‘রাজনৈতিক প্রভাব যত কমবে বিচার বিভাগের জন্য ততো মঙ্গল’

28

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেছেন, হাইকোর্টে বিচারকের সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেয়া না থাকায় প্রতিটি রাজনৈতিক সরকার ইচ্ছেমতো হাইকোর্টে বিচারক নিয়োগ দিয়ে থাকে। সময় আসছে হাইকোর্টে বিচারক সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেয়ার। তিনি বলেন, বিচারকের সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেয়া থাকলে রাজনৈতিক প্রভাব কমে যায়। এই রাজনৈতিক প্রভাব যতই কমবে ততই বিচার বিভাগের জন্য মঙ্গল। সদ্য অবসরে যাওয়া আপিল বিভাগের বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানার আজীবন সম্মাননা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। শনিবার বাংলাদেশ মহিলা জজ এসোসিয়েশন সুপ্রিম কোর্ট অডিটরিয়ামে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। প্রধান বিচারপতি বলেন, আমাদের দেশে মামলার পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিচারক নিয়োগ দেয়া হয় না। বিশ্বের প্রত্যেকটি দেশে মামলার সংখ্যানুপাতে বিচারক নিয়োগ দেয়ার বিধান আছে। ভারতের তুলনায় আমাদের এখানে অর্ধেক বিচারক। তিনি বলেন, ইউএসএতে সুপ্রিম কোর্টে ৯ জন বিচারক। ইচ্ছে করে সরকার সেখানে এর বেশি বিচারক নিয়োগ দিতে পারে না। একটা কনভেনশন (রীতি) চলে আসছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টে বিচারকের সংখ্যাও নির্ধারণ করে দেয়া আছে। আর আমাদের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ১১ জন বিচারকের সংখ্যা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এখন বিচারক কমে ৬ জনে দাঁড়িয়েছে। এরপর আগামী বছর এই সংখ্যা ৪ জনে গিয়ে দাঁড়াবে। তখন কোন রিভিউ পিটিশন আসলে বিচারকের অভাবে সেটি শুনানি করা সম্ভব হবে না। এসব বিবেচনা করে সরকারকে বলব বিচার বিভাগ অকেজো হওয়ার আগে এটিকে টিকিয়ে রাখতে বিচারক নিয়োগ দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। আইনমন্ত্রীর উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি বলেন, সরকার যদি মনে করে প্রধান বিচারপতি রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছে তাহলে আমি বলব ‘হ্যা’। প্রধান বিচারপতি বিচার বিভাগের স্বার্থেই রাজনৈতিক বক্তব্য দেবেন, বিচারকদের অবস্থা ও বিচার বিভাগের উন্নয়নের জন্য প্রধান বিচারপতি আরো বলবেন। এ ব্যাপারে আমি দ্বিধান্বিত হব না।
জাতীয় বাজেটে বিচার বিভাগের বরাদ্দ কমিয়ে দেয়ার সমালোচনা করে প্রধান বিচারপতি বলেছেন, গত তিন বছরে সুপ্রিম কোর্টের উন্নয়ন বরাদ্ধের জন্য একটি টাকাও দেয়া হয়নি। অর্থমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছিলাম, কিন্তু অজ্ঞাত কারণে কোন টাকা বরাদ্দ হয়নি। অথচ জাতীয় সংসদের জন্য উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ হয়েছে ১৬ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এছাড়া সন্ত্রাসের কারণে দেশের সব জায়গায় নিরাপত্তা দেয়ার জন্য বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। গত বছরের বাজেট থেকে এবারের বাজেটে বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ কমিয়ে দেয়া হয়েছে। এভাবে বাজেটেরে বরাদ্দ প্রত্যাহার করে একেবারে ‘শূণ্য’ করে দেয়া হচ্ছে। এই যদি হয় অবস্থা তাহলে বিচার বিভাগ চলবে কিভাবে? এটা দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গলজনক নয়। প্রধান বিচারপতি বলেন, হাইকোর্টে ৯৫ জন বিচারক ছিলো। কমতে কমতে সেটি এখন ৮৫ জনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
এসোসিয়েশনের সভাপতি জেলা জজ তানজীনা ইসমাইলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আপিল বিভাগের বিচারক বিচারপতি মো. ইমান আলী, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ ও অ্যাসোসিয়েশনের সহ সভাপতি হোসনে আরা আকতার। অনুষ্ঠানে বিচারপতি নাজমুন আরাকে আজীবন সম্মাননার ক্রেস্ট তুলে দেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এবং উত্তরীয় পরিয়ে দেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।