বৃষ্টি কান্নায় একাকার রোহিঙ্গা ক্যাম্প

28

মাথার উপর কেবল এক টুকরো পলিথিন। মাটিতে বিছানো চট-কাপড়ের মাদুর। এমন আশ্রয়ে মাথা গুঁজেছে অন্তত চার লাখ সর্বহারা রোহিঙ্গা। আশ্রয়হীন রোহিঙ্গাদের এই ক্ষুদ্র অবলম্বনটুকুও কেড়ে নিয়েছে বৃষ্টি। দমকা বাতাস উড়িয়ে নিয়েছে ছাউনি। মায়ের কোলে ভিজছে নবজাতক। গা ঘেঁষে ভিজছে শিশুরা। বৃষ্টির পানি আর কাদায় একাকার তাদের অস্থায়ী আবাস। অধিকাংশ ঘর পাহাড় কেটে তৈরি হওয়ায় মেঝেতে কয়েক ইঞ্চি নরম কাদায় মাখামাখি। বসা তো দূরের কথা। দাঁড়ানোর উপায়ও নেই। আবার পাহাড়ি ঢালের কাছে তৈরি অনেক ঘর ডুবেও গেছে। উপচেপড়া পানি ভাসিয়ে নিয়েছে কারো কারো নতুন আশ্রয়। তার উপর ক্ষুধা, তৃষ্ণা, দুশ্চিন্তা, অসুস্থতায় কাতর রোহিঙ্গাদের আশ্রয় শিবিরে তৈরি হয়েছে অবর্ণনীয় মানবিক বিপর্যয়।
গত বুধবার রাত ১১টায় কক্সবাজারে বৃষ্টি শুরুর পর এমন করুণ পরিস্থিতির সূচনা। এভাবে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে লাখ লাখ রোহিঙ্গার শেষ আশ্রয়টুকু ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়লে চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়তে দেখা গেছে তাদের। গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত উখিয়ার শফিউল্লাহ কাটা, বাঘঘোনা, বালুখালি, থ্যাংখালি, ঘুমধুম রাস্তার মাথা ও কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পের আগে-পরে গড়ে ওঠা অর্ধডজন অনিবন্ধিত অস্থায়ী ক্যাম্পে এমন দৃশ্য চোখে পড়ে। অসহায় রোহিঙ্গারা বৃষ্টিতে বসে বা শুয়ে আশ্রয় নেয়ার অবস্থানটুকুন হারিয়ে শিশু ও পুরুষরা নিরুদ্দেশ ঘুরাঘুরিতে সময় পার করছে। বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর, সর্দি, ডায়রিয়াসহ নানা রোগে ভুগছে। মিলছে না চিকিৎসাও।
উখিয়ার থ্যাংখালী। রাস্তার পাশে পলিথিনের শত শত তাঁবু। সেখানেই তাঁবু খাটিয়েছেন মংডুর গারতিবিল থেকে আসা রাজমা বিবি (১৪)। কোলে এক বছরের তাহেরা। শাড়ির আঁচল ধরে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে মেয়ে মোস্তাকিম বিবি (৪) ও ছেলে ইয়াছিন জোহা (৫)। সেই ছাউনির নিচে ঘরের মেঝের কাদায় দাঁড়িয়ে আছে তারা। কোলে কাঁদছে শিশু তাহেরা। খাবার চাইছে অপর দু’সন্তানও। মায়ের সাড়া না পেয়ে কাঁদছে তারাও। কিন্তু আশেপাশের সবার অবস্থাও একই। অধিকাংশ তাঁবুর বসার জায়গা নষ্ট হওয়ায় দীর্ঘক্ষণ ধরে ঠাঁই দাঁড়িয়ে সেখানকার শত শত রোহিঙ্গা। ছাউনি উড়িয়ে নেয়ায় সে অবস্থায় ভিজছে অনেকেই।
রাজমা বিবি মানবজমিনকে বলেন, শুক্রবার রাত ১১টায় বৃষ্টি শুরু। বাতাস এসে ৩০০ টাকায় কেনা পলিথিনটি উড়িয়ে নিয়েছে। মাটি ভিজে কাদা হয়ে গেছে। অনেকক্ষণ ধরেই দাঁড়িয়ে আছি। মশার কামড়ে তাতেও কষ্টে আছি। দু’পা ফুলে গেছে।
বালুখালিতে আশ্রয় নেন মংডুর নাইচাপ্রো থেকে আসা মৃত মোহাম্মদ ছালামের ছেলে আবদুল্লাহ (২২)। গত ১১ই সেপ্টেম্বর ৮ মাসের গর্ভবতী স্ত্রী খারেচা (১৮)কে নিয়ে বাংলাদেশে আসেন। সঙ্গে মা ও ভাইবোনসহ আরো ৮ জন। গতকাল বেলা ১২টার দিকে নিরুপায় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।
