মূল ফ্যাক্টর নবীন-প্রবীণ

45

পুরান ঢাকার ১১টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ঢাকা-৬ আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। জনবহুল এ আসনে নানা সমস্যা দীর্ঘদিনের। কিন্তু সময় গড়ালেও এসব সমস্যার সমাধান হয়েছে অল্পই। নাগরিক দুর্ভোগ আর কষ্ট নিয়ে দিন পার করেন এ নির্বাচনী এলাকার মানুষ। তাই সামনে জাতীয় নির্বাচনে বরাবরের মতোই এখানে মূল ফ্যাক্টর হবে নাগরিক সমস্যা। গুরুত্বপূর্ণ এই আসনে কোনো দলের কে প্রার্থী হচ্ছেন এটিও এখন আলোচনার কেন্দ্রে। সময়ের পরিবর্তনে রাজনৈতিকভাবে জমজমাট এই আসনে প্রার্থী নিয়ে জটিলতায় রয়েছে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল। বর্তমান সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশিদ এখন পর্যন্ত সরাসরি মাঠে কাজ করছেন। সম্ভাব্য অন্য প্রার্থীদের সরাসরি তৎপরতা না থাকলেও তারা কৌশলে প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছেন। অংশ নিচ্ছেন বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে। কোতোয়ালি
, সূত্রাপুরসহ ওই নির্বাচনী আসনের বিভিন্ন এলাকার ভোটার ও বাসিন্দারা জানান, নির্বাচনের ঢের সময় বাকি থাকলেও নির্বাচনী আমেজ এখনই টের পাচ্ছেন তারা। সম্ভাব্য প্রার্থীরা বিভিন্ন দিবস ও উপলক্ষকে কেন্দ্র করে এখন থেকেই স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও ভোটারদের প্রার্থিতার বিষয়টি জানিয়ে দিচ্ছেন। পাশাপাশি নির্বাচনী প্রচারণাও চালাচ্ছেন। এলাকাবাসী, ভোটার, সম্ভাব্য প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা বলছেন, পুরনো ঢাকার এই আসনে নাগরিক সমস্যা ও তার সমাধানই হবে এবারের নির্বাচনে ফ্যাক্টর। বিশেষ করে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান, গ্যাস সংকট নিরসন, বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ বাড়ানো, বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, যানজট নিরসনই হবে মূল ইস্যু।
এই আসনে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মিজানুর রহমান খান দীপু (প্রয়াত) পরাজিত করেছিলেন বিএনপির প্রার্থী অবিভক্ত ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকাকে। ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এই আসনে কোনো প্রার্থী দেয়নি। নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইদুর রহমান শহীদকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশিদ। আগামী নির্বাচনে এখানে সরকারি দলের নতুন প্রার্থী আসবে বলে ধারণা করছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা। এখন পর্যন্ত এই আসনে সরকারি দলের বেশকজন প্রার্থীর নাম আছে আলোচনায়। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ, আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য পারভীন জামান কল্পনা, সূত্রাপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার হাজী মোহাম্মদ সাইদ, ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও ৩৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবু আহমেদ মান্নাফী, ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হেদায়েতুল্লাহ স্বপনের নাম উচ্চারিত হচ্ছে। নগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ মানবজমিনকে বলেন, নেত্রী (শেখ হাসিনা) আমাকে দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক বানিয়েছেন। এখন উনি যদি আমাকে এই আসনে মনোনয়ন দেন, আমি নির্বাচন করবো। তবে, এ বিষয়ে এখনই কিছু চূড়ান্ত হয়নি। আমি নেতাকর্মী ও এলাকাবাসীর সঙ্গে মতবিনিময় করছি। নির্বাচনেরও প্রস্তুতি নিচ্ছি। সূত্রাপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি হাজী মোহাম্মদ সাঈদ মানবজমিনকে বলেন, আমি নিজেও মনোনয়ন চাইছি। কিন্তু নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবো। কাকে মনোনয়ন দেয়া হবে সেটি বুঝবো, তারপরেই আমি সিদ্ধান্ত নেব নির্বাচনে যাব কি যাব না। তিনি বলেন, এই নির্বাচনী এলাকায় অনেক জায়গাতেই রাস্তা ভাঙা। এছাড়া সুয়ারেজ সমস্যা, জলাবদ্ধতা, যানজট, গ্যাস বিদ্যুতের সমস্যাতো আছেই। যেই নির্বাচনে জিতে আসুক এসব সমস্যা সমাধান করতে হবে। ঢাকা-৬ নির্বাচনী এলাকার আওয়ামী লীগের একজন নেতা আলাপকালে মানবজমিনকে বলেন, এই নির্বাচনী এলাকায় নানা সমস্যা রয়েছে। ইদানীং বিদ্যুৎ সমস্যা প্রকট হয়েছে। ১ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে দুই ঘণ্টা থাকে না। মাঝে মাঝে গ্যাস সংকটও থাকে।
