যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল স্কুলের সাড়ে ৬ কোটি টাকা লোপাট

27

যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৭ সালে মার্চ পর্যন্ত মোট আটটি খাতে সাড়ে ৬ কোটি টাকা লুটপাট হয়। অর্থ লুটপাটের অভিযোগে অধ্যক্ষ মো. আবু ইউসুফকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাসহ ফৌজদারি মামলা করার প্রস্তুতি চলছে
। আর্থিক অনিয়মকে আরো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)কে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। এর আগে ২০০৯ ও ২০১৪ সালে ওই প্রতিষ্ঠানের ৪ কোটি টাকা আর্থিক অনিয়ম পাওয়া যায়। অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হলেও অদৃশ্য কারণে তিনি ছাড় পেয়ে যান। এরপর থেকেই তিনি আরো বেশি অনিয়মের সঙ্গে জড়ান। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) তদন্ত করে এই আর্থিক অনিয়ম পেয়েছে। আত্মসাতের বিবরণীতে দেখা যায়, দৈনন্দিন আদায় করা টাকা রেজিস্ট্রারের এন্ট্রি টাকা জমা খরচে কম দেখিয়ে ৩৯ লাখ ৮৯ হাজার ৩৭১ টাকা আত্মাসাৎ করা হয়। দৈনন্দিন জমা খরচ এবং ব্যাংক বিবরণী অনুযায়ী ২০১৭ সালের মার্চ পর্যন্ত ৪ কোটি ১০ লাখ ৭৮ হাজার ৫৮২ টাকা থাকার কথা। কিন্তু ১ কোটি ৫২ লাখ ৮০ হাজার ৩৫৯ টাকা দেখিয়ে ২ কোটি ৫৭ লাখ ৯৮ হাজার ২২৩ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। দৈনিক জমা খরচ খাতা অনুসারে ১ কোটি ১৬ লাখ ৭৫ হাজার ৬১০ কোটি টাকা নগদ থাকার কথা। বাস্তবে ছিল ২ কোটি ৯০ লাখ। ক্যাশ খাতে ১ কোটি ১৩ লাখ ৮৫ হাজার ৬১০ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। শিক্ষক কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ তহবিল (পিএফ) থেকে ১১ লাখ ৮৯ হাজার ৩০৫ টাকা জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে। ঋণ পরিাশোধের নামে ভুয়া ও অপ্রয়োজনীয় ঋণ পরিশোধ দেখিয়ে প্রতিষ্ঠান থেকে ৭৯ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। কোন ধরনের ভাউচার ছাড়াই ৮৮ লাখ ৬৭ হাজার এবং বিল ভাউচারবিহীন খাতে ৪০ লাখ ৯২ হাজার ৮০৩ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। যা কমিটির অনুমোদন নেয়া হয়নি। প্রত্যেকটি আত্মসাতের ব্যাপারে অধ্যক্ষ আলাদা লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন। দৈনন্দিন আয় কম দেখানোর ব্যাপারে অধ্যক্ষ আবু ইউসুফ লিখিতভাবে জানান, কম দেখানো তথ্যটি সঠিক। দাপ্তরিক ব্যস্ততার কারণে এই অনিয়মের বিষয়টি বুঝতে পারেনি। এ অনিয়মের জন্য তিনি মার্জনা কামনা করেন এবং ৩৯ লাখ ৮৯ হাজার ৩৭১ টাকা আত্মসাতের কথা লিখিতভাবে স্বীকার করেন। নগদ স্থিতি (ক্যাশ ব্যালেন্স) কম দেখিয়ে দুই কোটি সাতান্ন লাখ ৯৮ হাজার ৩৫৯ টাকা আত্মসাৎ করেছেন অধ্যক্ষ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১২ সালের ১লা জানুয়ারির দৈনিক জমা খরচের বহিতে নগদ স্থিতি ছিল না। কিন্তু ব্যাংক বিবরণী অনুসারে দুই লাখ ৪০ হাজার ৫৫৮ হাজার টাকা ব্যাংকে স্থিতি ছিল। ২০১২ সাল থেকে ২০১৭ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের আয় ২৮ কোটি ৩২ লাখ ২৩ হাজার ৭৫৮ টাকা। একই সময়ে ব্যয় দেখানো হয়েছে ২৪ কোটি ২৩ লাখ ৮৫ হাজার ৭৩৪ টাকা। এই হিসেবে মোট উদ্বৃত্ত থাকার কথা চার কোটি ১০ লাখ ৭৮ হাজার ৫৮২ টাকা। তদন্তকালে নগদ জমা খরচের খাতায় এক কোটি ১৪ লাখ ৯৪ হাজার ৫৪৪ টাকা এবং ব্যাংক বিবরণী অনুযায়ী জমা ছিল ৩৭ লাখ ২৫ হাজার ৮১৫ টাকা। দুই খাতের হিসাবে জমা দেখানো হয়েছে মোট এক কোটি ৫২ লাখ ৮০ হাজার ৩৫৯ টাকা। বাকি দুই কোটি ৫৭ লাখ ৯৮ হাজার ৩৫৯ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে লিখিত জবাবে অধ্যক্ষ সত্যতা স্বীকার করে বলেন, অর্থ আদায়ের সঙ্গে শিক্ষক-কর্মচারীরা সম্পৃক্ত থাকেন। দাপ্তরিক ব্যস্থতার জন্য সব সময়ে মনিটরিং করা সম্ভব হয়নি। অধ্যক্ষ এর জন্য শিক্ষক-কর্মচারীদের ওপর দায় চাপিয়ে ক্ষমা চাইলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিধি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের ব্যাংক হিসাব নিশ্চিত করার দায়িত্ব অধ্যক্ষের।