নির্বাচন কমিশনের রোডম্যাপে কী কী আছে

39

সংবিধান অনুযায়ী ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারির মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আর তাই এই সময়ের মধ্যে নির্বাচন করতে নিজেদের রোডম্যাপ (কর্মপরিকল্পনা) ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন।

আজ রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইটিআই ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আগামী দেড় বছরের কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম শামসুল হুদা।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, জনগণের প্রত্যাশার প্রতি গুরুত্ব রেখে সাংবিধানিকভাবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন সাতটি করণীয় বিষয় নির্ধারণ করে একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। এগুলো হলো :

১. আইনি কাঠামো পর্যালোচনা ও সংস্কার
২. নির্বাচন প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও যুগোপযোগী করার লক্ষে সংশ্লিষ্ট সবার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সবার পরামর্শ গ্রহণ
৩. সংসদীয় এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ
৪. নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রণয়ন এবং সরবরাহ
৫. বিধি-বিধান অনুসরণপূর্বক ভোটকেন্দ্র স্থাপন
৬. নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন ও নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের নিরীক্ষা
৭. সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট সবার সক্ষমতা বৃদ্ধির কার্যক্রম গ্রহণ

কীভাবে এসব কাজ করা হবে তার বিবরণও আজকের সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়।

আইনি কাঠামো পর্যালোচন ও সংস্কার :

নির্বাচন পরিচালনার জন্য ধাপে ধাপে একটি আইনি কাঠামো তৈরি করেছে নির্বাচন কমিশন। এর আগে কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক ও দাপ্তরিক সক্ষমতার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা হয়েছে। তবে পরিবেশ-পরিস্থিতি পরিবর্তনের ফলে বর্তমান আইন ও বিধিমালায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশোধনী আনা প্রয়োজন বলে মনে করছে নির্বাচন কমিশন। সে কারণে মূল আইনি কাঠামোর আওতায় ক্ষেত্র বিশেষে কিছু প্রয়োজনীয় ধারণা প্রবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হবে যাতে ভোট প্রক্রিয়া আরো অর্থবহ ও সহজতর হয়।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেসব আইন ও বিধি রয়েছে এবং যেগুলোর পর্যালোচনার সুপারিশ করা হয়েছে সেগুলো হলো :

(ক) গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (২০১৩ পর্যন্ত সংশোধিত)
(খ) নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা, ২০০৮ (সংশোধনীসহ)
(গ) the Delimitation of Constituencies Ordinance, 1976 (Ordinance No XV of 1976)
(ঘ) সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০০৮
(ঙ) রাজনৈতিক দল নিবন্ধন বিধিমালা, ২০০৮ (২০১২ পর্যন্ত সংশোধিত)
(চ) স্বতন্ত্র প্রার্থী (প্রার্থিতার পক্ষে সমর্থন যাচাই) বিধিমালা, ২০১১ (সংশোধিত)
(ছ) নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন, ১৯৯১
(জ) জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন আইন, ২০১০
(ঝ) ভোটার তালিকা আইন, ২০০৯
(ঞ) ভোটার তালিকা বিধিমালা ২০১২
(ট) প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় ভোটারপ্রতি নির্বাচনি ব্যয় নির্ধারণের প্রজ্ঞাপন
(ঠ) নির্বাচন পর্যবেক্ষণ নীতিমালা, ২০১০ (জুন, ২০১৭ পর্যন্ত সংশোধিত)
(ড) Guidelines for Foregin Election Observer, 2013
(ঢ) ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ নির্দেশাবলী

উপযুক্ত সংস্কারকাজে নির্দিষ্ট সময় অনুসরণ করবে নির্বাচন কমিশন।

পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতি মাসে আইনি কাঠামো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়গুলো চিহ্নিত করবে নির্বাচন ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ-১ ও আইন অনুবিভাগ।

এ বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর অব্দি কমিশনের নির্বাচন পরিচালনা, জনসংযোগ ও আইন অধিশাখা আইনি কাঠামো সংস্কারের লক্ষ্যে বিশেষজ্ঞ মতামত নেবে।

বছর শেষে অর্থাৎ ডিসেম্বর মাসে আইন সংস্কারের প্রাসঙ্গক খসড়া তৈরি করবে আইন অনুবিভাগ এবং নির্বাচনি সহায়তা ও সরবরাহ অধিশাখা। একই বিভাগ ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আইন প্রণয়নের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।

