বিবিসি’র প্রতিবেদন গরু থেকে উড়োজাহাজ- বিজ্ঞানের ইতিহাস পাল্টে দিচ্ছেন ভারতীয় মন্ত্রীরা

54

বৈজ্ঞানিক বিভিন্ন আবিষ্কার ও এ সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠিত তত্ত্বের তোয়াক্কা না করে একের পর এক বিতর্কিত, আজগুবি মন্তব্য করে চলেছে ভারতের মন্ত্রীরা। তারা বিজ্ঞানের ওপর প্রাচীন ধর্মবিশ্বাসকে প্রাধান্য দেয়ার চেষ্টা করছেন। তাদের ভাষ্যমতে, আধুনিক বিজ্ঞানের অনেক আবিষ্কারই প্রাচীন ভারতে ছিল। সম্প্রতি এ ধরনের মন্তব্য করে আলোচনায় এসেছেন ভারতের তরুণ শিক্ষামন্ত্রী সত্যপাল সিং। তিনি বলেছেন, উড়োজাহাজের কথা প্রাচীন হিন্দু মহাকাব্য রামায়নে সর্বপ্রথম বলা হয়েছিল। তাই প্রাচীন ভারতের এ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের বিষয়ে ছাত্রদেরকে শিক্ষা দেয়া উচিত। গত বুধবার রাজধানী দিল্লিতে এক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি। এ খবর দিয়েছে বিবিসি। সত্যপাল সিংয়ের বক্তব্য অনুসারে, প্রথম কার্যকরী উড়োজাহাজ আবিষ্কার করেছেন শিবাঙ্কর বাবুজি তালপাদি নামক একজন ভারতীয়। রাইটস ভ্রাতৃদ্বয়ের আকাশে ওড়ার কৌশল বাস্তবায়নের আট বছর আগেই উড়োজাহাজ আবিষ্কার করেন শিবাঙ্কর। কিন্তু তার এ অর্জন অস্বীকৃতই থেকে গেছে। শিক্ষামন্ত্রীর এসব ভিত্তিহীন বিতর্কিত মন্তব্য নিয়ে আলোচনার ঝড় উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত সত্যের বিরুদ্ধে কথা বলায় তীব্র নিন্দা ও সমালোচনার মুখে পড়েছেন এ মন্ত্রী। তবে এমন অমূলক মন্তব্য করার ক্ষেত্রে তিনিই প্রথম ভারতীয় নন। এর আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ
ব্যক্তি বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ের ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ২০১৫ সালে বিজ্ঞান সম্মেলনে একজন বক্তা বলেন, ৭ হাজার বছর আগে ঋষি ভারদওয়াজা উড়োজাহাজ আবিষ্কার করেন। এ ধরনের অলীক বক্তব্য দেয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই উড়োজাহাজের চালকরাও। ভারতের পাইলট প্রশিক্ষণ কর্মসূচির প্রধান ও অবসরপ্রাপ্ত পাইলট ক্যাপ্টেন আনন্দ বোস দাবি করেছেন, কয়েক হাজার বছর আগে ভারতের আন্তঃগ্রহ যোগাযোগে সক্ষম উড়োজাহাজ ছিল। এছাড়া বর্তমান যুগের থেকেও উন্নত ও বেশি কার্যক্ষম রাডার ব্যবস্থা ছিল তখন। এ ধরনের বিতর্কিত মন্তব্যকারী ব্যক্তিদের তালিকায় রয়েছেন ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও। তিনি ২০১৪ সালে ডাক্তার ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের এক সম্মেলনে বলেন, হিন্দু দেবতা গণেশের কাহিনী থেকে বোঝা যায় যে, প্রাচীন ভারতেও ‘কসমেটিক সার্জারি’ ছিল। তিনি বলেন, আমরা দেবতা গণেশের পূজা করি। সে সময় অবশ্যই এমন কোনো প্লাস্টিক সার্জন ছিলেন যিনি একজন মানুষের শরীরে হাতির মাথা প্রতিস্থাপন করেছেন। এখান থেকেই ‘প্লাস্টিক সার্জারি’ পদ্ধতির উদ্ভব হয়। হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, শিশুর শরীরে প্রভু শিব একটি হাতির মাথা স্থাপন করলে গণেশের জন্ম হয়। এদিকে, গত মাসে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী বিজয় রুপানি এক বক্তৃতায় দেবতা রামের প্রকৌশল বুদ্ধির প্রশংসা করেছেন। রাম হিন্দুদের জনপ্রিয় দেবতা। হিন্দুদের ধর্মীয় গ্রন্থ রামায়ণের তথ্য অনুযায়ী, স্ত্রী সীতাকে উদ্ধার করার জন্য দেবতা রাম ভারত ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে একটি সংযোগ সেতু নির্মাণ করেন। ভারত ও শ্রীলঙ্কার মধ্যবর্তী পাল্ক প্রণালী থেকে বোঝা যায় যে, এক সময় দুই দেশের মধ্যে সংযোগ ছিল। রুপানি বলেন, চিন্তা করেন প্রভু রাম কি ধরনের প্রকৌশলী ছিলেন যে ভারত ও শ্রীলঙ্কাকে যুক্ত করেছিলেন। এছাড়া জানুয়ারি মাসে রাজস্থানের শিক্ষামন্ত্রী বসুদেব দেবানি বলেন, গরুর বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য বোঝা জরুরি। কেননা, পৃথিবীতে গরুই একমাত্র প্রাণী যা অক্সিজেন গ্রহণ ও ত্যাগ করে। তবে তার এমন মন্তব্য সমর্থন করে তিনি কোনো গবেষণার কথা উল্লেখ করেননি যাতে প্রমাণিত হয় যে গরু কার্বন ডাই অক্সাইড ত্যাগ করে। সংবাদ মাধ্যমে তার এ মন্তব্য প্রকাশিত হলে তিনি ব্যাপকভাবে সমালোচিত হন। দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের থেকে এ ধরনের বিতর্কিত মন্তব্য করার ঘটনা একের পর এক ঘটেই চলেছে। বিতর্কিত মন্তব্যকারীরা দেশজুড়ে সমালোচিত হলেও কমছে না এ ধরনের বক্তব্য দেয়ার প্রবণতা।

 

 

 

 

 

 

সূত্র : মানবজমিন অনলাইন পত্রিকা