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দৈনন্দিন জমা খরচের খাতায় ২০১২ সালের আগস্ট মাসে নদগ স্থিতি ছিল দুই লাখ ৯৩ হাজার ৪১০ টাকা। কিন্তু পরবর্তী লেনদেন দিবসে উক্ত নগদ টাকা স্থিতি না দেখিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে। অধ্যক্ষ এ ব্যাপারে লিখিত জবাবে বলেন, জমা খরচের খাতায় টাকা কম দেখানো তথ্য সঠিক। অনিচ্ছাকৃত এরূপ আর্থিক অনিয়মের জন্য ক্ষমা প্রার্থী। ভবিষ্যতে এরূপ অনিয়ম হবে না মর্মে তিনি অঙ্গীকার করেন। শিক্ষক-কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ তহবিলের (পিএফ) ১১ লাখ ৮৯ হাজার ৩০৫ টাকা জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করার প্রমাণ পেয়েছে ডিআইএর কর্মকর্তারা। তার প্রতিবেদনে বলেন, পিএ-এর ব্যাংক সনদ, চেক যাচাইয়ে দেখা যায়, ২৬শে ফেব্রুয়ারি ২০১৫ সালে পিএফ জমা দেয়া জন্য সোনালী ব্যাংক যাত্রাবাড়ী শাখা (হিসাব নম্বর ১৬১০৫৩৪০৫) হতে চেক নম্বর ৭৫৩৩২৩৪ এর মাধ্যমে ১১ লাখ ৮৯ হাজার ৩০৫ টাকা অধ্যক্ষ আবু ইউসুফ তোলেন। কিন্তু ওই টাকা জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। অধ্যক্ষ বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, সহসাই ওই টাকা পর্যায়ক্রমে পরিশোধ করবেন। তবে পিএফ এর টাকা জমা না দিয়ে তিনি আর্থিক বিধি লঙ্ঘন করেছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ঋণ পরিশোধের নামে ৭৯ লাখ টাকা অর্থ আত্মসাৎ করেছেন অধ্যক্ষ। এ ব্যাপারে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক বিবরণী, জমা-খরচ রেজিস্টার, ভাউচার ও অধ্যক্ষের বক্তব্য যাচই করে দেখা যায়, ২০১৫ সালের জুলাই মাস থেকে ২০১৬ সালের ১৯শে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে ঋণ গ্রহণ ও পরিশোধের নামে মোট ৭৯ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
পুরো অভিযোগের ব্যাপারে কলেজের অধ্যক্ষ আবু ইউসুফ মানবজমিনকে বলেন, ডিআইএ প্রতিবেদন মনগড়া। যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তা সত্য নয়। কারণ আমার আবেদনের প্রেক্ষিতে চেম্বার জজ তা স্থগিত করেছেন। অভিযোগ সত্য হলেও স্থগিত করলো কেন? তিনি বলেন, একেক সংস্থার রিপোর্টে একেক ধরনের তথ্য আসে। আসলে কোনটা সত্য। শিক্ষা বোর্ড দুইদফা তদন্ত করে আর্থিক অনিয়ম পায় না। আর ডিআইএ তদন্ত করে কোটি কোটি টাকার অনিয়ম পেয়ে গেল। লিখিত জবাবের ব্যাপারে তিনি বলেন, তারা তদন্ত করতে এসেছে, লিখিত চেয়েছেন আমি দিয়েছি। স্কুলে যাচ্ছেন না কেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। স্কুলের নানা সমস্যা চলছে এজন্য যাচ্ছি না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রতিষ্ঠানটির সাবেক একজন প্রধান শিক্ষক অধ্যক্ষের আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন। এর প্রেক্ষিতে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডকে তদন্ত করতে নির্দেশ দেয় আদালত। বোর্ড দুই দফা তদন্ত করে প্রথমে কোনো আর্থিক অনিয়ম পায়নি। দ্বিতীয় তদন্তে কয়েক লাখ টাকা আর্থিক অনিয়ম পাওয়ার কথা জানায় আদালতকে। বোর্ডের তদন্ত রিপোর্ট ও ডিআই এর প্রতিবেদনে ব্যাপক গড়মিল হওয়ায় ২০১৪ সালে ডিআইএ তদন্ত রিপোর্ট আমলে নেয়। সেই রিপোর্টে ৪ কোটি টাকার বেশি আত্মসাতের কথা বলা হয়। তৃতীয় দফায় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) কে তদন্ত করতে বলা হয়। মাউশি তদন্তে অপারগতা দেখালে ফের ডিআইএকে তদন্ত করতে বলে হাইকোর্ট। এজন্য সপ্তাহখানেক সময় বেঁধে দেয়া হয়। এরপর সংস্থাটি ১লা এপ্রিল টানা তিনদিন ডিআইএ ৬ জনের একটি টিম সরজমিন উপস্থিত হয়ে নিরীক্ষাটি করেন। টিমে ছিলেন একজন উপ-পরিচালক, দুইজন পরিদর্শক, একজন সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক এবং দুইজন অডিট অফিসার। তারা গত ১০ই এপ্রিল হাইকোর্ট হাজির হয়ে অডিট রিপোর্ট জমা দেন।