নি র্বা চ নী হা ল চা ল যশোর ২ দেড় ডজন প্রার্থী মাঠে

36

নির্বাচনের উত্তপ্ত হাওয়া বইছে যশোর-২ আসনে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা নানা কর্মসূচি নিয়ে হাজির হচ্ছেন ভোটারদের কাছে। চলছে গণসংযোগ। বেড়েছে দলীয় নেতাকর্মীদের কদর। পুরনোদের পাশাপাশি মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন বেশ কিছু নতুন মুখ। চলছে পোস্টারিং আর ফেসবুকের মাধ্যমে প্রচার প্রপাগান্ডা। চায়ের স্টল গুলোতে নির্বাচনী আলাপ আলোচনায় উঠছে ঝড়। সব কিছু ছাপিয়ে দেশের পশ্চিমাঞ্চলের এই সীমান্তবর্তী নির্বাচনী এলাকার প্রধান সমস্যা মাদক, সন্ত্রাস, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, দুর্নীতি আর দলীয়করণের মতো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠছে।
চৌগাছা ও ঝিকরগাছা উপজেলার ২২টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভা নিয়ে জাতীয় সংসদের ৮৬ যশোর-২ নির্বাচনী এলাকা গঠিত। এখানকার মোট ভোটার ৩ লাখ ৯১ হাজার ৬৫২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ১ লাখ ৯৪ হাজার ৬৫২ জন। আর নারী ভোটারের সংখ্যা ১ লাখ ৯৭ হাজার। জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, চৌগাছা উপজেলায় মোট ভোটার ১ লাখ ৭০ হাজার ১২৭ । এর মধ্যে ৮৫ হাজার ৩০৮ জন পুরুষ ও ৮৪ হাজার ৮১৯ জন নারী ভোটার। অপরদিকে ঝিকরগাছা উপজেলার মোট ভোটার ২ লাখ ২১ হাজার ৫২৫ জন। এর মধ্যে ১ লাখ ৯ হাজার ৩৪৪ জন পুরুষ ও ১ লাখ ১২ হাজার ১৮১ জন নারী ভোটার। এ আসনটির দাবিদার আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমান ভাবে করে। বিগত ৪টি সংসদ নির্বাচনের ফলাফল পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় ১৯৯০ ও ৯৬ সালের নির্বাচনে এই আসন থেকে পর পর দু’বার এমপি নির্বাচিত হন সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম। ২০০১ সালের নির্বাচনে এই আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন বিএনপি জোটের প্রার্থী জামায়াত নেতা মাওলানা আবু সাঈদ। ২০০৮ নির্বাচনে এই আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন সাবেক আইসিটি মন্ত্রী মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদ। সর্বশেষ ২০১৪ সালের নির্বাচনে এই আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট মনিরুল ইসলাম। এ তো গেল জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চালচিত্র। অপরদিকে স্থানীয় সরকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা পূর্ণ নির্বাচনে এই দুই উপজেলার ২২টি ইউনিয়নের ১৬টিতে বিএনপি, ৪টিতে আওয়ামী লীগ ও ২টিতে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীরা জয় লাভ করেন। বিগত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে এই দুটি উপজেলার মধ্যে চৌগাছায় আওয়ামী লীগ ও ঝিকরগাছায় বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী জয় লাভ করেন। পৌর নির্বাচনেও এই দুটি উপজেলার একটিতে বিএনপি ও অন্যটিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়লাভ করেন। যে কারণে এই সংসদীয় আসনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের রয়েছে শক্ত অবস্থান।
আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে এমন প্রত্যাশায় দুই দলের প্রায় দেড় ডজন নেতা সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মাঠ কাঁপাচ্ছেন। নির্বাচন এখনো পুরোপুরি জমে না উঠলেও সম্ভাব্য প্রার্থীরা শুভেচ্ছা বিনিময়, পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুনের মাধ্যমে তাদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন। প্রস্তুতি নিচ্ছেন দলীয় মনোনয়ন প্রাপ্তি কিভাবে নিশ্চিত করা যায় তার। পাশাপাশি এলাকায় জনসংযোগের মাধ্যমে প্রার্থীরা নিজেদের তুলে ধরার চেষ্টা করছেন ভোটারদের কাছে।
