যে দুর্ভোগের শেষ নেই….

22

বর্ষা মৌসুমে উন্নয়ন কাজের খোঁড়াখুঁড়ি নগরবাসীর জন্য বিষফোঁড়ায় পরিণত হয়েছে। নগরজীবনে টেনে এনেছে ভোগান্তি, দুর্ভোগ, দুর্দশা। নগরীর প্রধান সড়কই শুধু নয়, অলিগলি পর্যন্ত চলছে খোঁড়াখুঁড়ির মহোৎসব। কোথাও আবার রাস্তা খুঁড়ে ফেলে রাখা হয়েছে দিনের পর দিন। এ অবস্থায় সড়ক-মহাসড়কগুলো যেন অভিভাবকহীন। সরজমিন দেখা গেছে বেশির ভাগ সড়ক ও ফুটপাথে উন্নয়নের কাজ করছে সিটি করপোরেশন। কাজের ক্ষেত্রে বিভিন্ন শর্ত থাকলেও ঠিকাদাররা তা মানছেন না। ফলে সময়মতো রাস্তার কাজ সম্পন্ন হচ্ছে না। এতে ভোগান্তির মাত্রা বেড়ে যায়। এছাড়া একই স্থানে ভিন্ন ভিন্ন সংস্থা একাধিক বার খোঁড়াখুঁড়ির কারণেও ভোগান্তি বাড়ে। ডিএনসিসি, ডিএসসিসি, রাজউক, ওয়াসা, তিতাস গ্যাস, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন (ডিপিডিসি), পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিটিআরসি, এলজিইডি, ডেসকোসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নগরীতে উন্নয়নকাজ করে। কাজের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্য কোনো সমন্বয় নেই। তাই দেখা যায় একই রাস্তা এক প্রতিষ্ঠান তার কাজ শেষ করে চলে যাওয়ার পর আরেক প্রতিষ্ঠান এসে তা ফের খুঁড়ছে। রাস্তা কাটার জন্য অনুমতি নেয়ার নিয়ম থাকলে তা নেয়া হয় না। সমন্বয়নহীন কাটাকাটির ফলে মাটি, ইট, পাথর ও বালি পড়ে চলাচলে বিপত্তি বাধায়। রাজারবাগ, মালিবাগ মোড়, শান্তিনগর, মৌচাক ও মালিবাগ রেলগেট এলাকাজুড়ে ডিএসসিসি ড্রেন-নর্দমা নির্মাণ করছে। আবার একই এলাকায় চলছে ফ্লাইওভারের নির্মাণকাজ। ফ্লাইওভারের স্লাব, আই গ্রাডার, বিম, ঢালাইয়ের কাজের ফলে রাস্তায় চলাচলের উপায় নাই। সরজমিন নগরীর আগারগাঁও গিয়ে দেখা যায়, সেখানে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটক থেকে শুরু করে তালতলা পর্যন্ত রাস্তায় মেট্রোরেলের কাজ চলছে। প্রায় ছয় মাস ধরে চলা এই কাজের এখানো নিষ্পত্তি হয়নি। আগারগাঁও নার্সারির সামনে মেট্রোরেলের একটি স্টেশন করার পরিকল্পনা আছে। এজন্য সেখানকার মাটির নিচে থাকা ওয়াসা, ডিপিডিসি, বিটিসিএল, তিতাসসহ একাধিক সংস্থার কাজ চলছে দু’দিন পর পর। ফলে এই এলাকার বাসিন্দাদের দুর্ভোগ শেষ হচ্ছে না। রায়হান শেখ নামের এক বাসিন্দা জানান, শুকনা থাকলেও ভোগান্তি, বৃষ্টি হলেও ভোগান্তি। এছাড়া কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, মিরপুর-১০, মিরপুর-১১সহ আরো কিছু এলাকায় মেট্রোরেল নির্মাণের জন্য সৃষ্ট গর্ত এখানো ঠিকমতো ভরাট করা হয়নি। বেশকিছু স্থানে নির্মাণ সামগ্রী ফেলে