নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে অনড় আওয়ামী লীগ, পথ খুঁজছে বিএনপি

32

কোনো ব্রেক থ্রু নেই। তবে সামনের মাসগুলোতে রাজনীতি যে উত্তপ্ত হবে, তা অনেকটাই স্পষ্ট। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে পরিস্থিতি ততই জটিল হবে। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এ সময়ে নানা ষড়যন্ত্রমূলক ঘটনা ঘটতে পারে।
সে যাই হোক নির্বাচনী রাজনীতিতে আপাত কোনো সমঝোতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগ নেতারা এক বাক্যেই বলছেন, সংবিধানের বাইরে কিছুই হবে না। তবে আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে- সেটা ধরে নিয়েই জোর কদমে প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি। অপেক্ষাকৃত কঠিন লড়াইয়ের জন্য উপযুক্ত প্রার্থী নির্বাচনের দিকে নজর দিয়েছে আওয়ামী লীগ। এক্ষেত্রে বর্তমান এমপিদের অনেকেরই ভাগ্য বিপর্যয় ঘটতে পারে।
অন্যদিকে, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হেলিকপ্টারে করে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন আর অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোকে কোনো কথা বলার সুযোগ দিচ্ছেন না। আমরা খুব স্পষ্ট করে বলতে চাই পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে কখনোই কোনো সরকার চিরস্থায়ী নয়। তিনি বলেন, নির্বাচনকে সুষ্ঠু হতে হবে। নির্বাচনকে অবাধ হতে হবে। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মানুষের কাছে এবং বহির্বিশ্বের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। এজন্য সরকারকে বাধ্য করতে হবে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নিজেদের জন্য বৈরী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নির্বাচন প্রশ্নে সমঝোতার পথ খুঁজছে বিএনপি। এক্ষেত্রে দলটিতে আগে থেকেই দুটি মত রয়েছে। একটি অংশ মনে করে, বিদ্যমান সাংবিধানিক ব্যবস্থায় নির্বাচনে অংশ নিয়ে কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়। অন্য অংশটি মনে করে, প্রধানমন্ত্রী পদে শেখ হাসিনাকে বহাল রেখেও নির্বাচনে বিএনপির ভালো করা সম্ভব। এ অংশের মতের প্রকাশই দেখা যায়, একটি জাতীয় দৈনিককে দেয়া সাক্ষাৎকারে বিএনপির অন্যতম পরামর্শক হিসেবে পরিচিত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের বক্তব্যে। তিনি বলেন, ‘সংবিধানের ১২৩(৩)(খ) ধারা কার্যকর করা হলেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ‘নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানমন্ত্রী হবেন। সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে না কিংবা পৃথক তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনেরও প্রয়োজন নেই। তখন সংসদ ভেঙে যাবে, বর্তমান মন্ত্রিসভাও থাকবে না। নির্বাচনকালীন রুটিন কাজ করার জন্য প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন দলের কিছু নেতাকে নিয়ে সবার গ্রহণযোগ্য একটি ছোট মন্ত্রিসভা গঠন করবেন। নির্বাচন কমিশন নির্বাচন করবে। ওই সময়ে যেসব কর্মকর্তা নির্বাচনী কাজে সহায়তা করবেন তারাও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পাবেন।’
প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদের এ মতের ব্যাপারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে দলটির কেউ কেউ মনে করেন, আগ বাড়িয়ে এমন মন্তব্য করা উচিত নয়। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কয়েক মাসের মধ্যেই নির্বাচনী সহায়ক সরকারের ফর্মুলা উপস্থাপন করবেন। সংবিধানের ভেতরে-বাইরে দুই ধরনের প্রস্তাবনা নিয়েই বিএনপির ভেতরে আলোচনা রয়েছে। তবে কোনো ধরনের ফর্মুলা দেয়ার আগে লন্ডনে যাবেন খালেদা জিয়া। সহায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপি সীমিত পর্যায়ে আন্দোলনেও যেতে পারে।
ওদিকে, নির্বাচন পদ্ধতি প্রশ্নে কোনো ধরনের ছাড় দিতে রাজি নয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তাই বিএনপির প্রস্তাবিত ‘সহায়ক সরকার’ পদ্ধতিকে পাত্তাই দিতে চায় না দলটি। তাদের বক্তব্য- নির্বাচন হবে নির্বাচন কমিশনের অধীনে। আর নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করবে শেখ হাসিনার সরকার। তাই শেখ হাসিনার সরকারই সহায়ক সরকারের ভূমিকা পালন করবে। এটাই সংবিধানের নিয়ম। আওয়ামী লীগ তাদের এ অবস্থানে শেষ পর্যন্ত অনড় থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। একই সঙ্গে বিএনপি যে সহায়ক সরকারের দাবি করে আসছে তা সংবিধানে রয়েছে বলে জানিয়েছে আওয়ামী লীগ। তাদের বক্তব্য বিএনপি অজ্ঞতার কারণে অথবা জনগণকে সহায়ক সরকার নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। এটা তাদের পরিকল্পিত পদক্ষেপ। আওয়ামী লীগ সংবিধানের বাইরে গিয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে না- নেবেও না। আগামী নির্বাচন পদ্ধতি প্রসঙ্গে দলটির শীর্ষ কয়েক নেতার সঙ্গে কথা বললে তারা এ অনড় অবস্থানের কথা তুলে ধরেন। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য রমেশ চন্দ্র সেন মানবজমিনকে বলেন, বিএনপি এখন যে সহায়ক সরকারের দাবি জানাচ্ছে, তা মানতে গেলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। সোজা কথা, বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী বিএনপিকে নির্বাচনে আসতে হবে। এক্ষেত্রে ছাড় দেয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তিনি বলেন, নির্বাচনে সব দলই আসতে পারে। তারপরও যদি কেউ নির্বাচনে আসতে না চায়- এটা তাদের সিদ্ধান্ত। এদিকে দলের অপর সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও ১৪ দলের সমন্বয়ক মোহাম্মদ নাসিম বলেন, অহেতুক মাঠ গরম করার জন্যই বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এ নিয়ে কথা বলছেন। এসব কথা কোনো কাজে আসবে না। নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ী সঠিক সময়েই হবে।
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল-আলম হানিফ মানবজমিনকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে বিএনপি আসলে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। তাদের লক্ষ্যটা কি তা নিয়েই তো জনমনে সন্দেহ রয়েছে। সরকারের বিরুদ্ধে নানান অসত্য তুলে ধরে জনগণকে বিভ্রান্ত করাই এখন বিএনপির মূল লক্ষ্য। তিনি বলেন, বিএনপি যে সহায়ক সরকারের কথা বলছে তাতো আমাদের সংবিধানেই রয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী, দেশের যেকোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে নির্বাচন কমিশনের অধীনে। নির্বাচনকালীন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তার মূল দায়িত্ব হচ্ছে নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করা। যেন অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় প্রশাসনিক ক্ষমতা থাকে নির্বাচন কমিশনের হাতে। সে অনুযায়ী ওই সময় বদলি বা রদবদল ইসি করে থাকে। ওইসময় সরকার তাদের রুটিন ওয়ার্ক করবে। এসব বিষয় সংবিধানে স্পষ্ট করা আছে। তাই এনিয়ে নতুন করে কথা বলার মানে হয় না। আসলে বিএনপি জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করতেই এসব কথা বলছে। আমি মনে করি এ নিয়ে নতুন করে আলোচনার কিছু নেই। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সংবিধানেই সবকিছু বাতলে দেয়া আছে। সংবিধান অনুসরণ করলেই আমরা সে পথে পৌঁছাতে পারবো।