প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ ‘সাজানো রূপকথার গল্প’

28

পদত্যাগে বাধ্য করতেই সরকার প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে বলে মনে করে বিএনপি। প্রধান বিচারপতির অভিযোগগুলোকে ‘সাজানো রূপকথার গল্প’ বলে আখ্যায়িত করেছে তারা। প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে আপিল বিভাগের বিচারপতিদের সঙ্গে প্রেসিডেন্টের বৈঠককেই সংবিধান লঙ্ঘন বলে অভিযোগ তুলেছে দলটি। সেই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলসহ ১০ কর্মকর্তাকে বদলির আদেশ সংক্রান্ত আইন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন জারিকে বেআইনি বলে দাবি করেছে বিএনপি। দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ বলেছেন, প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো একেবারে পাতালপুরী থেকে নিয়ে আসা রূপকথার গল্প ছাড়া অন্যকিছু নয়। জনগণ বিশ্বাস করে, জালিয়াতির মাধ্যমে জোর করে সন্ত্রাসী কায়দায় তাকে ছুটিতে পাঠানোর মাধ্যমে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। এখন পদত্যাগ করানোর চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতেই এসব অভিযোগ তোলা হয়েছে। গতকাল দলের নয়া পল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। রিজভী বলেন, এটা একেবারে সুস্পষ্ট যে, প্রধান বিচারপতিকে ঘায়েল করার জন্য তার বিবৃতি, তার বক্তব্য, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে তার পর্যবেক্ষণে সরকার নানাভাবে মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছে। এই কারণেই তাকে একের পর এক বানোয়াট আক্রমণ শুরু করেছে সরকার। বিএনপির মুখপাত্র প্রশ্ন তোলে বলেন, প্রেসিডেন্টের কাছে যদি প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে এতো অভিযোগ থাকে তাহলে তিনি সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ করলেন না কেন? এই প্রশ্ন এখন আইন অঙ্গনে ঘুরপাক খাচ্ছে। রিজভী বলেন, সরকার সংবিধানের কায়দায় কাজ করছেন না, তারা কাজ করছেন মুকীম গাজীর কায়দায়। ডাকাতরা যেমন কেড়ে নেয়, মেরে ফেলে, সন্ত্রাসীরা যেমন অন্যের জমি দখল করে নেয় ঠিক হুবহু রকম ডাকাতের বৈশিষ্ট্য ধারণ করেছে এই সরকার। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব বলেন, সুপ্রিম কোর্টের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে- প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে আপিল বিভাগের অন্যান্য বিচারপতিকে ডেকে নিয়ে প্রেসিডেন্ট বৈঠক করেছেন এবং তাদের বুঝিয়েছেন। দেশের সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা সংবিধানে নেই। প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে অন্য বিচারপতিদের নিয়ে বৈঠক করে প্রেসিডেন্ট সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। সংবিধানের নিয়ম হলো প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলে অভিযোগগুলো প্রেসিডেন্ট সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে তদন্তের জন্য পাঠাবেন। প্রেসিডেন্ট এই ধরনের ব্যবস্থা না দিয়ে কেন আপিল বিভাগের অন্য বিচারকদের নিয়ে বৈঠক করে তাদের অভিযোগ শুনালেন এটা মানুষের বুঝতে বাকি নেই। রিজভী বলেন, প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে এত অভিযোগ থাকলে তা পুরনো অভিযোগ। তাহলে এতদিন এসব অভিযোগ দিলেন না কেন? যখন প্রধান বিচারপতি বিচারিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন, নানা রায় দিচ্ছেন তখন তো এসব অভিযোগ সরকার তুলেনি। যখন ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে সরকার ক্ষুব্ধ হয়েছেন তখনই প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে একের পর এক ধারাবাহিকভাবে আক্রমণের পালা শুরু হতে দেখতে পেলাম। তার মানে এই সরকার কত বড় অনৈতিক তাদের স্বার্থ আদায় হলে যতই অভিযোগ থাক, সেই অভিযোগ পাতালের মধ্যে একেবারে অতল পাতালে ঢেকে রাখা হয়। তিনি বলেন, কারও বিরুদ্ধে যদি অভিযোগ না-ও থাকে, যদি স্বচ্ছ মানুষ হয়ে থাকেন আর তিনি এই সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলেন তাহলে সরকার তার বিরুদ্ধে পাতাল থেকে নানা অভিযোগ তুলে আনবে। একেবারে লিথোস্ক্রিয়া থেকে তুলে নিয়ে আসবে। রিজভী বলেন, আইনমন্ত্রী একটা বিবৃতি দিলেন প্রধান বিচারপতি ক্যানসার রোগে ভুগছেন। এ কারণে তিনি ছুটি চেয়েছেন। কিন্তু প্রধান বিচারপতি নিজেই অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের বলেছেন, আমি সম্পূর্ণভাবে সুস্থ। তাহলে কত বড় মিথ্যাচার করেছেন আইনমন্ত্রী। প্রধান বিচারপতিকে জোর করে দেশ থেকে বিতাড়নের জন্য আইনমন্ত্রী কী অবলীলায় মিথ্যা কথা বললেন! প্রধান বিচারপতি যাওয়ার সময় যে বিবৃতি দিয়ে গেলেন তাতে তো এ সরকারের মুখে চুনকালি পড়ার কথা। তারপরও এরা নির্লজ্জের মতো বিবৃতি দিচ্ছেন, বেপরোয়া কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন। রিজভী বলেন, আইন মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সুুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলসহ উচ্চ আদালতের প্রশাসনে ব্যাপক রদবদল করা হয়েছে। এটা নজিরবিহীন ঘটনা। প্রধান বিচারপতি অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার আগে বলেছিলেন, সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনের রদবদল শুধুমাত্র প্রধান বিচারপতির এখতিয়ার। তাহলে প্রধান বিচারপতির বক্তব্য অনুযায়ী আইন মন্ত্রণালয়ের বদলির প্রজ্ঞাপনও বেআইনি। এটা আইন মন্ত্রণালয় করতে পারে না। কিন্তু তাদের তো এসব যায় আসে না। কারণ তারা বেপরোয়া জমিদারির রাজত্ব কায়েম করেছে। তারা এখন সংবিধান, আইন, বিচারিক প্রক্রিয়া- এসব থোড়াই কেয়ার করে। রিজভী বলেন, এখন আদালত প্রাঙ্গণে যা ঘটছে তা হচ্ছে সরকার প্রধানের একক কর্তৃত্বে বিচার বিভাগকে অধীন করার জন্য যাবতীয় আয়োজন। প্রধানমন্ত্রী অদ্বিতীয় স্বৈরাচার হওয়ার পথে সকল কাঁটা সরাতে এতসব নির্লজ্জ দুর্বৃত্তপনা। বিএনপির সিনিয়র এ নেতা বলেন, বাংলাদেশে বেআইনি কর্মকাণ্ডরত অতি ক্ষমতাধররা এখন ধরাছোঁয়ার বাইরে। ওদের কে ধরবে? ওদের কে গ্রেপ্তার করবে? এত অন্যায়, এত বেআইনি কর্মকাণ্ড, এত নীতি লঙ্ঘন করছে এই সরকার। কারণ জনগণের টাকায় যে বন্দুক, তার নিয়ন্ত্রণ তো তাদের হাতে। এই বন্দুক তো আর বিচার বিভাগের হাতে নেই। এই বন্দুক তো অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের হাতে নেই। এই বন্দুকটা নিয়ন্ত্রণ করছে সরকার। তিনি বলেন, দলীয় সংকীর্ণতার বদ্ধকূপে তারা মণ্ডুকনীতি গ্রহণ করে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটিকে মৌরসীপাট্টা করে নিজেদের জমিদারিতে পরিণত করেছেন। তবে এই জমিদারি উচ্ছেদের জন্য জনগণ এখন সংঘবদ্ধ। জনগণের ধূমায়িত বহ্নির উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছে।
নেতাকর্মীদের মুক্তি দাবি
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির প্রতিবাদে কেন্দ্র ঘোষিত বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনকালে বিএনপির সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক দীপেন দেওয়ান, ঢাকা মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা শামীম আহমেদ, রাজু ও রাজেশ, ছাত্রদল কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক আনিসুর রহমান রানা, তিতুমীর কলেজ ছাত্রদল নেতা শাহনুর সিফাত, ঢাকা মহানগর পূর্ব ছাত্রদল নেতা তুহিন চৌধুরী, বরিশাল জেলা স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা ও কাউন্সিলর মীর জাহিদুল কবির জাহিদ, মাহবুবুর রহমান পিন্টু, গাইবান্ধা জেলা বিএনপি নেতা আবদুর রহিম মণ্ডল, শফিউজ্জামান শফি, জেলা ছাত্রদল নেতা জাকির হোসেন, আল-পারভেজ শাহীন, ফরিদপুর জেলা ছাত্রদল নেতা তানজিবুল হাসান কায়েসকেসহ অন্তত ৫০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অন্যদিকে যুবদল সভাপতি সাইফুল আলম নীরব, সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাহ উদ্দিন টুকু, স্বেচ্ছাসেবক দল সভাপতি শফিউল বারী বাবু, সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল, যুবদল ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি রফিকুল আলম মজনু, স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ইয়াছিন আলী, বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরীসহ রাজশাহী, বগুড়া, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলায় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের প্রায় তিন শতাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। অবিলম্বে গ্রেপ্তারকৃত নেতাকর্মীদের মুক্তি ও তাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানান রিজভী আহমেদ। সংবাদ সম্মেলনে দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, হাবিব উন নবী খান, কেন্দ্রীয় নেতা মুনির হোসেন, কাজী আবুল বাশার, রফিকুল ইসলাম রাসেল ও সাইফুল ইসলাম পটু উপস্থিত ছিলেন।

 

 

 

 

 

সূত্র : মানবজমিন অনলাইন পত্রিকা