রাখা হয়েছে। সড়কের সঙ্গে ফুটপাত মিশে একাকার হয়ে গেছে। ফলে এসব রাস্তা দিয়ে এখনো পথচারীরা চলাচল করতে পারে না। একাধিক নির্মাণ শ্রমিকের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, মেট্রোরেলের মূল কাজ এখনো শুরু হয়নি। এখন শুধু বিভিণ্ন উন্নয়ন সংস্থার লাইন স্থানান্তরের কাজ চলছে। মিরপুরের বাসিন্দা আলী হোসেন জানান, উন্নয়ন কাজের সৃষ্ট গর্ত মেরামত করে না দেয়ার কারনে ভোগান্তি বেড়ে গেছে। বৃষ্টি হলে পানি জমে কাদার সৃষ্টি হয়। আর বৃষ্টি না হলে কাদা শুকিয়ে ধুলার সৃষ্টি হয়। মৌচাক, মালিবাগ গিয়ে দেখা যায়, এই এলাকায় এখনো খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। সিটি করপোরেশনের ড্রেন ও ফুটপাত মেরামতের কাজ দীর্ঘদিন ধরে একনাগাড়ে চলছে। সিটি করপোরেশন ছাড়াও আরো কিছু উন্নয়ন সংস্থা এই এলাকায় কাজ করছে। এছাড়া ফ্লাইওভার নির্মাণের জন্য সৃষ্ট গর্ত এখানো মেরামত করা হয়নি। ফ্লাইওভার নির্মাণ সামগ্রীও রাস্তার উপরে ফেলে রাখার কারণে রাস্তা সরু হয়ে গেছে। ফুটপাত আর সড়ক মিশে একাকার হয়ে গেছে। এজন্য পথচারী ও যানবাহন চলাচলে বেগ পেতে হচ্ছে। শান্তিনগর, রাজারবাগ, কাকরাইলে চলছে ফুটপাত মেরামতের কাজ। মৌচাক মোড় থেকে মালিবাগ রেলগেটের বেহাল দশা এখনো আগের মতো। রাস্তার দু’পাশে সমান তালে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। মালিবাগ রেল গেট থেকে রামপুরা ব্রিজ পর্যন্ত যেন খোঁড়াখুঁড়ির এক মহোৎসব চলছে। প্রায় ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার এই রাস্তার দুইপাশে ফুটপাত আর ড্রেন নির্মাণের কাজের জন্য এলাকাবাসীর দুর্ভোগ চরমে গিয়ে পৌঁছেছে। ফিরোজ আলম নামের স্থানীয় এক ব্যবসায়ী জানান, গত কয়েকমাস ধরে এই কাজ চলছে। কাজে ধীর গতি থাকার কারণে ভোগান্তি দীর্ঘ হচ্ছে। রামপুরা ব্রিজ থেকে প্রগতি সরণি নতুনবাজার বাড্ডা, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, বংশাল, মিটফোর্ড, ইসলামপুর, বংশাল, নবাবপুর বনশ্রী, গ্রীন রোড, বাসাবো, খিলগাঁও, মিরপুরের একাধিক এলাকায় উন্নয়ন কাজের খোঁড়াখুঁড়িতে অতিষ্ঠ নগরবাসী। সূত্রে জানা যায়, দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এখন রাস্তা, ফুটপাত ও নর্দমা উন্নয়নে দু’টি বড় প্রকল্পের কাজ চলছে। প্রায় এক হাজার ২০০ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের আওতায় শান্তিনগর, মালিবাগ, বংশাল, নবাবপুর, ধানমন্ডি, বনশ্রী, গ্রীন রোডে উন্নয়ন কাজ চলছে। ৭৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে আরেক প্রকল্পের আওতায় যাত্রাবাড়ী, খিলগাঁও, মানিকনগর