নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন রোহিঙ্গা জাতি নিধনে জঙ্গিবাদ উত্থানের আশঙ্কা, উর্বর ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গ্রুপের

42

রাখাইনে ‘জাতি নিধনযজ্ঞে’র ফলে এ অঞ্চলে জঙ্গি উত্থানের আশঙ্কা রয়েছে। ক্ষুধার্ত, বেপরোয়া, আশ্রয়ের খোঁজে থাকা অসহায় রোহিঙ্গাদের এক্ষেত্রে ব্যবহারের ঝুঁকি রয়েছে। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কগুলোর চোখ পড়তে পারে এদিকে। আশ্রয় শিবিরগুলো আন্তর্জাতিক জঙ্গি বা উগ্রপন্থি গ্রুপগুলোর জন্য এক উর্বর ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এই ঝুঁকি সামলাতে রোহিঙ্গাদের অধিকারের প্রতি সম্মান দেয়া উচিত। তাদের স্বীকৃতি দেয়া উচিত। কিন্তু মিয়ানমারের সেনাবাহিনী করছে তার উল্টোটা।রোহিঙ্গা সঙ্কট থেকে সৃষ্ট সমস্যা সম্পর্কে এমন আভাষ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস। এতে সাংবাদিক হান্নাহ বিচ ‘হাউ এ জেনারেশন অব মিয়ানমার মুসলিমস ইজ বিং র‌্যাডিকেলাইজড’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব কথা লিখেছেন। এতেই তিনি উগ্রবাদ বা জঙ্গিবাদের উত্থানের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। উল্লেখ্য, এরই মধ্যে মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলিমদের আর্থিকভাবে সহায়তা করতে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জঙ্গি গোষ্ঠী আল কায়েদা। তবে তাদের সঙ্গে বা কোনো আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী, জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে নিজেদের কোনোও রকম সম্পর্ক থাকার কথা এরই মধ্যে অস্বীকার করেছে আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি (আরসা)। তাদের দাবি, তারা লড়াই করছে রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায়ের জন্য। রোহিঙ্গা মুসলিমদের যাতে মিয়ানমার নাগরিকত্ব দেয় সে জন্য তাদের লড়াই। নিউ ইয়র্ক টাইমসে হান্নাহ বিচের লেখা দীর্ঘ ওই প্রতিবেদনটি এ রকমÑ নাজির হোসেন। মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলের একটি গ্রামের ইমাম। গত মাসে সন্ধ্যায় নামাজ আদায় করার পর বেশ কিছু মানুষ তাকে ঘিরে ছিলেন। তাদের সঙ্গে তিনি আলাপ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এর কয়েক ঘন্টার মধ্যে তার গ্রামের ডজনখানে আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মির (আরসা) যোদ্ধা হাতে তৈরি অস্ত্র নিয়ে নিকটস্থ পুলিশ পোস্টে হামলা চালায়। ধর্মীয় ওই নেতার আশীর্বাদ প্রয়োজন ছিল তাদের। নাজির হোসেন বলেন, একজন ইমাম হিসেবে আমি তাদেরকে উৎসাহিত করেছি যাতে তারা তাদের মিশন থেকে পিছু না হটেন। আরসার প্রতি এটাই ছিল আমার শেষ পরামর্শ। আমি তাদেরকে বলেছি, তারা যদি আমৃত্যু যুদ্ধ না করে, তাহলে সেনাবাহিনী এসে যাবে। তারা পরিবারের সবাইকে হত্যা করবে। নারী, শিশু সবাইকে। তারা লড়াই করেছে। যোগ দিয়েছে ২৫ শে আগস্টের হামলায়। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে তাদের দলে যোগ দিয়েছে কয়েক হাজার যোদ্ধা। তারপর প্রতিহিংসা চালানো হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে যেকোনো উপায়ে।
