ব্লু হোয়েল নিয়ে আতঙ্ক তদন্তের নির্দেশ

40

ব্লু হোয়েল। একটি বিকৃত ডেথ গেম। কৌতূহলের বশে বিভিন্ন দেশে অনেক কিশোর-তরুণ এই গেমসে ঢুকে আর বের হতে পারেনি। অনেকেই বরণ করেছে আত্মহত্যার করুণ পরিণতি। গত বুধবার রাতে রাজধানীর সেন্ট্রাল রোডে ১৩ বছরের মেধাবী কিশোরী অপূর্বা বর্ধন স্বর্ণাও একই পথে আত্মঘাতী  হয় বলে আলোচনা রয়েছে। এদিকে, ব্লু হোয়েলের বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে বিটিআরসিকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বাংলাদেশে ব্লু হোয়েলের বিস্তারের বিষয়ে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আশঙ্কার চিত্র। রাজধানীর বহু অভিজাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ুয়া অনেক কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীরা নানা মাধ্যমে ব্লু হোয়েলের কথা জানে। ইন্টারনেট ও বিভিন্ন সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে তারা সে সম্পর্কে জানতে পারছে। ইন্টারনেট ব্যবহারকারী সহপাঠী ও বন্ধুরা এ বিষয় একে অপরের সঙ্গে আলাপ করছে। অনেকে এই ডেথ গেমের চ্যালেঞ্জও ছুঁড়ে দিচ্ছে বন্ধুদের। এতে এই মারণ খেলার প্রতি কৌতূহলী হচ্ছে অনেকেই। ব্লু হোয়েল গেম সংশ্লিষ্টতায় আরো প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। এতে আতঙ্কিত অভিভাবকরা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে ভয়।
গত রোববার রাজধানীর পোস্তগোলা শ্মশান ঘাটে ব্লু হোয়েল খেলে আত্মহননের পর কিশোরের লাশ দাহ করা হয়েছে- এমন খবর যাচাইয়ে মানবজমিনের অনুসন্ধান চলছিল। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন পরিচালিত ওই শ্মশানের কয়েকজন কর্মচারী এ সময় জানান, তারা ক্লুহীন কিছু আত্মহত্যার লাশ পেয়েছে। তাদের সবাই বয়সে তরুণ। এই তথ্য দাতাদের একজন ওই শ্মশানঘাটের মোহরাব বা নিবন্ধনকারী পলাশ চক্রবর্তী।
তিনি বলেন, দাহ করতে আসা অনেক অভিভাবক জানিয়েছেন- তাদের সন্তানরা মেধাবী ও কম্পিউটার বা গেমসে আসক্ত ছিল। কিন্তু ওই অভিভাবকরা সেই গেমসের বিষয়ে আগে কিছু জানতে না পারায় গেমে ঢুকে আত্মহত্যা করেছে কিনা তা যাচাই করিনি। তবে অকারণে ও ক্লু-হীন আত্মহত্যাগুলোর ধরন সেই গেমসের নির্দেশনার আত্মহত্যার ধরনের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। তিনি এমন কিছু লাশের বর্ণনা দিলেও যোগাযোগের মোবাইল নম্বর ও অন্যান্য তথ্যাদি লিপিবদ্ধ না থাকায় আত্মহত্যার প্রকৃত কারণ জানা যায়নি।