খারেছা বলেন, আমাদের ঘর ছিল ওখানে। বাতাসে পলিথিন উড়ে যাওয়ার পর অন্য ঘর থেকে একটা চট নিয়ে সবাই দল বেঁধে বসে নির্ঘুম রাত কাটিয়ে দিয়েছি। কিন্তু কাদায় সেখানে দাঁড়ানোর অবস্থা না থাকায় সরে এসে এখানে দাঁড়িয়ে আছি। ঘরের মেঝের মাটি শুকাতেও সময় লাগবে। কিভাবে দিন কাটবে জানি না। এমন অবস্থা দেখে স্থানীয় এক লোক সকালে ডেকে নিয়ে দু’মুঠো ভাত খেতে দেয় বলেও জানান তিনি।
তার স্বামী আবদুল্লাহ বলেন, আমরা এমনিতে গরিব লোক। কিছুই সঙ্গে আনতে পারিনি। এখন বৃষ্টিতে মাথার ছাউনি চলে গেলে আর কিনতে পারিনি। ত্রাণ হিসেবে একটি চট পেলে রোদ-বৃষ্টি থেকে বাঁচি।
ঘুমধুম ও কুতুপালংয়ের আগে রাস্তার পশ্চিম পাশের পাহাড়ি ঝিরিতে গতকাল পাহাড়ি পানির স্রোত নামে। ছোট্ট পাহাড়ি খাল উপচে পানি ফুলে উঠে। পাশের সমতলে টানানো হয়েছিল অর্ধশতাধিক পলিথিনের তাঁবু। গতকাল দুপুরে সেগুলোর অর্ধেক অংশ পানির নিচে চলে যেতে দেখা গেছে। আশ্রয়টুকু হারিয়ে সেই তাঁবুর নিচের মানুষগুলো এখানে ওখানে বসে-দাঁড়িয়ে সময় পার করছে।
তাদের একজন বুথেডংয়ের পানজি থেকে আসা খোরশেদ আলম (২৫)। বৃষ্টির পর তাদের কুঁড়েঘরটির মেঝে ডুবে যায়। তারপর ৬ মাসের শিশু সন্তান খায়রুল আমিনকে নিয়ে স্ত্রী মোস্তাকিম সেই আশ্রয় ছাড়েন। গত ১১ই সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে আসার এক সপ্তাহের ব্যবধানে ওই আশ্রয়টুকু হারালো পরিবারটি। গতকাল দুপুর পর্যন্ত রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ও বসে থেকে সময় পার করছে।
কাছেই তাঁবু গাড়েন মংডুর টাউনশিপ বাজার থেকে আসা আবু ছৈয়দ (৪৮)। তার বৃদ্ধ পিতা বাছা মিয়া (৯৫) ও মা নূরজাহান (৮৫) জীবন্ত পুড়িয়ে মেরেছে সেনা ও মগরা। তার বাসার কাছেই বৃষ্টির পানিতে পাহাড়ের একটা অংশ ধসে পড়েছে। ভাগ্যিস তাদের পলিথিনের তাঁবু পর্যন্ত আসেনি ধসে পড়া মাটি। ‘তাতেই রক্ষে’ বলে জানান তিনি। উখিয়ার নিবন্ধিত কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পের দক্ষিণে অবস্থান নেন সোনা মিয়া। মিয়ানমার সেনার গুলিতে পিতা ছৈয়দ উল্লাহকে হারান। স্বজন হারিয়ে মংডুর কোয়ারবিল থেকে তিনি এদেশে আসেন। বাতাসে মাথার উপরের পলিথিন উড়ে যাওয়ায় খোলা আকাশের নিচে রয়েছে ১২ সদস্যের পরিবার। তাদের ৯ সন্তানই শিশু। তারা হলো- মনোয়ারা (১৪), রফিক (১২), জমিলা (১১), ছমিরা (১০), শহীদ (৯), শফিক (৮), জাহাঙ্গীর (৭), আজিদা (৬) ও মাবিয়া (২)। সন্তানদের নিয়ে বৃষ্টিতে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়েন সাত মাসের গর্ভবতী স্ত্রী রমিদা (২৫)।
কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্প পেরিয়ে পশ্চিমের পাহাড়ে দেখা গেছে ১৭০ পরিবার। বৃষ্টিতে তাদের অবস্থাও দুর্বিষহ। বৃষ্টির পর পানিতে পোকামাকড়, মশা, সাপের উৎপাতের পাশাপাশি লড়ছেন ক্ষুধা-তৃষ্ণার সঙ্গে। তারা বেশ ভেতরের দিকে অবস্থান নেয়ায় সেখানে ত্রাণও খুব একটা পৌঁছেনি বলে জানান অনেকে। সেখানে আনোয়ার মোস্তফার পরিবারের ৮ সদস্যকে অনাহার-অর্ধাহারে করুণ সময় পার করতে দেখা গেছে। ১০ই সেপ্টেম্বর সেখানে এসে একটি স্থান পেলেও মাথার উপর ছাউনি জুটেনি তাদের। তারা বৃষ্টি আসলে গাছের নিচে অবস্থান নেয় বলে জানান। কেবল ১৭০ পরিবারেই একই দুর্ভোগ নয়, বৃষ্টিতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন গত ২৫ দিনে বাংলাদেশে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গা।

 

 

 

 

 

 

 

সূত্র : মানবজমিন অনলাইন পত্রিকা