যুক্তরাষ্ট্র-উত্তর কোরিয়া পাল্টাপাল্টি যুদ্ধ কি আসন্ন?

39

কয়েকদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে সৃষ্ট উত্তেজনা রীতিমতো যুদ্ধের দোরগোড়ায় পৌঁছেছে। দু’পক্ষের মধ্যে চলছে হুমকি আর পাল্টা হুঁশিয়ারির প্রতিযোগিতা। কখনও ট্রামেপর হুঁশিয়ারিতে পাল্টা হুমকি দিচ্ছেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন। আবার কখনও কিম জং উনের বেপরোয়া হুমকির জবাবে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন ট্রামপ। এমতাবস্থায় পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নিবে তা বোঝা দায় হয়ে পড়েছে। উল্লেখ্য, জুলাই মাসে উত্তর কোরিয়া দু’টি আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালানোর পরপরই দু’দেশের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমাগত বাড়তে থাকে। ওই পরীক্ষার জবাবে নতুন নিষেধাজ্ঞার খসড়া উত্থাপন করা হয় জাতিসংঘে। পরবর্তীতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে সর্বসম্মতভাবে পাস হয় ওই খসড়া। উত্তর কোরিয়ার ওপর আরোপ করা হয় নতুন নিষেধাজ্ঞা। এই নিষেধাজ্ঞার পাল্টা জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালানোর হুমকি দেয় উত্তর কোরিয়া। আর দুই দেশের এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিদিন গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত হচ্ছে সমপাদকীয়, উপ-সমপাদকীয়, বিশ্লেষণ আর মতামত। বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন যুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আবার কেউ কেউ বলছেন যুদ্ধ নাও হতে পারে। বৃটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, উত্তর কোরিয়ার হুমকির ভিত্তি নেই। কারণ এই হুমকি ‘দরকষাকষির হাতিয়ার’ ছাড়া কিছুই না। অপরদিকে দ্য ইকোনমিস্ট, সিএনএনসহ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশ হচ্ছে যুদ্ধ শুরু হলে তা কিভাবে শুরু হবে আর কিভাবে শেষ হবে অথবা কিভাবে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব অথবা কিভাবে উত্তর কোরিয়া হামলা শুরু করতে পারে ইত্যাদি নিয়ে নানা প্রতিবেদন। পুরো বিষয়টি নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে পুরো বিশ্ব। এমনকি বিভক্ত মার্কিন প্রশাসনও। একদিকে ট্রাম্প হুংকার ছেড়েই যাচ্ছেন যে উত্তর কোরিয়ার পরিণতি ভালো হবে না। অপরদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস দিচ্ছেন কূটনীতিক সমাধানের আশ্বাস। যুদ্ধ যদি আসলেই শুরু হয় তবে তা শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র আর উত্তর কোরিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা কম। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুল ইতিমধ্যে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালালে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেতে প্রস্তুত তার দেশ। ওদিকে, উত্তর কোরিয়ার প্রধান মিত্র চীন জানিয়েছে, যদি উত্তর কোরিয়া প্রথম হামলা চালায় তাহলে যুদ্ধের ব্যাপারে নিরপেক্ষ থাকবে তারা। তবে যুক্তরাষ্ট্র বা দক্ষিণ কোরিয়া যদি উত্তর কোরিয়ার ওপর প্রথম হামলা চালায় তাহলে তাদের থামাতে ময়দানে নামবে চীন। সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, জেমস ম্যাটিসের আশ্বাস থাকলেও পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে।
উত্তর কোরিয়াকে ট্রামেপর হুঁশিয়ারি: সমপ্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রামপ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কোনো হামলা করলে উত্তর কোরিয়ার সন্ত্রস্ত থাকা উচিত। তিনি আরো বলেছেন, ‘উত্তর কোরিয়া যদি হুঁশে ফিরে না আসে তাহলে, এমন বিপদের সম্মুখীন হবে, যেরকম সমস্যার সম্মুখীন খুব কম দেশই হয়েছে।’ যুক্তরাষ্ট্রের গুয়াম অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে চারটি পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছে, উত্তর কোরিয়ার এমন মন্তব্যের পরপরই এ হুঁশিয়ারি দেন ট্রামপ। উল্লেখ্য, এ সপ্তাহে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে ‘ফায়ার এন্ড ফিউরি’ পদক্ষেপ নেয়ার হুমকি দিয়েছিলেন ট্রামপ। ট্রামপ বলেছিলেন, ‘আমি আপনাদেরকে এটা বলবো যে, যদি উত্তর কোরিয়া আমাদের প্রিয়জন অথবা যারা আমাদের প্রতিনিধিত্ব করে অথবা আমাদের মিত্র, এমন কারও ওপর হামলা করার উদ্দেশ্যে কিছু করে তাহলে তাদের খুবই সন্ত্রস্ত থাকা উচিত। আমি এজন্যে এটা বলবো যে, এমন অনেক কিছু হবে যা তারা (উত্তর কোরিয়া) আগে কখন সম্ভব ভাবেনি।’ তবে ট্রামপ এও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনো আলোচনা করতে প্রস্তুত।