পুরনো ঢাকার এই আসনটিতে বিএনপি নেতা ও সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা একাধিকবার এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। অবিভক্ত ঢাকার মেয়রও ছিলেন তিনি। নিজস্ব ভোটব্যাংকের পাশাপাশি ওই এলাকায় এখনো প্রভাব ও জনপ্রিয়তা রয়েছে তার। তাই এ আসনে বরাবরই ফ্যাক্টর সাদেক হোসেন খোকা। তবে, এবারের চিত্র একটু ভিন্ন। বিদেশে অবস্থানরত ও দুর্নীতির মামলায় কারাদণ্ডপ্রাপ্ত খোকার আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে সংশয় ও সন্দেহ রয়েছে খোদ খোকারই অনুসারীদের মাঝেই। তবে, নির্বাচনের আগে আইনি ঝামেলা শেষ করতে পারলে খোকার মনোনয়নের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা। তবে, সাদেক হোসেন খোকার বিকল্প হিসেবে তার ছেলে ইশরাক হোসেনের নামটি চলে এসেছে সামনে। ঢাকা-৬ নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীরা বলছেন খোকার অবর্তমানে ছেলে ইশরাক হোসেন আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন চাইতে পারেন। এই আসনে বিএনপি ও তার নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট থেকে আরো যারা মনোনয়ন চাইতে পারেন তারা হলেন- ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাশার, ২০ দলীয় জোটের শরিক এনডিপির (ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি) প্রেসিডিয়াম সদস্য রাশেদুর রহমান রাকেশ (রাকেশ রহমান), বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সাবেক সভাপতি হামিদুর রহমান হামিদ। প্রবাসী তরুণ এনডিপি নেতা রাকেশ রহমান ইতিমধ্যে বিএনপির কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নিয়মিতই যোগাযোগ রাখছেন। বিদেশে বসেই আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন জোরেশোরে। মানবজমিনকে তিনি বলেন, ২০ দলীয় জোটের ব্যানারে ঢাকা-৬ আসনে নির্বাচনের ইচ্ছা রয়েছে আমার। বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আমার যোগাযোগও ভালো। এলাকাবাসীও আমাকে এবং আমার পরিবারকে চিনে। আশা করি আমি মনোনয়ন পাবো। আর মনোনয়ন পেলে ভোটারদের মধ্যে প্রভাব ফেলতে পারবো বলে মনে করি।
ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাশার বলেন, আমি নিজেও এই নির্বাচনী এলাকার একজন প্রার্থী। প্রচার প্রচারণাও চালাচ্ছি। তিনি বলেন, সাদেক হোসেন খোকা দেশে আত্মসমর্পণ করে আপিল করতে হবে। তাছাড়া তিনি অসুস্থ। এ অবস্থায় তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কিনা-সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে। তবে, দল থেকে যদি বিবেচনা করে তাকে মনোনয়ন দেয় তাহলে আমরা তার পক্ষেই কাজ করবো। কাজী আবুল বাশার আরো বলেন, শুনেছি খোকা সাহেব না আসলে তার ছেলে (ইশরাক) মনোনয়ন চাইতে পারে। তবে তিনি (খোকা) যদি নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন তাহলে এই আসনে বিএনপির শক্তিশালী প্রার্থী আমিই। ঢাকা-৬ নির্বাচনী এলাকার সমস্যা নিয়ে তিনি বলেন, এখানে কি সমস্যা নেই? জলাবদ্ধতা, যানজট, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ নাগরিক জীবনের অনেক সুবিধাই এখানে অনুপস্থিত। তবে, বর্তমান এমপিকে আমি দোষ দিচ্ছি না। ব্যক্তি হিসেবে তিনি সজ্জন। কিন্তু আমাদের অবস্থান পুরনো ঢাকায়। এখানে আয়তনের তুলনায় মানুষ খুবই বেশি। তাই জনদুর্ভোগেরই শেষ নেই। আর জাতীয় পার্টি থেকে এমপি হওয়ার কারণে আওয়ামী লীগ থেকে তাকে তেমন মূল্যায়নও করা হয় না। এই নির্বাচনী এলাকার একটি থানার বিএনপির একজন শীর্ষ নেতা আলাপকালে বলেন, কেবল অর্থবহ নির্বাচন হলেই বিএনপি নির্বাচনে যাবে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে এই নির্বাচনী এলাকার নেতাকর্মীদের নামে একের পর এক মামলা হয়েছে। আমাকেও মাসের সব ক’টি কার্যদিবসে আদালতের বারান্দায় ঘুরতে হয়। এখন এ অবস্থায় নির্বাচনী প্রচার প্রচারণাও খুব একটা করতে পারছি না। তবে, নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে সবকিছু স্বাভাবিক অবস্থায় চলে আসবে বলে মনে করি।
এদিকে আগামী সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি থেকে এ আসনে মনোনয়ন চাইবেন দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও বর্তমান এমপি কাজী ফিরোজ রশীদ। জাতীয় পার্টি আগামী নির্বাচনে এককভাবে নির্বাচন করবে বলে দলটির চেয়ারম্যান বারবার বলে আসছেন। তবে, নির্বাচনী ডামাডোলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টির জোটবদ্ধ হলেও এ আসনটি আবারো কাজী ফিরোজ রশিদকে ছেড়ে দিতে নারাজ ঢাকা-৬ নির্বাচনী এলাকার বেশিরভাগ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী। ব্যক্তি ফিরোজ রশিদের ব্যাপারে তাদের আপত্তি না থাকলেও এই আসনটি জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দিতে আপত্তি রয়েছে তাদের। যদিও আপত্তির বিষয়টি এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। তবে, নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসলে এবং নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানের বিষয়টি স্পষ্ট হলেই এ বিষয়টি সামনে চলে আসবে বলে মনে করেন এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থিতা দাবিদাররা। সূত্রাপুর থানা আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষ নেতা বলেন, বর্তমান এমপি (কাজী ফিরোজ রশিদ) লোক ভালো। তার ইমেজ নিয়ে আমাদের কোনো কথা নেই। এই নির্বাচনী এলাকায় নানা নাগরিক সমস্যা রয়েছে। কিন্তু নির্বাচনের আগে সমস্যা সমাধানে যেসব কমিটমেন্ট তিনি করেছিলেন সেসব কমিটমেন্ট তিনি রাখতে পারেননি।