পলাশ চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা বলার সময় ছোট্ট অফিসে জড়ো হয় আরো অনেকে। তাদের একজন হিন্দু পুরোহিত রজনী কান্ত (ছদ্মনাম)। তিনি দেন রীতিমতো আতঙ্কের খবর। তার এক ছেলে (নাম প্রকাশ করেননি) পড়ে রাজধানীর সেন্ট গ্রেগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজে। দশম শ্রেণিতে। গত বৃহস্পতিবার আত্মঘাতী অপূর্বা বর্ধনের মরদেহ দাহ করার আগে সেখানে পূজা দিতে যায় সেই ছেলে। স্বর্ণা ব্লু হোয়েল খেলে আত্মঘাতী হওয়ার পর আমার ছেলে আমাকে বলে যে, সে ব্লু হোয়েল বিষয়ে কয়েক মাস আগে থেকেই জানে। শুধু সে নয়- তার ক্লাসের অন্তত আড়াই শ’ শিক্ষার্থীর প্রায় সবাই ব্লু হোয়েলের খুঁটিনাটি জানে। এ নিয়ে বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে আলোচনাও নাকি হয় নিয়মিত। এতে অন্যরাও কৌতূহলী হয়ে উঠছে ব্লু হোয়েলে। একজন অন্যজনকে চ্যালেঞ্জও দিচ্ছে। ছেলের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি এক নাগাড়ে ব্লু হোয়েলের বিভিন্ন ধাপ এবং কর্মপ্রক্রিয়ার কথাও বলেন।
দুপুরের দিকে ওই শ্মশানে যান বাংলাদেশ ইউনির্ভাসিটি অব প্রফেশনালসের এমবিএ’র শিক্ষার্থী সজীব রায়। তিনি বলেন, আমি দেড় মাস আগে ফেসবুকের মাধ্যমে ব্লু হোয়েল গেমের বিষয়ে জানতে পারি। জেনেছি বিভিন্ন ধাপের বিষয়েও। অন্য অনেক শিক্ষার্থীও জানে তা।
একই স্থানে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগ থেকে ২০১৪ সালে পাস করা সৌরভ রায় চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি নিহত স্বর্ণার চাচা। সৎকার বিষয়ক কাজেই তিনি এদিন শ্মশানে যান। সৌরভ রায় চৌধুরী বলেন, জানতে পেরেছি যে গত ৬ মাস আগেই বান্ধবীদের কাছ থেকে ব্লু হোয়েলের বিষয়ে জেনেছিল স্বর্ণা।
শুধু স্বর্ণা নয়। তিনি নিজেও গত দু’মাস আগে ফেসবুকের একটি লিংক থেকে ব্লু হোয়েলের বিষয়ে জানতে পারেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশি এক ইউটিউবার এ বিষয়ে একটি ভিডিও বানিয়ে ইউটিউবে ছাড়েন। তা-ই আমার চোখে পড়ে। ব্লু হোয়েলের কথা প্রকাশ পেলে তরুণরা আরো কৌতূহলী হয়ে উঠবে- এই আতঙ্কে তা প্রকাশ করতেও চান না তিনি।
শ্মশানের প্রবেশ পথে কথা হয় রাজীব নামে নটর ডেম স্কুলের এক ছাত্রের সঙ্গে। সে বলে, আমার বন্ধু-বান্ধবদের অনেকে ব্লু হোয়েলের বিষয়ে একজন অন্য জনকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়। কৌতূহল বশত অনেকে এনরয়েড মোবাইলে ব্লু হোয়েল সার্চ দিয়ে দেখে।
বেরিয়ে আসার সময় সেই পুরোহিত আবার বলেন, কেউ যেন কৌতূহল বশেও ব্লু হোয়েলে না ঢুকে। আমি আমার ছেলেকে বুঝিয়েছি।
কেন ব্লু হোয়েলের মতো এই মরণ খেলার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে তরুণ-তরুণী-কিশোরদের? কিভাবেই বা তাদের বিরত রাখা যায় এই মরণ আসক্তি থেকে? এমন প্রশ্নে মনোবিদদের পরামর্শ, এ ব্যাপারে সবার আগে অভিভাবকদেরই সতর্ক হতে হবে। ইন্টারনেট ও সোশ্যাল সাইট ব্যবহারে রাখতে হবে কড়া নজরদারি। সন্তান হঠাৎ আনমনা, অসুখী কিংবা একা থাকতে আগ্রহী হলে সতর্ক হওয়া দরকার। সন্তান কখনও বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া বা মৃত্যুর কথা বললে অবিলম্বে মনোবিদের দ্বারস্থ হতে হবে। সন্তানকে একাকিত্বে ভুগতে দেয়া চলবে না। প্রয়োজনে আরো