রাখাইনে এখন যা হচ্ছে

33

রাখাইনে রোহিঙ্গাদের গ্রামগুলো এখনো জ্বলছে। বর্মীদের আগুন থেকে রক্ষা পেতে বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে ছুটে আসা হাজার হাজার নারী-পুরুষ এখনো বন্দি সেখানে। বর্মীরা তাদের সীমান্তে কড়া পাহারা বসিয়েছে। অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত বর্মী যুবকরা (মগ) বিস্তীর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে আসা বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের পথ আগলে রেখেছে। তারা পুরুষদের হাতে অস্ত্র ধরিয়ে দিয়ে ছবি তুলছে। তাদের জেলে পাঠাচ্ছে। নারীদেরকে হয় নির্যাতন করছে, না হয় ফিরিয়ে দিচ্ছে। শিশুদের পরিণতি আরো ভয়াবহ। তাদের আগুনে পুড়িয়ে মারছে। না হয় গলা কাটছে। বার্মার রাথিডং-এর উউরুপাড়া সংলগ্ন জঙ্গলে এখনো অবস্থানরত আব্দুস সালাম এমনটাই জানিয়েছেন। ১০ দিন আগে বাংলাদেশে পাড়ি দিতে পারা কুতুপালংয়ে বসবাসরত তার মামাত ভাই মোহাম্মদ আরবের মোবাইলে কথা হয় আব্দুস সালামের সঙ্গে। তিনি জানান, তার পরিচিত অনেকেই সীমান্তে আটকা পড়েছেন। অনেককে পাঠানো হয়েছে বার্মার জেলে। তাদের সীমান্তের কাছাকাছি এলাকা থেকে ধরে নিয়ে গেছে আর্মিরা। মগ যুবকদের হাতে থাকা অস্ত্র ধরিয়ে দিয়ে তাদের জেলে পাঠানো হয়েছে। তাদের সঙ্গে থাকা মহিলা, শিশু ও বৃদ্ধদের অনেকে শাহপরীর দ্বীপ দিয়ে বাংলাদেশে পাড়ি দিয়েছে। অনেককে ফেরত পাঠানো হয়েছে। ফেরত যাওয়া মহিলা ও শিশুরা এখন বার্মার জঙ্গলে জঙ্গলে রাত কাটাচ্ছে। গতকাল প্রাণে বেঁচে কোনোমতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা মংডুর শীলখালীর মোহাম্মদ ইউসুফ জানান, তিনি অনেক দিন জঙ্গলে ছিলেন। গতকাল বাংলাদেশে ঢুকেছেন। তার গ্রামের সব বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে মগ যুবকরা। পথে পথে আর্মির গুলির আওয়াজও তিনি শুনেছেন। বাংলাদেশে পৌঁছাতে তার ১৯ দিন লেগেছে জানিয়ে মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, ‘ইতারা পথে পথে গুলি মারে। মাইয়া পুয়াইন ধরে হাটি পেলার। অইন দরাইয়েনে পুয়াইনদরে পেলাইদের। বত কিয়ারে দরি লই যরগাই। হত কিয়ারে মারি পেলার’। তার পরিচিত বার্মার চৌপরাং গ্রামের দবির আহমদের পুরো পরিবারকে পথে হত্যা করা হয়েছে জানিয়ে মোহাম্মদ ইউসুফ জানান, দবির আহমদ তার স্ত্রী খাবি খাতুন, দুই ছেলে দিল মোহাম্মদ ও নুরুল ইসলামকে বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি একটি এলাকায় হত্যা করা হয়েছে। রাথিডং-এর চৌপরাং এলাকার মৌলভী আমান উল্লাহও প্রায় অভিন্ন তথ্য দেন। বলেন, তার গ্রামে এখন আর কোনো বাড়ি নাই। সব পুড়িয়ে দিয়েছে মগ যুবকরা। রাথিডং ও মংডুর কোনো গ্রাম আর পোড়ানোর বাকি নেই। চার দিন আগে বাংলাদেশে আসা আমান উল্লাহ বলেন, তার গ্রামের সব লোক বের হয়ে গেছে। তাদের বেশির ভাগ বাংলাদেশে এসেছে। বাকিরা রাস্তাঘাটে, না হয় পাহাড়ে-জঙ্গলে আছে। তার দাবি, বুথিডং ও আকিয়াবে এখনো কিছু রোহিঙ্গা রয়েছে। তবে তারা বাড়িতে নেই। হয় পাহাড়ে না হয় শহরের দিকে আশ্রয় নিয়েছে। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের তথ্য সংগ্রহ করছেন মোহাম্মদ আনিছ। তিনি নিজেকে রোহিঙ্গা বলে দাবি করেন। তার বাবার নাম আতাউল্লাহ বলে জানান। ইংরেজিতেই রোহিঙ্গাদের নাম-ঠিকানা সহ বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছিলেন তিনি। প্রায় ৩৩১টি পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করে কুতুপালংয়ে ফিরছিলেন মোহাম্মদ আনিছ। বালুখালী ঢালে কথা হয় তার সঙ্গে। মোহাম্মদ আনিছ জানান, বার্মায় ১০ ক্লাস পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন তিনি। এ জন্য তাকে তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আনিছ বাংলা বুঝেন না। তবে ইংরেজিতে অনর্গল কথা বলতে পারেন। মানবজমিনকে তিনি পরিস্থিতির বিস্তারিত অবহিত করেন। বলেন, বার্মায় ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা রয়েছে। ২০১২ সালের একটি হিসাবে এমন তথ্যই পাওয়া গেছে। তার দাবি, এর বেশির ভাগ এখন বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে পেরেছে। তিন হাজারের মতো রোহিঙ্গা মারা পড়েছে। বাকিরা লুকিয়ে আছে। তারাও বাংলাদেশে ঢুকার চেষ্টা করছে। রোহিঙ্গা যুবকরা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে এমন অভিযোগের বিষয়ে পড়াশুনা জানা ওই যুবকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি একবাক্যে তা নাকচ করে দেন। বলেন, ‘রোহিঙ্গা পিপল আর মোস্ট ভার্নারেবল ইন মিয়ানমার, ‘উই আর নট মিলিটেন্টস’।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

সূত্র : মানবজমিন অনলাইন পত্রিকা