মধ্যমেয়াদে বাংলাদেশের পরিকল্পনা জানতে চাইলেন কূটনীতিকরা

31

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্রিফিংয়ে কূটনীতিকরা জানতে চাইলেন আশ্রিতদের সুরক্ষায় সরকারের মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা কি? প্রস্তাবিত ভাসান চরে (নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার ঠেঙ্গারচর) তাদের পুনর্বাসনে যে পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার তা বাস্তবায়নের অগ্রগতিই বা কতদূর? রাখাইনে রোহিঙ্গাদের নিজ নিজ বসতভিটায় পূর্ণ নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় বেশ সময় লাগবে এমন ইঙ্গিত দিয়ে সঙ্কট উত্তরণ না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের পাশে থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন পশ্চিমা দুনিয়ার প্রতিনিধিরা। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মা’য় গতকাল জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলো এবং মিয়ানমারসহ আসিয়ান জোটের সদস্য রাষ্ট্রসহ ২৮ দেশের কূটনীতিকদের ব্রিফ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। রোহিঙ্গা ইস্যুতে আয়োজিত কূটনৈতিক ব্রিফিংয়ে এবারই প্রথম মিয়ানমারের প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। মিয়ানমারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ওই ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন। সেখানে তিনি তার দেশ, সরকার বিশেষ করে স্টেট কাউন্সেলর অং সান সুচির দেয়া বক্তব্যেরই প্রতিধ্বনি করেন। তিনি ‘রোহিঙ্গা’ শব্দের ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন তুলেন। অবশ্য তার এ বক্তব্য ধোপে টিকেনি। তার বক্তব্যের পরপরই পশ্চিমা বিশ্বের কয়েকজন  কূটনীতিক ফ্লোর নেন। তারা প্রায় অভিন্ন সুরেই মিয়ানমারের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেন। বলেন, মানবতার এ সঙ্কটে মিয়ানমারকে আরও সংবেদনশীল এবং সচেতন হতে হবে। মিয়ানমার সরকার সেনা অভিযান বন্ধের দাবি করলেও রাখাইন যে এখনও জ্বলছে এবং নির্যাতিতরা প্রাণে বাঁচতে দলে দলে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে সেই অকাট্ট উদাহরণগুলোও উঠে আসে তাদের বক্তব্যে। বাংলাদেশের তরফে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে ইস্যুটি বিশ্ব সমপ্রদায় যেভাবে ফোকাসে এনেছে সেই স্পটলাইট ধরে রাখতে অর্থাৎ সঙ্কটের রাজনৈতিক  সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এ ইস্যুতে বাংলাদেশের পাশে থাকতে কূটনীতিকদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়। একই সঙ্গে এ নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার যেসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তাও বিদেশি বন্ধুদের খোলামেলাভাবে অবহিত করেন মন্ত্রী। বলেন, প্রাণে বাঁচতে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ ভূমে ফেরাতে দেশটির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা শুরু হয়েছে। মিয়ানমার তাদের ফেরানোর আগ্রহ দেখিয়েছে। বাংলাদেশ এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছে। এখন নেপি’ডর জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারের মন্ত্রীর সফরের বিষয়ে স্টেট কাউন্সেলরের দপ্তর যে বিবৃতি দিয়েছে এবং সেখানে ১৯৯২ সালের সমঝোতা মতেই তাদের ফেরানোর কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ মনে করে ’৯২ আর আজকের প্রেক্ষাপট এক নয়। সেই সময়ে যে সমঝোতা হয়েছিল বর্তমান বাস্তবতায় তা গ্রহণযোগ্য নয়। এজন্য বাংলাদেশ ১৯৯২’র সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ একটি নতুন চুক্তির প্রস্তাব করেছে। ভাসান চরে রোহিঙ্গাদের আপাতত সরিয়ে নেয়া (পুনর্বাসন) বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ওই এলাকাটি এখনও পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। প্রস্তুত হলেই তাদের পুনর্বাসন করা হবে। সেটি করার আগে অবশ্যই কূটনীতিকদের জানানো হবে। বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা বলেন, পশ্চিমা বিশ্বের প্রভাবশালী একটি দেশের প্রতিনিধি রোহিঙ্গা ক্যাম্প ব্যবস্থাপনায় আরো অধিক সংখ্যক এনজিওকে সম্পৃক্ততার পরামর্শ দেন। তবে সুর্দিষ্টভাবে কোনো এনজিও’র নাম বলেননি তিনি। একাধিক সূত্র জানায়, ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী কূটনীতিকদের  উদ্দেশে বলেন, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক যে, রাখাইনে নির্যাতন এখনও বন্ধ হয়নি এবং সেখান থেকে  রোহিঙ্গারা এখনও বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে। রাখাইনে নারী, শিশু ও বয়স্কদের ওপর এখনও নির্যাতন চালানো হচ্ছে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, সেখানে এখনও ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে। জাতিসংঘের পরিসংখ্যান দিয়ে তিনি বলেন, গত ১০ দিনে ৪০ হাজারের  বেশি রোহিঙ্গা  বাংলাদেশে এসেছে এবং ২৫শে আগস্ট  থেকে এ পর্যন্ত এসেছে পাঁচ লাখ ২০ হাজার। মন্ত্রী কূটনীতিকদের জানান, আমরা গত মে মাসে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারকে একটি নন-পেপার দিয়েছিলাম এবং ২৫শে আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতিতে সেটিকে পরিবর্ধন ও পরিমার্জন করে সেপ্টেম্বরে আরেকটি নন-পেপার  দেয়া হয়। মিয়ানমারের মন্ত্রী জানিয়েছেন অক্টোবর ২০১৬-এর পরে যারা এসেছে তাদের ভেরিফিকেশন সাপেক্ষে প্রত্যাবাসনে তারা রাজি। ভেরিফিকেশনের জন্য তারা ১৯৯২ সালে গৃহীত যৌথ বিবৃতিতে ভিত্তি হিসেবে ধরার প্রস্তাব করে। এর জবাবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, যেসব  রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে তাদের বেশির ভাগেরই বাড়িঘর পুড়ে গেছে এবং প্রায় কারো কাছেই কোনো কাগজপত্র নেই। এছাড়া মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ নিজেই বলেছে অর্ধেক  রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর পুড়ে গেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী কূটনীতিকদের বলেন, আমরা তাদেরকে জানিয়ে দিয়েছি পরিবর্তিত পরিস্থিতি ও নতুন চ্যলেঞ্জের কারণে ১৯৯২ সালের সমঝোতা অনুযায়ী প্রত্যাবাসন বর্তমানে বাস্তবসম্মত নয়। যেহেতু  রোহিঙ্গাদের কাছে কোনো কাগজ নেই, তাই আমরা চাই  কোনো রোহিঙ্গা যদি তাদের বাড়ির ঠিকানা বলতে পারে,   ভেরিফিকেশন করার জন্য সেটাই মানদণ্ড হওয়া উচিত। এছাড়া যৌথ ভেরিফিকেশন এবং সম্ভব হলে আন্তর্জাতিক সংস্থার সাহায্য নেয়ার কথা বলেছি। এই গোটা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য একটি নতুন একটি সমঝোতার প্রয়োজন এবং তার একটি খসড়া মিয়ানমারের মন্ত্রীকে দেয়া হয়েছে বলেও কূটনীতিকদের জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি কূটনীতিকদের বলেন, নতুন সমঝোতায় বলা হয়েছে ১৯৭৮-৭৯ এবং ১৯৯২-৯৩ সালের সমঝোতাকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এয়াড়া যৌথ ভেরিফিকেশন, সব  রোহিঙ্গাকে ফেরত, ফেরত যাওয়া রোহিঙ্গাদের তাদের বসতবাড়িতে ফেরত যেতে দেয়ার সুযোগ দেয়া ও তাদেরকে ইন্টারনালি ডিসপ্লেসড ক্যাম্পে স্থানান্তর না করা এবং যারা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ক্রিমিনাল চার্জ না আনার কথা নতুন সমঝোতায় বলা হয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তা নেয়া এবং কফি আনান কমিশনের রিপোর্টের পূর্ণ বাস্তবায়নের বিষয়ে নতুন সমঝোতায় জোর দেয়া হয়েছে। সূত্র জানায়, মন্ত্রী কূটনীতিকদের বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য আমরা দুইপক্ষ একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের বিষয়ে একমত হয়েছি কিন্তু বর্তমানে যেটি জরুরি ভিত্তিতে দরকার  সেটি হচ্ছে আমাদের সমঝোতা প্রস্তাব সম্পর্কে মিয়ানমারের জবাব।  বিকাল ৪টায় শুরু হওয়া কূটনৈতিক ব্রিফিংটি চলে প্রায় দেড় ঘণ্টা। ব্রিফিং শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। সেখানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হকসহ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সাংবাদিকদের মন্ত্রী যা বললেন: কূটনৈতিক ব্রিফিং শেষে রোহিঙ্গা সঙ্কট উত্তরণ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ ইস্যুতে আমরা মোটেও নতজানু নই। তিনি বলেন, যুদ্ধ কোনো সমাধান হতে পারে না। দুনিয়াতে কোনো সমস্যার সমাধান যুদ্ধ করে হয়নি। রোহিঙ্গা সংকটেও যুদ্ধ নয়, শান্তিপূর্ণ উপায়ে কূটনৈতিকভাবে বিশ্ব সমপ্রদায়কে সঙ্গে নিয়েই এর সমাধান চায় বাংলাদেশ। সেখানে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনারা পরামর্শ দেবেন। আমরা নেব। আমাদের সবারই উচিত ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করা। আমরা দেশের জন্যই চিন্তা করছি।’ এ ইস্যুতে সরকারের অবস্থান সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা কোনো কিছু লুকাতে চাই না। কেন লুকাব?’

 

 

 

 

 

 

সূত্র : মানবজমিন অনলাইন পত্রিকা