বেশি করে সময় দিতে হবে। সন্তান ফোন চাইলে দামি স্মার্টফোনের বদলে সাধারণ ফোন ব্যবহারে তাকে অভ্যস্ত করার চেষ্টা করতে হবে। সন্তানকে শান্ত করতে বা ব্যস্ত রাখতে হাতে স্মার্ট ফোন ধরিয়ে দেয়ার অভ্যাস ত্যাগ করতেই হবে। গল্পের ছলে সন্তানের সোশ্যাল মিডিয়ায় গতিবিধি সম্পর্কে অবহিত থাকতে হবে। কেউ যদি ব্লু হোয়েলে আসক্ত হয়ে পড়ে তবে তার আচরণে আগে থেকেই কিছু আঁচ করা সম্ভব। এক দিনেই কোনো মানুষ আত্মহত্যাকে বেছে নিতে পারে না। তাই সন্তানের আচরণে কোনো ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করলে সঙ্গে সঙ্গে তার প্রতি নজরদারি বাড়িয়ে তাকে বিপথগামী হওয়ার পথ থেকে রক্ষা করতে হবে। আর নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে ইন্টারনেট গেইটওয়ে থেকে গেমটির লিঙ্ক মুছে ফেলার পদক্ষেপ নিতে হবে। যাতে ব্লু হোয়েলের মতো মারণ গেমে সহজে কেউ আসক্ত হওয়ার সুযোগ না পায়।
‘ব্লু হোয়েল’ খতিয়ে দেখার নির্দেশ বিটিআরসিকে: অনলাইনভিত্তিক মারণ খেলা ‘ব্লু হোয়েল’র বিষয়ে খোঁজ-খবর নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-সহ সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গতকাল সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল।
‘ব্লু হোয়েল’ নিয়ে ফেসবুকে অনন্ত জলিলের দীর্ঘ স্ট্যাটাস: মারণ খেলা ব্লু হোয়েল বিষয়ে তরুণ  প্রজন্মকে সচেতন করার মানসে ফেসবুকে দীর্ঘ স্ট্যাটাস দিয়েছেন জনপ্রিয় চিত্রনায়ক অনন্ত জলিল। গতকাল বিকাল সাড়ে ৪টায় অনন্ত জলিল তার ভেরিফাইড পেজে লেখেন, ‘…আমি মানসিকভাবে কিছুটা আঘাতপ্রাপ্ত, কারণ ব্লু হোয়েল গেমস। এই গেমসটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বেশ কয়েকজন সম্ভবনাময়ী প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। এই গেমের বিষাক্ত ছোবল আমাদের প্রিয় বাংলাদেশেও পড়েছে। যার ফলে আমি শঙ্কিত, আমার দেশের সম্ভাবনাময় তরুণ-তরুণীদের নিয়ে। আশা করি বাংলাদেশের তরুণরা বেশ মেধাবী এবং জ্ঞানী। তারা জানেন এই গেমস তাদের শুধু বিপদেই ফেলবে না, তাদের সঙ্গে তার পরিবারকেও অনিশ্চিত রাস্তায় ঠেলে দেবে। আমি আল্লাহর কাছে করজোড়ে দোয়া করছি, আল্লাহ যেন বাংলাদেশের সবাইকে বিশেষ করে যারা গেমস খেলেন তাদেরকে এই বিপদগামী গেমসের হাত থেকে রক্ষা করেন।
অনন্ত জলিল আরো লেখেন, আমরা জানি আত্মহত্যা মহাপাপ। তাহলে কেন আমরা এই গেমস খেলতে যাব? আমরা অবশ্যই এই গেমস থেকে দূরে থাকব। কাউকে যদি এই গেমস খেলতে দেখি, তাহলে অবশ্যই তাকে আমরা গেমসটি হতে যেকোনো উপায়েই ফিরিয়ে আনব।
অনন্ত জলিল বলেন, বন্ধুগণ- এইসব ফালতু গেমস নিজের মোবাইলে ইন্সটল করে নিজের পার্সোনাল ইনফরমেশন গেমসের এডমিনকে একসেস দেয়ার কোনো মানেই হয় না। অপরকে ব্ল্যাকমেল করতে দেবেন কেন? ব্লু হোয়েল খেলা মানেই নিজেকে ব্ল্যাকমেল এ ফেলা।

 

 

 

 

 

 

সূত্র : মানবজমিন অনলাইন পত্রিকা