নির্বাচন প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও যুগোপযোগী করার লক্ষে সংশ্লিষ্ট সবার লক্ষে সংশ্লিষ্ট সবার পরামর্শ গ্রহণ :

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার শুরু থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা নির্বাচন প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত। যেহেতু তাঁরা নির্বাচনের জন্য প্রচলিত প্রক্রিয়াগুলো পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং এর ইতিবাচক-নেতিবাচক দিক সম্পর্কে অবগত সেকারণে নির্বাচন সংক্রান্ত যে কোনো আইনি কাঠামো ও প্রক্রিয়া প্রণয়ন বা সংস্কারে এদের সবার পরামর্শ থাকা উচিত বলে মনে করে কমিশন। সেলক্ষ্যে বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের সঙ্গে আলোচনায় বসবে নির্বাচন কমিশন। ঘোষিত রোডম্যাপে সেই সংলাপের তারিখও ঘোষণা করা হয়েছে।

চলতি বছরের ৩১ জুলাই সুশীল সমাজের সঙ্গে সংলাপে বসবে নির্বাচন কমিশন। এরপর আগস্ট মাসে গণমাধ্যমের সাথে, আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে, অক্টোবর মাসে নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা, নারী নেতা এবং নির্বাচন পরিচালনা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সংলাপ করা হবে। এরপর নভেম্বর মাসে এসব সংলাপ থেকে পাওয়া সুপারিশের প্রাথমিক খসড়া তৈরি করে ডিসেম্বর মাসেই সুপারিশ চূড়ান্ত করা হবে। আর সংলাপের পুরো প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব নির্বাচন সহায়তা ও সরবরাহ এবং জনসংযোগ অধিশাখার।

সংসদীয় এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ :

The Delimitation of Constituencies Ordinance, 1976 (Ordinance No. XV of 1976) অনুযায়ী প্রতিটি সাধারণ নির্বাচনের আগে সীমানা নির্ধারণ করা হয়। বর্তমান আইন অনুযায়ী বিগত আদমশুমারির জনসংখ্যার ভিত্তিতে এই সীমানা নির্ধারণ করা হয়। এ বিষয়ে প্রশাসনিক অখণ্ডতা ও যাতায়াত সুবিধার কথা অন্তর্ভুক্ত থাকলেও ভোটার সংখ্যা ও আইনের বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি।

এবার সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণের জন্য জুলাই থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত নির্বাচনি এলাকা পুনর্নির্ধারণের জন্য আগের নীতিমালা পর্যালোচনা করে একটি নতুন নীতিমালা তৈরি করবে নির্বাচন ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ-১ ও আইসিটি অনুবিভাগ। এরপর নির্বাচনি এলাকা পুননির্ধারণ করতে জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সিস্টেমস সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

অক্টোবর মাসে নীতিমালার আলোকে বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় ৩০০টি আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে খসড়া তালিকা তৈরি করা হবে। এরপর নভেম্বর মাসে এই খসড়া তালি প্রকাশ করে এ সম্পর্কে দাবি/আপত্তি বা সুপারিশ আহ্বান করা হবে।

এ ক্ষেত্রে কোনো আপত্তি আসলে নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে আপত্তির বিষয়ে অঞ্চলভিত্তিক শুনানি করে এসবের নিষ্পত্তি করা হবে। সবশেষে ডিসেম্বর মাসে ৩০০ আসনের সীমানা চূড়ান্ত করে গেজেট প্রকাশ করা হবে।

ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও বিতরণ :

যেহেতু ১৮ বছর বয়স হলেই একজন নাগরিক ভোটার হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন সেহেতু প্রতিবছর মোট ভোটারের প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ নতুন ভোটার প্রতি বছর ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। আবার কোনো ভোটারের মৃত্যু বা ঠিকানা পরিবর্তনের কারণেও একটি এলাকার ভোটার তালিকায় পরিবর্তন আসে। সে কারণে নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা প্রয়োজন হয়।

এ লক্ষ্যে এবার ২৫ জুলাই থেকে ৯ আগস্ট পর্যন্ত বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার তালিকা হালনাগাদের জন্য তথ্য সংগ্রহ করবে নির্বাচন ব্যবস্থাপনা-২ অনুশাখা ও জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অনুবিভাগ। এরপর ৩১ ডিসেম্বর সংগৃহীত তথ্য ডাটাবেইজে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