কূটনৈতিক পন্থাতে ভরসা রাখছেন ম্যাটিস: এদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস বলছেন, উত্তর কোরিয়া ইস্যুর সমাধান কূটনৈতিক পদ্ধতিতেই করা সম্ভব বলে আশাবাদী যুক্তরাষ্ট্র। তিনি বলেন, দু’পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হওয়াটা হবে বিপর্যয়কর। আর এ অবস্থায় কূটনৈতিক সমাধানই তাদের অগ্রগতির। বৃহসপতিবার তিনি বলেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে সংঘাতের জন্যে প্রস্তুত থাকাটা আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কিন্তু তিনি এও বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন ও জাতিসংঘে নিয়োজিত মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালির কূটনৈতিক চেষ্টার অগ্রগতি হচ্ছে। ম্যাটিস বলেন, যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্বন্ধে সবাই জানে। এটা সর্বনাশা হবে- এছাড়া আর কোনো শ্রেণীকরণ প্রয়োজন নেই।
উত্তর কোরিয়া হামলা চালালে চীন কি নিরপেক্ষ থাকবে: উত্তর কোরিয়ার প্রধান মিত্র দেশ চীন। আর তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ বাঁধলে চীন কি করবে তা নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে। অবশ্য উত্তর কোরিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একমত হয়ে ভোট দিয়েছে চীন। চীনের রাষ্ট্র-পরিচালিত গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, যদি উত্তর কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালায় তাহলে চীন নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখবে। ডনাল্ড ট্রামপ উত্তর কোরিয়াকে সতর্ক করে মন্তব্য করার পরেই গ্লোবাল টাইমসের এক সমপাদকীয়তে এমন কথা বলা হয়। ওই সমপাদকীয়তে বলা হয়েছে, চীনের এটা পরিষ্কার করে দেয়া উচিত যে, উত্তর কোরিয়া যদি যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালায় আর যুক্তরাষ্ট্র এর জবাব দেয় তাহলে চীন নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখবে। সমপাদকীয়টিতে আরো বলা হয়েছে, তবে যদি যুক্তরাষ্ট্র বা দক্ষিণ কোরিয়া, উত্তর কোরিয়ার ওপর হামলা চালায় বা উত্তর কোরিয়াকে ধ্বংস করার চেষ্টা করে ও কোরিয়ান উপদ্বীপের রাজনৈতিক দৃশ্যপট পরিবর্তনের চেষ্টা করে তাহলে এমনটি ঘটতে দিবে না চীন। উল্লেখ্য, বিশ্বজুড়ে পঠিত গ্লোবাল টাইমস চীনা সরকারি নীতির প্রতিনিধিত্ব করে না।
উত্তর কোরিয়া হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে থাকবে অস্ট্রেলিয়া: এদিকে নতুন এক মন্তব্য করে পরিস্থিতি আরো চাঞ্চল্যকর করে তুলেছেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানিয়েছেন, উত্তর কোরিয়া যদি যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালায় তাহলে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেতে প্রস্তুত তার দেশ। শুক্রবার স্থানীয় রেডিও ৩এডব্লিউওকে বলেন, ‘আমেরিকা (বিপদের সময়) অবশ্যই অস্ট্রেলিয়াসহ তার মিত্রদের পাশে দাঁড়ায়। আর আমরা আমেরিকার পক্ষে দাড়াবো। এ বিষয়টি খুব পরিষ্কারভাবে বুঝে নিন। যদি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর হামলা হয় তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্যে অস্ট্রেলিয়া এগিয়ে আসবে। কারণ আমাদের ওপর হামলা হলে আমেরিকাও এগিয়ে আসতো।’ উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে ১৯৫১ সালে স্বাক্ষর করা নিরাপত্তা বিষয়ক চুক্তি আনজুস অনুসারে, যদি এই তিন রাষ্ট্রের মধ্যে কোনো রাষ্ট্র অন্য কোনো রাষ্ট্র থেকে হামলার সম্মুখীন হয় তাহলে বাকি দুই রাষ্ট্র সাহায্যে এগিয়ে আসবে। এখন পর্যন্ত ওই চুক্তি একবারই কার্যকর করেছে অস্ট্রেলিয়া- যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ হামলার সময় আমেরিকান সেনাদের সঙ্গে আফগানিস্তানে সেনা পাঠিয়ে। আর তখন থেকেই নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি স্থগিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
এদিকে দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টের এক খবরে বলা হয়েছে, উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষমতার ভয়ে ‘বোম্ব শেল্টার’ কিনছে জাপানের মানুষরা। উল্লেখ্য, উত্তর কোরিয়া যদি গুয়ামে হামলা চালায়, তাহলে দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এরপর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে জাপান।