এর পরই মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও দাঙ্গাবাজরা ভয়াবহ অভিযান শুরু করে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর। এর ফলে হাজার হাজার মানুষ পালিয়ে বাংলাদেশে আসতে বাধ্য হয়। জাতিসংঘ এটাকে জাতি নির্মূল হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। এখন থেকে চার বছর আগে ক্ষুদ্র আকারে রোহিঙ্গারা প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করে। আরসা, যা স্থানীয়ভাবে হরকাহ আল ইয়াকিন বা বিশ^াসীদের আন্দোলন নামে পরিচিত, তারা মিয়ানমারের নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ দুটি হামলা চালাতে সক্ষম হয়েছে। প্রথম হামলা চালিয়েছে গত অক্টোবরে। আর দ্বিতীয়টি গত মাসে। সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও আরসা তার নিজেদের লোকজনকে টার্গেট করেছে। তারই ফলে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর হাতে তারা একটি ইস্যু তুলে দিয়েছে। তারা বলতে পারছে, তারা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়ছে, যদিও তারা গ্রামের পর গ্রাম জ¦ালিয়ে দিয়েছে। হাজার হাজার শিশু ও নারী পালিয়ে গেছে বা যাওয়ার পথে তাদের হত্যা করা হয়েছে। মিয়ানমারের সবচেয়ে দরিদ্র রাজ্য হলো রাখাইন। সেখানে এরই মধ্যে যে জ¦লন্ত পরিস্থিতিতে ঘি ঢেলেছে রোহিঙ্গাদের নতুন প্রজন্মের ভিতর গড়ে ওঠা উগ্রবাদ। উদ্বেগ দেখা দিয়েছে অল্প যেসব রোহিঙ্গা অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে এবং তাদের ব্যাপক যে জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের উপচে পড়া শিবিরগুলোতে বসবাস করছে তাদেরকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কগুরো বিপথে পরিচালিত করতে পারে। এতে স্থানীয় একটি সংঘাত বৈশি^ক রাজনীতির মূল¯্রােতের লড়াইয়ে যুক্ত হতে পারে।
আরসার উগ্রবাদী রাজনীতি বিপর্যস্ত হয়েছে। তারা এ মাসে অস্ত্রবিরতি ঘোষণা করেছিল। কিন্তু তা প্রত্যাখ্যান করেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। সরকারি পক্ষের তুলনায় তাদের প্রাণহানী বা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে অনেক বেশি। তারা জানে প্রতিরোধ গড়ে তুললে তার মূল্য দিতে হবে অনেক বেশি। এমনকি তাদের পরিবারের সদস্যদেরও এ জন্য মূল্য দিতে হবে।
মংডু শহরের কাছেই জ¦ালিয়ে দেয়া হয়েছে ২৫ বছর বয়সী নূর আলমের বাড়ি। তারপর থেকে তার পরিবারের সদস্যরা আশ্রয় নিয়েছেন একটি জঙ্গলে। তিনি বলেন, এই যুদ্ধ শুধু আমার বা আমার পরিবারের ভাগ্য নির্ধারণের জন্য নয়। এ যুদ্ধ হলো পুরো রোহিঙ্গা জাতির অস্তিত্বের লড়াই। যদি আমাদের সন্তানদের শান্তিতে বসবাসের জন্য আমাদের জীবনও দিতে হয় তাও দিতে প্রস্তত আমরা। তার মূল্য অনেক বেশি। উল্লেখ্য, প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে মিয়ানমার শাসন করছে সেনাবাহিনী। তারা ধারাবাহিকবাবে নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে রোহিঙ্গাদের ওপর। এর ফলে রোহিঙ্গারা বসবাস করছেন বর্ণবাদ যুগের মতো বৈষম্যের মধ্যে। তাদের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। গত বছর নেত্রী অং সান সুচির নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসে বেসামরিক প্রশাসন। সেই প্রশাসনের সরকার রাখাইনে নৃশংস দমনপীড়নের পক্ষে সাফাই গাইছে। তারা এটাকে ‘এক্সট্রিম বেঙলি টেরোরিস্টস’ বা উগ্র বাঙালি জঙ্গিবাদ বলে আখ্যায়িত করেছে। দীর্ঘ সময় রাখাইনে রোহিঙ্গাদের শিকড় প্রোথিত। তা সত্ত্বেও মিয়ানমারের সরকারি ভাষ্য হচ্ছে, তারা অবৈধ অভিবাসী। বাংলাদেশী। ব্যাংকক ভিত্তিক মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন ফোরটিফাই রাইটসের সহ প্রতিষ্ঠাতা ম্যাথিউ স্মিথ বলেছেন, বছরের পর বছর ধরে আমরা উগ্রবাদের ইস্যুতে কথা বলেছি। উগ্রবাদীদের তৎপরতা নিয়ে আমরা বিভিন্ন ওয়ালে লেখালেখি করেছি। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদের ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য রোহিঙ্গাদের অধিকারের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। কিন্তু মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তা করছে না। ২৫ আগস্ট থেকে তাদের চালানো অপারেশনের কারণে কমপক্ষে চার লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। রোহিঙ্গারা, যারা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, তারা আরসা বিদ্রোহীদের মুখোমুখিও পড়ছে। তারা চাইছে রোহিঙ্গা যুবকরা ফিরে গিয়ে তাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে যুদ্ধ করুক। ২৫ শে আগস্টে হামলার কথা মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর কাছে ফাঁস করেছিল যেসব রোহিঙ্গা ইনফরমার তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানাচ্ছে মানবাধিকার গ্রুপগুলো। আরসার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হচ্ছে। বলা হচ্ছে তারা জাতিগত রাখাইনদের হত্যা করছে। মিয়ানমার সরকারের হিসাব মতে ২৫ শে আগস্ট থেকে কমপক্ষে এক ডজন মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, যারা রোহিঙ্গা নন। এর পাশাপাশি হত্যা করা হয়েছে কমপক্ষে ৩৭০ রোহিঙ্গা উগ্রপন্থিকে। বাংলাদেশের উপচেপড়া শরণার্থী শিবিরগুলোতে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা, উগ্রপন্থিদের বিষয়ে তাদের আগ্রহ লুকাতে পারছে না। অক্টোবরের হামলার পর মিয়ানমার ও বাংলাদেশ সীমান্তে পাহাড়ের জঙ্গলে তিন মাস আত্মগোপন করে ছিলেন ৩২ বছর বয়সী মাদ্রাসার একজন প্রদর্শক ও আরসা যোদ্ধা আবুল ওসমান। তিনি বলেন, আমি যদি বাড়ি থাকতাম তাহলে আমাকে সেনাবাহিনী মেরে ফেলতো। আল্লাহর নির্দেশিত পথে আমার অধিকারের পক্ষে লড়াই করে মরে যেতে চাই। আমার আত্মত্যাগ আমাকে বেহেশতে স্থান করে দেবে।
কিন্তু সবাই এই আত্মোৎসর্গ করতে চান না। যখন দাঙ্গাবাজরা ও মিয়ানমারের সেনাবাহিনী গ্রামে আগুন ধরিয়ে দেয় তখন নূর কামাল (১৮) তার ৬ বছর বয়সী ভাই নূর ফারুককে সঙ্গে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তাদের দু’জনকেই পিছন থেকে মাথায় চাপাতি দিয়ে কোপায় জাতিগত রাখাইনরা। কক্সবাজারে একটি জীর্ণ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন নূর কামাল। তিনি তার গ্রামের আরসা উগ্রপন্থিদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বলেন, আল ইয়াকিনের (আরসা) কারণে আমরা দুর্ভোগ পোহাচ্ছি। হামলা চালানোর পর তারা নিরুদ্দেশ। কিন্তু সেনাবাহিনী নির্বিচারে আমাদেরকে হত্যা করছে। আমাদেরকে ফেলে দেয়া হয়েছে সেনাবাহিনীর নিষ্পেষণের মুখে।
রাখাইনের খাঁ খাঁ গ্রাম ও বাংলাদেশের গাদাগাদি করে অবস্থান নেয়া শরণার্থী শিবিরগুলোর পরিস্থিতি ভাল নয়। বাংলাদেশে বর্তমানে কমপক্ষে আট লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন। এতে এসব স্থান আন্তর্জাতিক জঙ্গি বা উগ্রপন্থি গ্রুপগুলোর জন্য এক উর্বর ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। তারা এখান থেকে তাদের দলে সদস্য সংগ্রহ করবে, যদিও গত সপ্তাহে আরসা বলেছে, তাদের সঙ্গে কোনো জঙ্গিবাদী গ্রুপের কোনো সম্পর্ক নেই। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিষয়ক প্রফেসর আলী রিয়াজ। তিনি বাংলাদেশ ও পাশ^বর্তী এলাকায় ইসলামি জঙ্গিবাদের বিষয়ে গবেষণা করেন। তিনি বলেছেন, কিভাবে গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো ব্যবহার করে তা আমরা দেখেছি। যখন হাজার হাজার মানুষের মধ্যে বেপরোয়াভাব চলে আসে, যখন তারা মারাত্মকভাবে বঞ্চনার শিকার হয়, তখন উগ্রবাদী আন্দোলন বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন সংঘাতে কিন্তু এভাবেই তারা যুক্ত হয়। এক্ষেত্রে ধর্মীয় সুবাস একটি উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে।

 

 

 

 

 

 

সূত্র : মানবজমিন অনলাইন পত্রিকা