২০১৮ সালের ২ জানুয়ারি খসড়া ভোটার তালিকা প্রণয়ন করা হবে। এরপর ২-১৫ জানুয়ারি খসড়া ভোটার তালিকার ওপর সংশোদনকারী কর্তৃপক্ষের দাবি আপত্তি নেওয়া হবে। ১৬ থেকে ২০ জানুয়ারি এসব দাবি আপত্তির নিষ্পত্তি করা হবে। ২১ থেকে ৩০ জানুয়ারি চূড়ান্ত তথ্য ডাটা বেইজে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

এরপর ২০১৮ সালের  ৩১ জানুয়ারি হালনাগাদ করা চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে। ওই বছরের জুন মাস থেকে ৩০০টি নির্বাচনি এলাকার জন্য ভোটার তালিকা মুদ্রণ, ছবিসহ ও ছবিছাড়া ভোটার তালিকার সিডি তৈরি করে তা বিতরণ করা হবে।

ভোটকেন্দ্র স্থাপন :

নির্বাচন অনুষ্ঠানের অপরিহার্য বিষয় ভোটকেন্দ্র স্থাপন। ৩০০ আসনে নির্বাচনের জন্য সারাদেশে প্রায় ৪০ হাজার ভোটকেন্দ্র প্রয়োজন  হয়। সাধারণত স্থানীয় পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি, আধা সরকারি, স্বাত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, কমিউনিটি সেন্টার, আশ্রয়কেন্দ্রসহ বিভিন্ন স্থানে ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হয়।

আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে ২০১৮ সালের জুন মাসে সারাদেশে সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্র চিহ্নিত করে সেখানে সব সুবিধা আছে কি না তা খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হবে। জুলাই মাস নাগান নির্বাচনী এলাকাভিত্তিক ভোটকেন্দ্রের খসড়া তালিকা প্রকাশ এবং তা রাজনৈতিক দলের স্থানীয় দপ্তরে পাঠানো হবে।

এসব ভোটকেন্দ্রের ওপর কারো কোনো দাবি বা আপত্তি থাকলে আগস্ট মাসে সেগুলো শুনে নিষ্পত্তি করা হবে। এরপর ভোটের তারিখ নির্ধারণ হলে নির্দিষ্ট দিনের ২৫ দিন আগে কমিশনের অনুমোদন নিয়ে ভোটকেন্ত্রের গেজেট প্রকাশ করবে নির্বাচনি সহায়তা ও সরবরাহ অধিশাখা। তফসিল ঘোসণার পর গেজেটে প্রকাশিত ভোটকেন্দ্রের তালিকা সব নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের কাছে পাঠানো হবে।

নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন এবং নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের নিরীক্ষা :

এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৪০টি। এসব দল বিধি-বিধান অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে কি না তা দেখার আইনানুগ দায় নির্বাচন কমিশনের। এছাড়া নতুন কিছু দল নিবন্ধনের আগ্রহ দেখিয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে এসব দলের নিবন্ধনের যোগ্যতা আছে কি না তা খতিয়ে দেখবে কমিশন।

এ উদ্দেশে চলতি বছরের অক্টোবর মানে নিবন্ধন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন শর্ত প্রতিপালন সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করবে নির্বাচন ব্যবস্থাপনা অনু বিভাগ-১। এরপর ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে এসব তথ্য পর্যালোচনা করে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বহাল সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

অন্যদিকে এ বছরের অক্টোবর মানে নতুন রাজনৈতিক দলগুলোকে নিবন্ধনের জন্য আবেদন আহ্বান করা হবে। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এসব আবেদন যাচাই বাছাই করে নিবন্ধন দেওয়া হবে। মার্চ মাসে নতুন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে।

সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট সবার সক্ষমতা বৃদ্ধির কার্যক্রম :

সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে সারা দেশে কর্মরত নির্বাচন কমিশনের তিন হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নানা ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। যাতে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট এসব কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্বাচনে তাঁদের যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

এ লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের কর্মীদের সারা বছরের বিভিন্ন কাজের তালিকাও আজ কর্মপরিকল্পনায় প্রকাশ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি যেমন আছে, তেমনি আছে ভোট গ্রহণের আগে সাধারণ ভোটার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সামরিক বেসামরিক বিভিন্ন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় কর্মসূচিও।