্রদান করেছে নকলা উপজেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর। জীবন সংগ্রামে নানা প্রতিকুলতাকে জয় করে বর্তমানে সফল ও আত্মনির্ভরশীল নারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ৫ জন নারী হলেন, হোসনা বেগম, ছালমা খাতুন, নুরজাহান, সেলিনা আক্তার ও আকলিমা বেগম। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রতি বছর ২৫ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত আর্ন্তজাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ ও বেগম রোকেয়া দিবস উপলক্ষে তৃণমুল পর্যায়ে ৫টি ক্যাটাগরীতে সফল নারী তথা জয়িতাদের সন্ধান করে তাদের সম্মাননা ও স্বীকৃতি প্রদান করা হয়ে থাকে বলে নকলা উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা আরমানা হক জানিয়েছেন।

হোসনা বেগম:
নকলা উপজেলার অর্থনিতিতে সাফল্য অর্জনকারী এক জয়িতা নারীর নাম হোসনা বেগম। তিনি উপজেলার ইশিবপুর গ্রামের হোসেন আলীর কন্যা। অষ্টম শ্রেণি পাশ করার পর তার শিক্ষা জীবনের ইতি ঘটে। সে পেশায় একজন দর্জী। হোসনা জানায়, গরিব পরিবারের সন্তান হওয়ায় ৮ম শ্রেণি পাশের পর বাবা-মা তাকে লেখা পড়া করতে না দিয়ে একজন দিন মুজুরের সাথে বিয়ে দেয়। একদিকে অল্প বয়স অন্যদিকে দিন মুজুরের অভাব অনটনের ঘরে তার দিন খুব কষ্টে কাটত। বিয়ের ০২ বৎসর পর তার কোলে আসে এক ছেলে সন্তান। এসময় তার জীবনের কষ্ট আরও বেড়ে যায়। তখন সে ব্রাকের সহযোগিতায় কাপড় সেলাই এর কাজ শিখে একটি মেশিন কিনে সেলাই কাজ শুরু করে। তারপর থেকে ১০ বছর যাবৎ সেলাই এর কাজ করে স্বচ্ছল জীবন যাপনের পাশাপাশি সে ১০ শতাংশ জমি ক্রয় করেছে। এক সময় তার থাকার ঘর পর্যন্তও ছিল না, বতর্মানে সে স্বাভলম্বী নারী।

সালমা খাতুন:
উপজেলা পর্যায়ে শিক্ষাক্ষেত্রে সফল আরেক জয়িতা নারীর নাম সালমা খাতুন। সে রানীশিমূল গ্রামের আব্দুল বারেক এর কন্যা। বি.এ পাশ করে এখন প্রাইমারী স্কুলে চাকুরী করছে। তিনি জানান, আমি যখন এস.এস.সি পাশ করি তখন আমার বাবা মারা যান, সে অবস্থায় সংসারের হাল ধরেন আমার ভাই। সংসার করে তার সামান্য উপার্জন দিয়ে খুব কষ্ট করে আমাকে লেখাপড়া করান। অনেক অভাবের মধ্য দিয়ে আমার পড়াশুনা চলে। মা প্রায় সময় অসুস্থ্য থাকতেন তাই আমাকেই সংসারের সব কাজ করতে হতো। একে অভাব অনটন আরেকে মায়ের অসুখ তার মাঝেও আমার পড়ালেখা চালানোর চেষ্ঠা করি। যখন আমি কলেজে পড়ি তখন পড়াশুনার পাশাপাশি সেলাই মেশিনে কাজ শিখে নিজে সেলাইয়ের কাজ করতাম। সেলাই মেশিনের কাজ করে আমি ডিগ্রিতে পড়ার খরচ যোগাই। পরবর্তীতে আমি প্রাইমারী স্কুলের চাকুরীর জন্য আবেদন করি, কোন টাকা পয়সা ছাড়াই আমার চাকুরী হয়। বর্তমানে আমি বারমাইসা দক্ষিণ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক।

নুরজাহান:
উপজেলার অপর এক জয়িতা নারী সফল জননী নুরজাহান। তিনি গণপদ্দি ইউনিয়নের খারজান গ্রামের ছালাম মিয়া স্ত্রী। শিক্ষাজীবনে তিনি এসএসসি পাশ করে নকলা পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী পদে চাকুরী করছেন। সে জানায়, আমার জন্ম দরিদ্র পরিবারে। আমরা ৭ ভাই-বোন। আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি তখন বাবা আমাকে সমাজ কল্যাণে কর্মরত এক ছেলের সাথে বিয়ে দিয়ে দেয়। আমার ২ ছেলে। ছোট ছেলে যখন ২ মাসের পেটে তখন আমার স্বামী অপর এক মেয়ের সঙ্গে পরকীয়ায় প্রেম করে বিয়ে করে ফেলেন, আমাদের খোঁজ-খবর নেওয়া বন্ধ করে দেওয়ায় বাধ্য হয়ে আমি সন্তানসহ বাপের বাড়ি চলে আসি এবং মনোবল শক্ত করে আবার পড়াশুনা শুরু করি। এসএসসি পাশ করে নকলা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে দপ্তরী পদে চাকুরী নেই। বড় ছেলে পড়াশুনা শেষ করে একাডেমিক সুপারভাইজার পদে সুনামগঞ্জে চাকুরী করছে। বর্তমানে আমি খুব ভালো আছি।

আকলিমা বেগম:
উপজেলায় সমাজ সেবায় অসামান্য অবদান অর্জনকারী আরেক জয়িতা নারীর নাম আকলিমা বেগম। সে চরঅষ্টধর ইউনিয়নের চরভাবনা গ্রামের আবুল কাশেমের মেয়ে। সে শিক্ষা জীবনে এসএসসি পাশ। সে জানায়, আমি সমাজে এক অবহেলিত নারী ছিলাম। আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ ছিল। আমার মনে সমাজে বড় হওয়ার স্বপ্ন জাগল। তাই আমি ১৫-২০ জন মহিলা নিয়ে একটি দল গঠন করি। যেখানে প্রতি সপ্তাহে মিটিং করে যার যার যে সমস্যা আছে তা নিয়ে আলোচনা করি এবং সমাধান করার চেষ্টা করি। এ কাজে সবাই আমাকে সহযোগীতা করে বর্তমানে আমি আমার সংগঠণ নিয়ে সম্মানের সহিত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি।

এ বিষয়ে নকলা উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা বলেন, তৃণমুল পর্যায়ের নানা প্রতিকুল অবস্থার বিরুদ্ধে যেসব নারী যুদ্ধ করে জয়ী হয়েছেন তাদের মধ্যে নকলা উপজেলায় ৫টি ক্যটাগরীতে ২৬ জন জয়ী নারী আবেদন করেন। এতে ৫জনকে শ্রেষ্ঠ জয়িতা নারী হিসেবে নির্বাচন করা হয়।