নির্বাচনী হালচাল: রাজশাহী-২, বিএনপির একক প্রার্থী, বাদশাকে ছাড় দিতে নারাজ আওয়ামী লীগ

58

জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে নড়ে চড়ে বসেছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ রাজনৈতিক দলগুলো। ইতিমধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে সমর্থকরা মাঠে নেমে পড়েছেন। রাজশাহী-২ সদর আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে এককভাবে সাবেক এমপি তিনবারের মেয়র মিজানুর রহমান মিনুর অবস্থান অনড় রয়েছে। বর্তমানে মিজানুর রহমান মিনু বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টার দায়িত্বে আছেন। অন্যদিকে মহাজোট সরকারের টানা দুইবারের সংসদ সদস্য বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশার প্রার্থিতা নিশ্চিত হলেও ছাড় দিতে নারাজ স্থানীয় আওয়ামী লীগ। তাদের কথা দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ এই বিভাগীয় আসনে আওয়ামী লীগের জনপ্রতিনিধি না থাকায় শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এ শূন্যতা কাটাতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী চায় দলীয় নেতাকর্মীরা। এ চিন্তা মাথায় রেখে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী মাঠে নেমেছেন। অন্যান্য শরিক দল থেকেও প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। ২০০৮ সালে এই আসন থেকে আওয়ামী লীগ উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য প্রাক্তন রাবি উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল খালেককে প্রার্থী করা হলেও পরে জোটের প্রার্থী হিসেবে ওয়ার্কার্স পার্টির ফজলে হোসেন বাদশার নাম ঘোষণা করা হয়।
রাজশাহী সদর আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার, সিনিয়র সহ-সভাপতি শাহীন আক্তার রেনী ও সহ-সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মীর ইকবালের নাম শোনা যাচ্ছে। শরিক দলের মধ্যে জাসদ (বাদশা অংশ) জেলা সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার ইকবাল বাদল এবং সাম্যবাদী দল মহানগর সম্পাদক মাসুদ রানা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। এ ছাড়া আবারো আওয়ামী লীগ উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল খালেকের নাম এলেও অনাগ্রহের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘রাজশাহী সদর আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার কোনো আগ্রহ তার নেই। বলেন, জননেত্রী শেখ হাসিনা যাকে মনোনয়ন দিবেন তাকে জেতাতে আমরা সর্বোচ্চ শ্রম দিবো।’
মনোনয়ন প্রসঙ্গে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার মানবজমিনকে বলেন, দুইবার ওয়ার্কার্স পার্টির এমপি আছেন। এ সময়ের পুরোভাগে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বঞ্চিত হয়ে আসছেন। ক্ষমতায় থেকেও আমরা নেতাকর্মীদের জন্য কিছু করতে পারি নি। উন্নয়মূলককাজে আমাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায় নি। অথচ আওয়ামী লীগের ভোট অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি, এই ভোটকে কাজে লাগাতে তিনি সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থিতা চাইবেন।
তিনি আরো বলেন, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আমাদের নেতা এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ও সদর আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বিজয় হলে রাজশাহীর উন্নায়ন আরো বেগমান হবে। বিভাগীয় শহরের মধ্যে আন্দোলন-সংগ্রামে রাজশাহীর অবস্থান অগ্রগণ্য। এই আসনে ছাড় দেয়া দলের জন্য মঙ্গলকর হবে না।
সাম্যবাদী দলের মহানগর সম্পাদক মাসুদ রানা বলেন, ‘ইসি নিবন্ধিত দল হিসেবে সাম্যবাদী দল জোটভুক্তভাবে এবং জোটের বাইরে নির্বাচনে অংশ নিবে। স্বভাবতই আমার দলকে সংগঠিত করতে নির্বাচনে অংশ নিতে চাই। গত ১০ বছরে সদর আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশার সঙ্গে আপামর জনগণের কোনো যোগাযোগ নাই। তিনি নিজেকে শুধু এলিট শ্রেণির প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। ৯ বছর মেয়াদকালে ১৪ দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেন নি। কেউ কেউ নিজে থেকে এগিয়ে আসলেও মূল্যায়ন হয় নি। রাজশাহীতে অসংখ্য সংকট বিরাজমান। কিন্তু দৃশ্যমান সংকট সমাধানের জায়গায় তাকে আমরা দেখতে পাই নি।’
জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা খুব একটা আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। দীর্ঘদিন কোনো জনপ্রতিনিধি না থাকায় তারা সিটি নির্বাচনের দিকে ঝুঁকছেন। রাসিক নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনকে বিজয়ী করে আনাই মূললক্ষ্য। প্রতিদিনই কোনো না কোনো পাড়া-মহাল্লায় প্রচারণায় সময় কাটাচ্ছেন নেতাকর্মীরা। ভোটারদের মতে, সিটি নির্বাচনে কে নির্বাচিত হয়ে আসছেন তার উপর নির্ভর করবে এমপি প্রার্থীর জয়-পরাজয়।
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক প্যানেল মেয়র শরিফুল ইসলাম বাবু বলেন, ‘সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী নিয়ে দলীয় কোনো নির্দেশনা আসে নি। আমরা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীকে বিজয়ী করে আনতে মাঠে আছি। ওয়ার্কার্স পার্টির এমপি থাকায় উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে নেতাকর্মী অংশ নিতে পারেন নি। আবার অনেক উন্নয়ন কাজও হয়েছে। ক্ষোভ থাকবেই; তবে দল যাকে মনোনয়ন দিবে শেষ মুহূর্তে সবকিছু ভুলে তার জন্য সবাই কাজ করবে।’
এদিকে বিএনপির একক প্রার্থী হিসেবে মিজানুর রহমান মিনুর নাম আসার অনেকগুলো কারণকে চিহ্নিত করেছেন নেতাকর্মীরা। উন্নয়নের রূপকার হিসেবে মেয়র ও এমপি থাকাকালীন সময়ে টানা ১৭ বছরে আনাচে-কানাচে রাস্তাঘাট নির্মাণ ও সংস্কার, ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং-বিআইটিকে পূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় রাজশাহী প্রকৌশল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-রুয়েট প্রতিষ্ঠা, মহিলা পলেটিকনিক, নগরভবন (১৯৯৯), দৃষ্টিনন্দন রেলস্টেশন তৈরি, জনবান্ধব মেয়র হিসেবে কখনও সাধারণ জনগণ যেন ভোগান্তিতে না পড়ে সে বিষয়ে সচেতন ছিলেন। হোল্ডিংট্যাক্স বাড়াননি, সহনীয় রাখতে সচেষ্ট ছিলেন। ২০০২ সালে রাজশাহী মহানগরীকে মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় নিতে আনেন। সমাজে পতিতাদের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনতে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা দলীয় নেতাকর্মীদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ভোটের মাঠে বারবরই তাকে এগিয়ে রাখে।
মেয়েরের দায়িত্ব থাকা অবস্থায় অফিস সময়ের বাইরে সকাল ৭টা থেকে বাসায় নাগরিকদের সমস্যার কথা শুনতেন এবং সে অনুযায়ী কাজ করতেন। রিকশা নিয়ে বিকালে নগর পরিদর্শনে বের হতেন। বিভিন্ন পাড়া-মহাল্লা, ক্লাবে বসে জনসাধারণকে সময় দিতেন। তাকে সাইকেল চালিয়ে ঘুরে বেড়াতেও দেখেছেন অনেকে। এ ছাড়া বর্তমান মহানগর সভাপতি বর্তমান মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল এবং সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলন দু’জনেই তার আশীর্বাদপুষ্ট। তারা দু’জনেই মিজানুর রহমান মিনুকে এমপি হিসেবে নির্বাচিত করতে চান বলে জানিয়েছেন ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ওয়ালিউজ্জামান পরাগ।
মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলন বলেন, ‘সংসদ সদস্য ও তিন মেয়াদে ১৭ বছর মেয়র হিসাবে মিজানুর রহমান মিনু প্রচুর উন্নয়নমূলক কাজ করেন। আধুনিক রাজশাহীর রূপকার তিনি। বর্তমান সময়ে তিনি মাঠে আছেন। মনোনয়নের বিষয়ের হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।’ ৮৭ সাল থেকে মহানগর বিএনপির শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করছেন শফিকুল হক মিলন।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের প্রার্থিতা দাবি অন্তঃসারশূন্য ও অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত মন্তব্য করে মহানগর ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক দেবাশীষ প্রামাণিক দেবু মানবজমিনকে বলেন, ২০০৮ সালে আন্দোলন-সংগ্রামে রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশার ভূমিকার কারণে তাকে প্রার্থী করা হয়েছিল। তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে যেসব ভূমিকা রেখেছেন, অতীতে কোনো সংসদ সদস্য তা রাখতে পারেন নি। দৃশ্যমান উন্নয়নে রাজশাহীর অধিকারের দাবিগুলো জাতীয় সংসদে তুলে ধরেছেন। যা অত্র অঞ্চলের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৪ দলের প্রার্থী হিসেবে ফজলে হোসেন বাদশার ভূমিকা ছিলো-দলীয় এমপি না, জনসাধারণের এমপির।
মহানগর উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট এন্তাজুল হক বাবু বলেন, ‘সিটি নির্বাচনে এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের পরাজয়ে মানুষ মনে করেছিল রাজশাহীর উন্নয়ন মুখ থুবড়ে পড়বে। এমপি হিসেবে বাদশা ভাই নগরীর উন্নয়নের জন্য যে ভূমিকা নেয়-তা সকলের প্রশংসা কুড়িয়েছে।’