মার্কিন কংগ্রেসে শুনানি রোহিঙ্গা সংকটে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির আশঙ্কা

25

সেনাবাহিনী মিয়ানমারকে রোহিঙ্গামুক্ত করার সুস্পষ্ট মিশনে নেমেছে। এ জন্য সেখানে নতুন করে টার্গেটেড বা সুনির্দিষ্ট অবরোধ আরোপ করা উচিত। এ সংকট অব্যাহত থাকলে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হতে পারে। আর এ পরিস্থিতি ডেকে আনতে পারে বৈশ্বিক সন্ত্রাসীদের। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হাউজ কমিটি অন ফরেন অ্যাফেয়ার্সে এক শুনানিতে এসব কথা বলা হয়েছে। এতে রোহিঙ্গা সংকটকে লেভেল-৩ হিসেবে ঘোষণা দেয়ার দাবি তোলা হয়। বলা হয় সিরিয়া, দক্ষিণ
সুদান ও ইয়েমেনের মতো রোহিঙ্গা সংকটকে লেভেল-৩ হিসেবে ঘোষণা করে এর ভয়াবহতা সম্পর্কে জোর দেয়া উচিত। ওয়াশিংটনে ২১৭২ রেবার্ন হাউজ অফিস বিল্ডিংয়ে মার্কিন স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় ‘দ্য রোহিঙ্গা ক্রাইসিস: ইউএস রেসপন্স টু দ্য ট্রাজেডি ইন বার্মা’ শীর্ষক শুনানি হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন এডুয়ার্ডো আর রয়েস। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বিশেষ এই শুনানিতে সাক্ষ্য দেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের ব্যুরো অব ইস্ট এশিয়ান অ্যান্ড প্যাসিফিক অ্যাফেয়ার্সের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াবিষয়ক উপসহকারী মন্ত্রী ডব্লিউ প্যাট্রিক মারফি, ইউএস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টের ব্যুরো ফর ডেমোক্রেসি, কনফ্লিক্ট অ্যান্ড হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাসিস্ট্যান্সের ভারপ্রাপ্ত উপসহকারী প্রশাসক ভি কেট সোমভংসিরি ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের ব্যুরো অব পপুলেশন, রিফিউজিস অ্যান্ড মাইগ্রেশন সংক্রান্ত উপসহকারীমন্ত্রী মার্ক সি স্টোরেলা, কমিটির র‌্যাংকিং সদস্য এলিয়ট এল এঞ্জেল। শুনানিতে বলা হয়, রোহিঙ্গা ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর দীর্ঘদিন এমন নির্যাতন চলছে। আর এর ভার বইতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। মিয়ানমার সাম্প্রতিক সময়ে সামরিক জান্তার স্বৈরতন্ত্র থেকে নির্বাচিত সরকারে ফিরেছে। এই অবস্থানের পরিবর্তন খুবই ভঙ্গুর। তবু যেটুকু অর্জন করেছে মিয়ানমার তা হুমকির মুখে পড়েছে। এতে হাউজ কমিটি অন ফরেন অ্যাফেয়ার্সের র‌্যাংকিং সদস্য, প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য এলিয়ট এল এঞ্জেল বলেন, ওয়াশিংটন থেকে ৮ হাজার মাইলেরও দূরে এই রোহিঙ্গা সংকট চলছে। এত দূরের এই ঘটনাকে একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের ঘটনা মনে হতে পারে। তাই আমি বক্তব্য দেয়ার সময় কিছু ছবি দেখাতে চাই। এতে মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা এই মুহূর্তে কি দুর্দশার শিকার হচ্ছেন তার বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে। আমরা যখন এখানে বসে কথা বলছি, তখন সেখানে এক মানবিক ট্র্যাজেডি ঘটে চলেছে। এসব ছবি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গত ৬ সপ্তাহ ধরে প্রত্যাশিতবাবে চলা সহিংসতার। সেখানে বেসামরিক সাধারণ মানুষ, আভ্যন্তরীণ জাতি, আন্তঃধর্মীয় সহিংসতা সৃষ্টি করেছে পুলিশ ও সেনাবাহিনী। এ সহিংসতা বৌদ্ধ রাখাইন ও রোহিঙ্গা মুসলিমদের মধ্যে।  এই রক্তপাতময় সহিংসতায় অর্ধেকের বেশি রোহিঙ্গা, যার মধ্যে শতকরা ৬০ ভাগই শিশু, তারা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে শরণার্থী হয়েছে। প্রথম ৩০ দিনে দেশ ছেড়েছে কমপক্ষে চার লাখ মানুষ। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় গণহত্যা ও ১৯৯৯ সালে কসোভোতে সার্বিয়ার জাতি নিধনের পরে এত দ্রুত সময়ে এত বেশি মানুষ শরণার্থী হওয়ার ঘটনা আর ঘটেনি। যারা পালিয়ে এসেছেন তাদের প্রায় এক-চতুর্থাংশের জন্য নেই পর্যাপ্ত আশ্রয়, অর্ধেক মানুষের নেই নিরাপদ পানি। এটা হৃদয় কাঁপানো এক মানবিক বিপর্যয়। এ পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছেই। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী দাবি করেছে, ২৫শে আগস্ট রোহিঙ্গা উগ্রপন্থিদের হামলার জবাবে তারা এই নৃশংস দমনপীড়ন শুরু করেছে। উল্লেখ্য, রোহিঙ্গা উগ্রপন্থিরা ব্যবহার করছে ছুরি, ছোটখাটো অস্ত্র ও হালকা বিস্ফোরক। কিন্তু পরিস্থিতি নাগালের বাইরে চলে গেছে। সেনাবাহিনীর অভিযানকে উগ্রপন্থিদের বিরুদ্ধে অভিযান বা সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান বলে বৈধতা দেয়া যায় না। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও সীমান্ত রক্ষাকারীরা সুস্পষ্টভাবে টার্গেট করেছে রোহিঙ্গাদের। এক্ষেত্রে তারা মধ্যযুগীয় কৌশল অবলম্বন করেছে। গলা কেটে দিচ্ছে। পুড়িয়ে দিচ্ছে। ধর্ষণ করছে। নৃশংসভাবে হত্যা করছে মানুষ। এলিয়ট এল এঞ্জেল বলেন, ২১ বর্গকিলোমিটার গ্রাম পর্যায়ক্রমে পুড়িয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কর্মকর্তারা একে জাতি নিধন বলে আখ্যায়িত করেছেন। সর্বশেষ এই ঘটনা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের দীর্ঘ ইতিহাসের সর্বশেষ অধ্যায়। এই ইতিহাসে তাদের নাগরিকত্বের দাবি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। তারা কাজ করার ও মুক্তভাবে চলাচলের অনুমতি পায় না। সাম্প্রতিক এসব ঘটনায় অল্প কয়েকজন নেতা জড়িত। এলিয়ট এল এঞ্জেল বলেন, আমি যেমনটা দেখেছি তাতে মিয়ানমারের শুধু একজন ব্যক্তি এই সহিংসতা বন্ধ করতে পারেন। মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেয়ার পথ করে দিতে পারেন। প্রকৃতপক্ষে কি ঘটেছে তার তদন্তের অনুমতি দিতে পারেন। তিনি হলেন মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কমান্ডার ইন চিফ মিন অং হলেইং। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্য পরিষ্কার। তারা মিয়ানমারকে রোহিঙ্গামুক্ত করতে চায়। যারা এই সহিংসতা দেখতে পেয়েছেন তারা এ জন্য অং সান সুচিকেও কম দায়ী করছেন না। বলাবলি আছে, তাকে হয়তো প্রকৃত তথ্য দেয়া হচ্ছে না অথবা তিনি কঠিনভাবে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়েছেন। অনেকে বলছেন, তিনি রাখাইনের ঘটনায় মোটেও সহানুভূতিশীল নন। তিনি আরো বলেন, আমি মনে করি মিয়ানমারের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের যে নীতি বা পলিসি তা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীই সেখানে সংবিধানের খসড়া করেছিল। এতে সেনাবাহিনীকে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে। পার্লামেন্টে তাদের ভেটো দেয়ার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে এবং আইনগতভাবেই তারা সরকারের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। যখন যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছিল তখন আমরা সেনাবাহিনী ও তাদের অর্থায়নে পরিচালিত ব্যবসার বিরুদ্ধে আরোপ করা অবরোধও প্রত্যাহার করেছিলাম। অং সান সুচি যখন সেনাবাহিনীর ওপর খুব কমই ক্ষমতা দেখাতে পারেন তখন আইনগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো মিয়ানমারের সেনাবাহিনী মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ব্যবসা করছে। আমার মনে হচ্ছে, যেহেতু এখন দেখা যাচ্ছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী নিরপরাধ মানুষের বিরুদ্ধে সহিংসতা চালিয়ে যাচ্ছে তাই আমাদের টার্গেটেড অপরোধের নীতি পুনর্বিবেচনা করা উচিত। পাশাপাশি আমাদের উচিত মানবিক সংকটের বিষয়টিতে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা। এই সংকটে যুক্তরাষ্ট্র বরাদ্দ করেছে ৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার। এখন রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশ সরকারও এক মানবিক ভীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যেখানে গড় আয় হলো প্রায় ১৩০০ ডলার। তারা বর্তমানে প্রায় ১০ লাখের কাছাকাছি শরণার্থীকে সেবা দিচ্ছে। এমনিতেই এ দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতির দেশের খুব কাছাকাছি। ওই শুনানিতে যৌথ বিবৃতি দেন ডব্লিউ প্যাট্রিক মারফি ও মার্ক সি স্টোরেলা। এতে তারা রোহিঙ্গা সংকটকে ভয়াবহ মানব ট্র্যাজেডি হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তারা বলেন, গত ৬ সপ্তাহে উগ্রপন্থিদের হামলার পর সেনাবাহিনীর অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়ায় ও স্থানীয়দের সৃষ্ট সহিংসতায় স্থানীয় সাধারণ মানুষদের সুরক্ষা ভয়াবহভাবে অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। এতে রাখাইনে রোহিঙ্গা সংকট ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করেছে। অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে রোহিঙ্গারা ছুটে আসায় বাংলাদেশে মানবিক পরিস্থিতি খারাপ থেকে খারাপ হচ্ছে। মিয়ানমার সরকার বলছে, উত্তর রাখাইনের কমপক্ষে ১৭৫টি রোহিঙ্গা গ্রাম জনশূন্য হয়ে গেছে। ওই এলাকায় ৪৭০টি মুসলিম গ্রামের মধ্যে এ সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। কিন্তু হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ১৯শে সেপ্টেম্বরের স্যাটেলাইটে পাওয়া ছবি থেকে দেয়া যায় প্রায় ২১৫টি গ্রাম পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। বিবৃতিতে তারা আরো বলেন, আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ অনেক। তবে আমাদের চারটি পয়েন্টে ফোকাস করতে হবে। তা হলো- ১. রাখাইনে মানবিক সহায়তার জন্য প্রবেশের অধিকার। ২. শরণার্থীদের নিরাপদ, সম্মানজনক ফিরে যাওয়া নিশ্চিত করা। ৩. যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় ইউএসএইডের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট ভূমিকা রাখা। ৪. জাতিসংঘ ও অন্যান্য মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থাগুলো যেন রাখাইন রাজ্যে প্রবেশের অনুমতি পায়। আক্রান্ত এলাকায় এখনো বেশির ভাগ এলাকায় রিলিফবিষয়ক সংস্থাগুলোর প্রবেশাধিকার সীমিত। রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে এখনও মানবিক কর্মকান্ড স্থগিত রয়েছে। মধ্য সেপ্টেম্বর থেকে মধ্য রাখাইনে তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। তারা আরো বলেছেন, জাতিসংঘের হিসাবে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে শরণার্থীদের সহায়তার জন্য প্রয়োজন ২০ কোটি ডলার। অস্থায়ী আশ্রয় ও সুরক্ষা দিতে জাতিসংঘের বিভিন্ন এজেন্সি ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করছে বাংলাদেশ সরকার। বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রতিটি সভায় আমরা তাদের  ধন্যবাদ জানাই সীমান্ত খুলে দিয়ে শরণার্থীদের প্রবেশ করতে দেয়ায় এবং সমস্যা মানবীয় নীতির ভিত্তিতে সমাধানের বিষয়ে। শুনানিতে ভি কেট সোমভংসিরি বলেন, এ সংকটে সক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ইউএসএইড মিশন। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন এজেন্সি ও বিভিন্ন দেশের মিশনপ্রধানদের মধ্যে ডোনার সমন্বয় মিটিংয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছে। গত সপ্তাহে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া বার্নিকাট ও আমাদের মিশন ডাইরেক্টর জানিনা জারুজেলস্কি শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেছেন। তারা যুক্তরাষ্ট্র সরকার কিভাবে সবচেয়ে ভালোভাবে সহায়তা করতে পারে তা জানার চেষ্টা করেন।

 

 

 

সূত্র : মানবজমিন অনলাইন পত্রিকা