এলাকায় কাজ চলছে। মেগা প্রকল্পের কাজ হয়েছে শতকরা ২৫-৩০ ভাগ। অন্যটি কাজ শুরুর প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। বছরজুড়েই সংশ্লিষ্ট এলাকায় এ কাজ চলবে। চলতি অর্থবছরে সড়ক উন্নয়ন কাজে ৯৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বর্তমানে চলমান কাজের সঙ্গে এ বিপুল অঙ্কের টাকাও খরচ হবে উন্নয়ন কাজে। এসব কাজের জের ধরে রাজধানীবাসীর ভোগান্তি বাড়বে কয়েক গুণ। ডিএনসিসি সূত্রে জানা যায়, ডিএনসিসি’র এক হাজার ৩৫০ কিলোমিটার সড়ক, ৩২৫ কিলোমিটার নর্দমা, এক হাজার ২৫০ কিলোমিটার উন্মুক্ত নর্দমা-পাইপ রয়েছে। এর মধ্যে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৯৫ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার রাস্তা, ৮৪.৭২ কিলোমিটার নর্দমা-পাইপ ও ২৭ কিলোমিটার ফুটপাত সংস্কার ও উন্নয়ন করা হয়েছে। গত দুই বছরে উত্তরার ১, ৩ ও ১৪ নম্বর সেক্টর, গুলশান, বনানী, বারিধারা এলাকার সড়ক, নর্দমা ও ফুটপাত নির্মাণকাজে ৪২২ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৭৬ কিলোমিটার রাস্তা, ২৪২ কিলোমিটার নর্দমা, ৬৯ কিলোমিটার ফুটপাত উন্নয়নকাজ হয়েছে। চলতি অর্থবছরেও সড়ক, ফুটপাত ও সারফেস ড্রেন উন্নয়ন কাজে ২৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা বছরজুড়ে চলমান উন্নয়ন কাজের সঙ্গে যোগ হবে।
এদিকে নগরীতে উন্নয়ন কাজের খোঁড়াখুঁড়ির সঙ্গে প্রধান প্রধান সড়কগুলোতে খানাখন্দের ভোগান্তিতে নগরজীবন অতীষ্ট হয়ে পড়েছে। নগরীর অলিগলির রাস্তাগুলো এখন খানাখন্দে ভরপুর। গত কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে বিভিন্ন রাস্তায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছিল। পানি সরে যাওয়ার পর বেরিয়ে আসছে খানাখন্দ। আগে থেকেই বেহাল সড়কটির বিভিন্ন অংশ বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে আরো ভেঙেছে। ফলে জলাবদ্ধতা না থাকলেও যানবাহন চলছে খুবই ধীরগতিতে। রাপা প্লাজা থেকে আড়ং পর্যন্ত সড়কের পশ্চিম পাশের ১০ ফুটের বেশি অংশ ভেঙে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ধানমন্ডি ১৫ থেকে একটি সড়ক চলে গেছে রায়েরবাজার স্কুল হয়ে শেরেবাংলা সড়ক। দেড় কিলোমিটারের মতো দীর্ঘ এ সড়কের প্রায় পুরোটাই ভাঙা। বিটুমিন উঠে গিয়েছিল অনেক আগেই। এবারের বর্ষণের পর এ রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলাচল এক রকম বন্ধই হয়ে গেছে। পশ্চিম ধানমন্ডির আফসারউদ্দিন মসজিদ থেকে ঝিগাতলা কাঁচাবাজার পর্যন্ত নতুন সড়কটিও বেহাল। ট্যানারি মোড় থেকে গাবতলী মসজিদ হয়ে ঝিগাতলা বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত সড়কেরও বেহাল অবস্থা। ট্যানারি মোড় থেকে ঝিগাতলা পোস্ট অফিস পর্যন্ত রাস্তায় শ’ শ’ খানাখন্দ। কোথাও ছোট গর্ত আবার কোথাও বড় গর্ত। ছোট-বড় এসব গর্তের সংস্কার করা হচ্ছে না বহুদিন ধরে। মালিবাগ থেকে রামপুরা, রামপুরা সেতু থেকে বনশ্রীর মূল সড়ক, বাড্ডা, নতুনবাজার ও প্রগতি সরণি এলাকার বেশির ভাগ রাস্তাই হয়ে পড়েছে চলাচলের অনুপযোগী। চলতে গিয়ে যাত্রীদের পোহাতে হয় তীব্র ভোগান্তি। মালিবাগ রেলগেট থেকে আবুল হোটেল পর্যন্ত রাস্তাটি অল্প বৃষ্টিতেই ডুবে যায়। পুরো রাস্তায় পুকুর সমান গর্ত। খানা-খন্দ, পানি-কাদায় চলা দায়। ফ্লাইওভার নির্মাণের জন্য সৃষ্ট গর্তে প্রধান ব্যস্ততম সড়কের বেহাল দশা। ফলে এসব রাস্তায় গাড়ির চাকা ঘুরতে চায় না। তুরাগ বাসের চালক রহিম মিয়া জানান, এই সড়কে একদিন গাড়ি চালালে যা আয় হয় তার চেয়ে বেশি টাকার গাড়ির ক্ষতি হয়। না পেরে এই রাস্তায় গাড়ি চালান তিনি। আবুল হোটেল থেকে শুরু করে রামপুরা সেতু পর্যন্ত রাস্তার এক পাশে পুরো রাস্তাই খানা-খন্দে ভরপুর। বড় বড় গর্তে গাড়ির চাকা আটকে গেলে আর সহজে উঠতে চায় না। এজন্য এই সড়কে যানজট লেগে থাকে প্রতিনিয়ত। আল-মদিনার মোড় থেকে আবুল হোটেল পর্যন্ত রাস্তার বেহাল দশা দীর্ঘদিন ধরে। ছোট-বড় অসংখ্য গর্তে গাড়ি আটকা পড়ে ভোগান্তি সৃষ্টি করে। হিমাচল বাসের যাত্রী আনোয়ারা বেগম জানান, তিনি প্রতিদিনই এই সড়ক দিয়ে চলাচল করেন। প্রতিদিনই এই স্থানে গাড়ি আসলে অনেক সময় নষ্ট হয়। মালিবাগ রেলগেট থেকে খিলগাঁও পুলিশ ফাঁড়ি পর্যন্ত রাস্তায় অসংখ্য ছোট-বড় গর্ত। এছাড়া শান্তিনগর রাজারবাগ, মোহাম্মদপুর, তালতলা, মিরপুর, পল্লবী, আগারগাঁও, বংশাল, নবাবপুর, ইসলামপুর, মিটফোর্ড, মাদারটেকসহ নগরীর একাধিক এলাকার প্রধান সড়কগুলো এখন চলাচল অনুপযোগী। যাত্রাবাড়ী হানিফ ফ্লাইওভারের নিচ থেকে একটি রাস্তা চলে গেছে ডেমরার দিকে। ফ্লাইওভার নির্মাণাধীন সময় থেকে এখন পর্যন্ত এই রাস্তা সংস্কার করা হয়নি। ফ্লাইওভারের নিচ থেকে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার পর্যন্ত পুরো রাস্তাই ছোট-বড় গর্তে ভরে গেছে। ফলে এসব সড়ক দিয়ে গাড়ি চলে ধীর গতিতে। যানজট লেগে থেকে প্রতিনিয়ত। এছাড়া যাত্রাবাড়ী থেকে চিটাগাং রোড, পোস্তগোলা সড়কেরও বেহাল দশা। সায়েদাবাদ বাসটার্মিনাল থেকে খিলগাঁও ফ্লাইওভারের মুখ পর্যন্ত রাস্তায় গাড়ি চলাচল করে ধীর গতিতে। ছোট-বড় গর্তে পড়ে গাড়ির চাকা উঠতে পারে না। রিকশা উল্টে যাত্রী পড়ে ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটছে অহরহ।