বিশ্বনেতাদের সামনে মস্করা করলেন মিয়ানমারের ভাইস প্রেসিডেন্ট

26

জাতিসংঘে বিশ্বনেতাদের সামনে যেন মস্করা করলেন মিয়ানমারের ভাইস প্রেসিডেন্ট হেনরি ভ্যান থিও। তিনি বললেন, কি কারণে এত মানুষ দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন তার কারণ পরিষ্কার নয় তার কাছে। তিনি আরো বলেছেন, বেশির ভাগ মুসলিমই (রোহিঙ্গা) তো দেশে রয়ে গেছেন। তবু তিনি তার সরকার এ সমস্যায় গভীরভাবে উদ্বিগ্ন বলে জানিয়েছেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। এতে বলা হয়েছে, জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছেন হেনরি ভ্যান থিও। এ সময় তিনি বলেছেন, উল্লেখযোগ্য মাত্রার এ সমস্যার তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন। তার সরকারের অবস্থান আবারো তুলে ধরে তিনি বলেছেন, উত্তেজনার কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট নন তারা। তার আগে রোহিঙ্গা সঙ্কটকে গুরুত্বহীন করে দেখান দেশের কার্যত নেত্রী অং সান সুচি। মঙ্গলবার তিনি জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণের পর আরো কড়া সমালোচনার মুখে পড়েছেন। কারণ, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর নৃশংসতার অভিযোগের বিষয়ে তিনি একটি কথাও বলেন নি। বিশেষ করে সেখানে সেনাবাহিনীর নির্যাতনের শিকার বেশির ভাগ মুসলিম রোহিঙ্গা। এ কারণে তারা দলে দলে পালিয়ে আশ্রয় নিচ্ছেন বাংলাদেশে।  সুচি তার বক্তব্যে বলেছেন, রাখাইনের মুসলিমদের অর্ধেকের বেশি এখনও দেশেই আছেন। এখানে উল্লেখ্য, মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদেরকে রোহিঙ্গা বলে না। তারা তাদেরকে হয়তো মুসলিম না হয় বাঙালি বলে আখ্যায়িত করে। সুচিও সেই পথ অনুসরণ করেছেন। সুচি দাবি করেছেন, ৫ই সেপ্টেম্বর থেকে কোনো সহিংসতা ঘটে নি। কোনো গ্রামে ক্লিয়ারেন্স অপারেশন চালানো হয় নি। কিন্তু তার এ বক্তব্যের বিশ্বজুড়ে সমালোচনা হয়েছে। সুচির এ বক্তব্যই যেন বুধবার তার ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান থিও’র মুখ দিয়ে উচ্চারিত হলো আবার। ভ্যান থিও বিশ্ব নেতাদের সামনে দাঁড়িয়ে জাতিসংঘে বললেন, আমি আনন্দের সঙ্গে আপনাদের জানাচ্ছি যে, পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। এই বক্তব্য রাখার কথা ছিল অং সান সুচির। কিন্তু সঙ্কট মোকাবিলার অজুহাত দিয়ে জাতিসংঘে যোগ দেয়া থেকে বিরত থাকেন সুচি। তার পরিবর্তে পাঠানো হয় ভাইস প্রেসিডেন্ট থিও’কে। তিনি জাতিসংঘে সুচির পরিবর্তে দাঁড়িয়ে বললেন, শুধু মুসলিমই নয়, অন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ গ্রুপগুলোও দেশ রাখাইন থেকে পালিয়েছে। নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীকে বলা হয়েছে, জাতিভিত্তিক কোনো ক্ষতি এড়িয়ে চলতে ও সাধারণ মানুষের যাতে ক্ষতি না হয় সে জন্য পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা নিতে। ভ্যান থিও বলেন, কোনো রকম বৈষম্য ছাড়াই ত্রাণ সহায়তা বিতরণ করা হবে। এখানে উল্লেখ্য, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের কোনো নাগরিকত্ব নেই। সরকার ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের অধীনে তাদেরকে বাইরে রেখেছে। তাদেরকে দেখা হয়, অবৈধ অভিবাসী হিসেবে। বলা হয়, তারা বাংলাদেশ থেকে গিয়ে রাখাইনে অবৈধভাবে বসবাস করছে। মিয়ানমার সরকারের এ অবস্থানেরও তীব্র সমালোচনা হয়েছে বিশ্বজুড়ে। ২৫ শে আগস্ট সহিংসতা শুরুর পর সেনাবাহিনীর দমনপীড়ন থেকে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে চার লাখ ২১ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা। সেনাবাহিনী সেখানে রোহিঙ্গা জাতি নিধনে নেমেছে বলে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে। এমনকি জাতিসংঘ পর্যন্ত এমন অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে মিয়ানমারকে। বিবিসি লিখেছে, সেনাবাহিনী বলছে তাদের অভিযানের উদ্দেশ্য হলো সন্ত্রাসের শিকড় উপড়ে ফেলা। বেসামরিক লোকজনকে টার্গেট করার অভিযোগ বার বারই তারা অস্বীকার করছে। কিন্তু রাখাইন রাজ্যে যে উত্তেজনা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে তার সম্ভাব্য একটি চিত্র ফুটে উঠেছে। বুধবার রাখাইনে আটকে পড়া রোহিঙ্গা মুসলিমদের কাছে ত্রাণ সহায়তা নিয়ে যাচ্ছিল রেডক্রসের নৌযান।

তাদেরকে বাধা দিয়েছে তিন শতাধিক বৌদ্ধের একটি গ্রুপ। তারা স্থানীয় বৌদ্ধ। রেডক্রসের কর্মীবাহিনীর ওপর তারা ইটপাটকেল ও হাতবোমা নিক্ষেপ করেছে। তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করতে ফাঁকা গুলি ছুটেছে পুলিশ। ফলে সেখানে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে বৌদ্ধরা অবস্থান নিয়েছে তার স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে এ ঘটনায়। বুধবার রাখাইন রাজ্যের রাজধানী সিতওয়েতে ওই ত্রাণ দিতে যাচ্ছিল রেডক্রস। রেডক্রসের মুখপাত্র গ্রাজিয়েলা লিটি পিকোলি নিশ্চিত করে বলেছেন, সিতওয়েতে ওই রকম একটি ঘটনা ঘটেছে। তবে তিনি এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে পারেন নি। ওদিকে বুধবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে দায়ী করেছেন। বলেছেন, সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ভয়াবহতা চালাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে এটাই রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে সবচেয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া। মাইক পেন্স বলেন, এই সহিংসতা ঘৃণা ও বিশৃংখলার বীজ বপন করবে। এর প্রভাব পড়বে এ অঞ্চলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। আমাদের সবার জন্য শান্তি পড়বে হুমকিতে।  এ সপ্তাহে রাখাইন সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন অন্য বিশ্ব নেতারা। তার মধ্যে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রন সহিংসতাকে গণহত্যা বলে আখ্যায়িত করেছেন। আর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এটাকে বহন অযোগ্য মানব বিপর্যয় বলে আখ্যায়িত করেছেন।

 

 

 

 

 

 

সূত্র : মানবজমিন অনলাইন পত্রিকা