এই আসন থেকে বিএনপির টিকিট প্রত্যাশা করছেন কমপক্ষে হাফ ডজন প্রার্থী। এর মধ্যে রয়েছেন জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও যশোর চেম্বারের সাবেক সভাপতি আলহাজ মিজানুর রহমান খান। তিনি নির্বাচনকে সামনে রেখে জনসংযোগ অব্যাহত রেখেছেন। ইতিমধ্যে তিনি এই দুই উপজেলার ২২টি ইউনিয়নে তার নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে নির্বাচনী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। সরকারবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি একাধিক মামলার আসামি হয়েছেন। জেলও খেটেছেন। সরকার বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। অপরদিকে দলের স্থায়ী কমিটির অন্যতম সিনিয়র সদস্য সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলামের অত্যন্ত বিশ্বস্তসহচর ও আস্থাভাজন মিজানুর রহমান খানের রাজনীতির হাতেখড়ি ছাত্রদল থেকে।
এছাড়া ঝিকরগাছা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাবিরা নাজমুল মুন্নি আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন লাভের চেষ্টা করছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি তার স্বামী প্রয়াত নাজমুল ইসলামের ইমেজকে কাজে লাগাতে চেষ্টা করছেন। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নাজমুল ইসলাম ছিলেন জেলা বিএনপি কোষাধ্যক্ষ ও ঝিকরগাছা বিএনপির সভাপতি। কয়েক বছর আগে ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে তিনি অপহরণের পর খুন হন। ইতিমধ্যে সাবিরা মুন্নি স্বামীর অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে নেতাকর্মীদের কাছে ছুটছেন।
অপরদিকে চৌগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান জহুরুল ইসলাম আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন চাইবেন। সাবেক এই ছাত্র নেতা ইতিমধ্যে নিজেকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দিয়ে চৌগাছায় কর্মকাণ্ড শুরু করেছেন বলে জানা গেছে।
এছাড়া বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট কাজী মুনিরুল হুদা ও অ্যাড. মোহাম্মদ ইসহ্‌াক এই আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন চাইবেন বলে মাঠে প্রচার আছে। অপরদিকে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জোটের প্রার্থী হিসেবে জয় লাভকারী সাবেক সংসদ সদস্য জামায়াত নেতা অধ্যাপক আবু সাঈদ আগামী নির্বাচনে মাঠে থাকবেন কিনা সে বিষয়ে পরিষ্কার করে কিছু জানা যাচ্ছে না। তিনি দীর্ঘ দিন আত্মগোপনে রয়েছেন।
অপরদিকে আওয়ামী লীগের ৮ জন সম্ভাব্য প্রার্থী এখনো পর্যন্ত মাঠে আছেন। তারা হলেন- সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম। যিনি এলাকায় আওয়ামী লীগের পরিচিত মুখ হিসেবে ভোটারদের কাছে চিহ্নিত। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এলাকার উন্নয়নে রফিকুল ইসলাম বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন। কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির অভিযোগে রফিকুল ইসলাম রাজনীতির মাঠ থেকে সটকে পড়েন ২০০৮ সালের নির্বাচনে। ওয়ান ইলেভেন সরকারের আমলে বিতর্কিত ভূমিকার কারণে তিনি দলীয় মনোনয়ন লাভে ব্যর্থ হন। এর পর থেকে দৃশ্যত রাজনীতির মাঠে রফিকুল ইসলাম অনুপস্থিত। সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনেও তিনি দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশা করে ব্যর্থ হন। ফলে ওই নির্বাচনে তিনি নৌকা প্রতীককে চ্যালেঞ্জ করে নির্বাচনী ময়দানে লড়াইয়ে নামেন। কিন্তিু শেষ পর্যন্ত তিনি দলীয় প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম দলীয় মনোনয়ন লাভের চেষ্টা করছেন বলে তার ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে।
অপরদিকে ২০১৪ সালের নির্বাচনে অ্যাড. মনিরুল ইসলাম প্রথম বারের মতো এমপি নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে তাকে চ্যালেঞ্জ করেন দলের প্রবীণ নেতা সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম। কিন্তু নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে আদালতে মামলা হওয়ায় নির্বাচিত হয়েও প্রায় ৪ মাস শপথ নিতে ব্যর্থ হন মনিরুল ইসলাম। পরে আদালতের রায় পক্ষে যাওয়ায় তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। বিগত পৌরসভা নির্বাচনে তিনি চৌগাছা উপজেলা আওয়ামী লীগের সঙ্গে প্রকাশ্যে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। উপজেলা চেয়ারম্যান এসএম হাবিব পক্ষীয়রা এমপি মনিরের আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে প্রকাশ্য তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। একই ভাবে ঝিকরগাছা উপজেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এমপি মনিরের কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে নিজ এলাকায় অবাঞ্ছিতও ঘোষণা করেন। তবে শেষ পর্যন্ত সব বাধা অতিক্রম করে এমপি মনিরুল ইসলাম দ্বিতীয় দফায় চৌগাছা ঝিকরগাছা আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন পাবেন এমনটাই মনে করছেন তিনি ও তার কর্মী-সমর্থকরা।
এদিকে আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন লাভের জন্য মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ডা. মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন। একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা ডাক্তার নাসির ইতিমধ্যে চৌগাছা ও ঝিকরগাছা এলাকায় তার সরব উপস্থিতি জানান দিতে নানা কর্মসূচি পালন করছেন। জনসংযোগের পাশাপাশি তিনি ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, বিনামূল্যে দুস্থ গরিব রোগীদের মধ্যে ওষুধ বিতরণ, খাদ্য বিতরণ, ঈদ সামগ্রী বিতরণসহ নানামুখী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ভোটারদের হৃদয় জয় করার চেষ্টা করছেন। কায়েকোলার যুবলীগ নেতা আজিজুর রহমান জানান, ডাক্তার নাসিরের রাজনীতিতে আগমন আওয়ামী লীগের বঞ্চিত নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রাণের সঞ্চার করেছে।
চৌগাছা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক উপজেলা চেয়ারম্যান এসএম হাবিব, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আলী রায়হান, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক কোষাধ্যক্ষ ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ হারুন অর রশীদ, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আহসানুল হক ও জেলা যুব মহিলা লীগের সভানেত্রী মঞ্জুন্নাহার নাজনীন সোনালী আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন লাভের চেষ্টা করছেন। এসব প্রার্থী নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় পোস্টারিং, লিফলেট বিতরণ, ফেস্টুন ও ব্যানার ঝুলিয়ে নিজেদের আগমন জানান দিচ্ছেন। এ প্রসঙ্গে অ্যাডভোকেট আলী রায়হান বলেন, বিগত দিনে এই নির্বাচনী এলাকা থেকে যারা নৌকার টিকিট পেয়েছিলেন তারা ভোটারদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে তারা শতভাগ ব্যর্থ হয়েছেন। স্বেচ্ছাচারিতা আর দুর্নীতির মাধ্যমে এসব জনপ্রতিনিধিরা টাকার পাহাড় গড়ে তুলেছেন। তাদের কর্মকাণ্ডে দলের ইমেজ ড্যামেজ হয়েছে। জনগণ আওয়ামী লীগ ও নৌকার ওপর থেকে তাদের আস্থা তুলে নিতে শুরু করেছেন। এই অবস্থায় দলের প্রতি, দলের নেতাকর্মীদের প্রতি সর্বোপরি ভোটারদের প্রতি যাদের আস্থা আছে এমন একজনকে আগামী নির্বাচনে দলের টিকিট দিলে বিজয় ধরে রাখা সম্ভব হবে। যুব মহিলা লীগের সভানেত্রী সাবেক জনপ্রতিনিধি মঞ্জুন্নাহার নাজনীন সোনালী। তিনি মনে করেন বিগত দিনে যারা নৌকার হাল ধরেছিলেন তারা গন্তব্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছেন। নৌকার কাণ্ডারি হিসেবে তারা নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারেননি। তারা জনগণের প্রত্যাশা পূরণে যেমন ব্যর্থ হয়েছেন তেমনি এলাকার উন্নয়ন হয়েছে বাধা গ্রস্ত। সোনালী বলেন, আপনারা জানেন চৌগাছা ঝিকরগাছা এলাকায় নৌকার টিকিট প্রত্যাশী প্রায় এক ডজন নেতার মধ্যে আমিই একমাত্র নারী। ফলে এই আসনে আমাকে মনোনয়ন দিলে অন্যান্য ভাইয়েরা তা মেনে নিয়ে বোনের পক্ষে কাজ করবেন বলে আমার বিশ্বাস। একই ধরনের স্বপনের কথা শোনান চৌগাছা উপজেলার চেয়ারম্যান এসএম হাবিব, অ্যাডভোকেট আহসান হাবিবসহ মনোনয়ন প্রত্যাশী অন্য প্রার্থীরা।
এছাড়া ন্যাপ নেতা বিশিষ্ট আইনজীবী এনামুল হক আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসন থেকে লড়বেন বলে তার কর্মী-সমর্থকরা দাবি করেছেন।